মুঘল আমল থেকে কুস্তি ছিল ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। অভিজাত ব্যক্তিরা কুস্তির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঢাকার কুস্তির অবনমন শুরু ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে। বিশ শতকের শুরু থেকে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা কুস্তির আখড়াগুলোতে শরীরচর্চা ও তরুণদের বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাই আখড়াগুলোর উপর সরকার ছিল খড়গহস্ত। পাকিস্তান আমলে কুস্তি তেমন পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। কিছু আখড়া ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার বানানো হয়। বাকী প্রায় সকল আখড়া পাকিস্তান আমলের শেষভাগে বন্ধ হয়ে যায়।
রহমান আলী তায়েশ’র ‘তাওয়ারীখে ঢাকা’ (১৯১০) গ্রন্থে আছে, আগে মল্লযুদ্ধ ও শক্তি পরীক্ষায় লোকজনের খুবই আগ্রহ ছিল। প্রতি মহল্লায় দু’একটি আখড়া থাকতো। হেকিম হাবিবুর রহমান ‘ঢাকা পাচাশ বারাস পাহেলে’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আমি বাল্যকালে দেখেছি ঢাকাতে কী হিন্দু, কী মুসলিম, কী আর্মেনীয়, কী ধনী-গরীব সবারই কম বেশি কসরত-কুস্তির প্রতি অনুরাগ ছিল। শহরের সব মহল্লাতেই ডাণ্ডাখানা খোলা হয়েছিল, শোনা যায় আগে তিন শতের অধিক আখড়া ছিল। আমার বাল্যকালে এক দেড়শ থেকে কম ছিল না। পূর্বেও চুড়িহাট্টা, ফরাশগঞ্জ, আরমানিটোলা, বকশীবাজার, বেচারাম দেউড়ির আখড়া প্রসিদ্ধ ছিল।
.png)
ঢাকায় আখড়াগুলোর প্রধান উৎসব ছিল মহরম উপলক্ষে পুরান ঢাকার কেন্দ্রস্থল চক চত্বরে সারারাত নানা শারীরিক কসরত প্রদর্শন। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগেও এর প্রচলন ছিল বলে হাবিবুরের গ্রন্থে জানা যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মহরমের ১০ তারিখ সন্ধ্যায় দলবদ্ধভাবে ও ধূমধামের সঙ্গে এরা চকে জমা হয়ে নিজের কৌশল দেখাত। বিভিন্ন আখড়া বিভিন্ন কৌশলের জন্য বিখ্যাত ছিল। ‘আশুরার রাতে চকে প্রত্যেক আখড়ার নির্দিষ্ট স্থান থাকতো, কেউ কারো জায়গা দখল করতো না। রাতে শহরের বাইরে থেকে মুসলমানরা আখড়ায় আসতো। শহরের আখড়ায় ‘তাসা’ বাজান হতো ও গ্রামের লোকেরা রওশন চৌকি নিয়ে আসতো।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মহরমে প্রতি বছর চকবাজার শাহী মসজিদের সামনে কুস্তি ও শারীরিক কসরত প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকা গবেষক হাশেম সূফী উল্লেখ করেন, দোলাই নদীর তীরে ঋষিকেশ দাস রোডের কুস্তির আখড়াটি গত শতকের পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ছিল। ১৯৫০সালে সাম্পদায়িক দাঙ্গা এরপর আখড়াটি হস্তান্তর করা হয় এলাকার ‘কালচার’ ও ‘নতুন সংঘে’র কাছে। ১৯৫৪ সালের পর আখড়াটি দখল হয়ে যায়, যা বর্তমানে একটি বিস্কুটের কারখানা।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী আখড়াগুলো সাধারণত অঞ্চল ও পরিচালনাকারী ওস্তাদের নামে পরিচিত ছিল। যেমন- ছোট কাটরার বৃন্দা পালোয়ানের আখড়া, সুরিটোলার হামিদ পালোয়ানের আখড়া, শাহাবুদ্দিন পালোয়ানের আখড়া। ষাটের দশক পর্যন্ত চকবাজার, হোসেনী দালান, বংশাল, আমলীগোলা, আর্মানীটোলা, সুরিটোলা, সাতরওজা প্রভৃতি মহল্লার কুস্তির চর্চা ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো।
হোসেনী দালানের উত্তর দিকে, হোসেনী দালান সংলগ্ন পূর্ব দিকের নবাব কাটরায় ও রমনা কালী মন্দিরের পুকুরের পাশে ছিল আখড়া, তিনটিই বিলুপ্ত হয় পাকিস্তান আমলের শেষভাগে। বেগমবাজার তাজমহল সিনেমার পাশে, ছোট কাটরায়, মিটফোর্ড বালুর মাঠে, বর্তমান আলিয়া মাদ্রাসার পিছনে, আমলিগোলায় আজাদ মুসলিম ক্লাবে আজিমপুর বটতলায়, সুরিটোলা পুকুরপাড়ে কুস্তির আখড়া ছিল।
বংশালের প্রধান কেন্দ্র ছিল বংশাল পুকুরের উত্তরপশ্চিম দিকে আবদুল্লাহ সরকার লেনে মিল্লাত শরীরচর্চা কেন্দ্রটি। সুরিটোলার আখড়াটিও বিখ্যাত ছিল। হামিদ পালোয়ান যা পরিচালনা করতো। তার কয়েকজন শিষ্য কুস্তিগির হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
মৌলভীবাজার-আর্মাানিটোলা অঞ্চলের কুস্তির প্রধান আখড়া ছিল বর্তমান বেচারাম দেউড়ি এলাকায়। কুস্তি চর্চার যে সংস্কৃতি এককালে ঢাকায় ছিল, পাকিস্তান আমলে তার অবসান হয়।
তথ্যসূত্র:
ক। বাংলাপিডিয়া
খ। ঢাকা পাচাশ বারাস পাহেলে, হেকিম হাবিবুর রহমান
গ। দ্য ডেইলি স্টার, তরুণ সরকার।