আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান ১ শতাংশের বেশি। দেশের মোট মাছের ১১ শতাংশ উৎপাদন আসে ইলিশ থেকে। পাঁচ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। আরো ২০ লাখ লোকের জীবিকার প্রধান উৎস ইলিশ। ইলিশ মূলত বাংলাদেশের মাছ। ২০১৭—এ বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, ইরানসহ আরো কয়েকটি দেশের উপকূলে ইলিশ ধরা পড়ে। তবে ডিম ছাড়ার জন্য তারা বেছে নিয়েছে গঙ্গা ‘বেসিনের' বাংলাদেশকে। বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো 'মা' ইলিশে ভরে ওঠে ডিম ছাড়ার জন্য। সমুদ্র থেকে যত ভেতরের দিকে আসে, ততই ইলিশের শরীর থেকে লবণ কমে যায়, স্বাদ বাড়ে। একসময় বাংলাদেশ নামক ব—দ্বীপের সব নদীতেই কম—বেশি ইলিশ মিলত।
ভারতের ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার পূর্বে এরা এককালে রাজশাহীসহ গোয়ালন্দ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়তো। এমন কি তখন এই ইলিশ ভারতের উত্তর প্রদশেরে এলাহাবাদ এলাকাতেও ধরা পড়তো। বর্তমানে ফারাক্কার প্রভাবে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানির গভীরতা, স্রোত ও ঘোলাত্ব না থাকায় ইলিশ আর এ পথে বংশ বিস্তারের জন্য আসে না। এর পরও বিশ্বেও মোট আহরিত ইলিশের ৬০ শতাংশ ধরা পড়ে বাংলাদেশে।
.png)

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান ইলিশ অবতরণ ও বিক্রয় কেন্দ্র হচ্ছে চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও বরিশাল। এসব মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মাছ আসে উত্তর বঙ্গোপসাগর থেকে বা মেঘনা ও পশুর নদীর মোহনা ল থেকে। বিশেষ করে চাঁদপুর জেলার তিন নদীর মিলনস্থলে ইলিশ মাছ বেশি পাওয়া যায়।
ফলে ইলিশের রাজধানী বলা হয়ে থাকে চাঁদপুরকে। পদ্মা ও মেঘনা নদীর বুকে জেলেরা জাল ফেলে রুপালি ইলিশের আশায়। তবে এখন নদীতে তেমন ইলিশ ধরা পড়ে না। ইলিশ ধরতে জেলেরা যায় গভীর সমুদ্রে। চাঁদপুরের বড় বড় স্টেশনগুলো মাছ ঘাট সাগরের ইলিশের আমদানিতে সয়লাব। কিন্তু জেলেদের জালে মিলছে না চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনার ইলিশ। ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরে ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়লেও চাঁদপুরের পদ্মা মেঘনা নদীতে লোকাল ইলিশ তেমন ধরা পড়ছে। তবে পাইকারি থেকে খুচরা বাজার হয়ে সেই সমুদ্রের ইলিশ হয়ে যায় নদীর ইলিশ।
স্বাদের দিক দিয়ে মেঘনা তো বটেই, গঙ্গার চেয়েও পদ্মার ইলিশ এগিয়ে। এর কারণ ডায়াটম শৈবাল। এই ডায়াটম শৈবাল গঙ্গাতেও আছে, কিন্তু পদ্মায় ওই শৈবাল প্রচুর। ডায়াটম– খেকো পদ্মার ইলিশ স্বাদে অনন্য। দেখতেও গায়ের উপর একটি রুপালি ঝিলিক থাকে
তাই বিশ্ববিখ্যাত পদ্মার ইলিশের স্বাদ থেকে বাঙালি বি ত তো বটেই। প্রতিদিন ঠকছে সাগরের ইলিশ কিনে।
তাই আমরা কয়েকজন সিদ্ধান্ত নিলাম মাঝ পদ্মা থেকে জেলের জাল থেকে কিনব পদ্মার রুপালি ইলিশ। যথারীতি ঢাকা থেকে রওনা দিলাম মাওয়া ঘাটের দিকে। ঢাকা থেকে মাওয়া ঘাট যেতে বাস ভাড়া লাগবে জনপ্রতি ৮০—১০০ টাকা। এরপর পৌঁছে গেলাম পমত্তা পদ্মার কাছে। মাওয়া পয়েন্টের স্পিট বোড টার্মিনাল থেকে আমরা রওনা হই মাঝ পদ্মার বুকে। পাড়ে জেলেরা নানা ধরনের জাল বুনছে। নানা সময়ের জন্য নানা ধরনের জাল তাদের। মাঝ পদ্মায় যেতে স্পিডবোটের ১ ঘণ্টার ভাড়া আসতে পারে ১২০০—১৫০০ টাকা।
পদ্মায় সবাই স্থায়ী জেলে না। কিছু কিছু জেলে থাকে শৌখিন জেলে। যারা শুধু ইলিশের মৌসুমে মাছ ধরতে যায় পদ্মার বুকে। মাঝ পদ্মায় দেখতে পাবেন পাল তোলা জেলে নৌকাও। স্পিডবোটে জেলেদের মাছ ধরা দেখার চেয়ে যদি জেলে নদীতে উপভোগ করা যায় ইলিশ মাছ ধরা তবে পূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের হাতে সময় কম ছিল। আমরা স্পিডবোট করে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম কীভাবে জেলেদের মাছে ধরা পড়ছিল পদ্মার সুস্বাদু বিশ^বিখ্যাত রুপালি ইলিশ। মাঝে মাঝে গিয়ে উঠছিলাম জেলেদের নৌকায়। মাছ দেখাতে বলার সাথে নৌকার পাটাতন খুলে ইলিশ দেখাতে লাগলেন জেলে ভাইরা। এই যেন নদীর বুকে এক রুপালি ঝিলিক। সাদা ধবধবে ইলিশের পিঠে ইলিশের রুপালি আস্তরণ। অনেকে মনে করে বাজারে চেয়ে অনেক সস্তায় মাছ কিনতে পাওয়া যায় পদ্মায়। এই ধারণা আসলে ভুল। ইলিশের চাহিদা এই মাঝ নদীতেও কম না। ফলে দেড় কেজি ওয়ালা দুইটি ইলিশের দাম হাঁকা হয়েছে ৪ হাজার টাকা।

এছাড়া যারা এই মাওয়া ঘাট হয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু দেখতে যান তারাও একবার ঘুরে আসেন এই ইলিশের ভাসমান হাট থেকে। অনেকেই ধারণা করেন ইলিশ মাছ বোধহয় জালে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। কিন্তু এই পদ্মার বুকে আসলে দেখতে পাবেন জ্যান্ত ইলিশ। জেলের জালে ধরা পড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ রুপালি ইলিশ ডাঙ্গায় লাফায়। ফলে জ্যান্ত ইলিশ দেখতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে পদ্মার মাঝ বুকে। কিন্তু ভুল করেও ভাবা যাবে না পদ্মার বুকেও খুব একটা নাগালের মধ্যেই মিলবে এই ইলিশ।
ইলিশ পরিচিতি
বাংলা ছাড়াও ভারতের আসামের ভাষায় ইলিশ শব্দটি পাওয়া যায়। ওড়িয়া ভাষায় একে বলা হয় ইলিশি মাছও বলা হয়ে থাকে। তেলেগু ভাষায় ইলিশকে বলা হয় পোলাসা। পাকিস্তানের সিন্ধু ভাষায় এর নাম পাল্লা। বার্মিজরা ইলিশকে বলে সালাঙ্ক।
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ রুপালি ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Tenualosa ilisha। Hilsa রয়েছে তিনটি প্রজাতি, যথা- Hilsa ilisha, Hilsa keel Hilsa toli । তন্মধ্যে কেবল রুপালি ইলিশই বংশ বিস্তারের জন্য অভিপ্রয়াণ করে স্বাদুপানিতে আসে। Hilsa keel, Hilsa toli পুরোপুরি সামুদ্রিক। বংশ বিস্তারের জন্য এদের স্বাদু পানিতে আসার প্রয়োজন হয় না।
সাধারণত এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ইলিশ মাছ প্রাপ্ত হয়ে থাকে। বছরে এক থেকে দুই বার প্রজননে অংশ নিয়ে থাকে। প্রধান প্রজননকাল দক্ষিণ—পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহ শুরুর সময় থেকে শীতের শুরু অর্থাৎ নভেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় প্রজননকাল শীতের শেষে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত।