ঢাকা,  শনিবার   ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

অদ্ভুত কারণে শকুন আজ বিলুপ্তির পথে

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:০৮, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
অদ্ভুত কারণে শকুন আজ বিলুপ্তির পথে
শকুন

এক সময়ের খুবই পরিচিত একটি পাখি হচ্ছে শকুন। যা এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। খুব সহজে এখন শকুনের দেখা মেলে না। যদিও মানুষের প্রচলিত ধারণা শকুন অমঙ্গলের প্রতীক। আসলে ধারণাটি একদমই ভুল।

বরং পরিবেশবিদেরা বহু আগেই এই পাখিকে প্রকৃতির ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মৃত প্রাণীর মাংস খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে শকুন। বাংলাদেশে কয়েক প্রজাতির শকুন দেখা যেত। সেগুলোর মধ্যে রাজ শকুন, সরু ঠোঁট শকুন, হিমালয় বা তিব্বত অঞ্চল থেকে আসা হিমালয়ান গৃধিনী, মঙ্গোলিয়া থেকে উড়ে আসা ইউরেশীয় গৃধিনী ইত্যাদি।

মৃত প্রাণীর দেহ থেকে ক্ষতিকর জীবাণু প্রকৃতিতে ছড়ানোর আগেই তা খেয়ে সাবাড় করে দেয় শকুন। গরু ও মানুষের জীবনের জন্য অন্যতম ঝুঁকি হচ্ছে অ্যানথ্রাক্স রোগ। একমাত্র শকুন হচ্ছে সেই প্রাণী, যে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত মৃত গরুর মাংস খেয়ে হজম করতে পারে। যক্ষ্মা ও খুরারোগের জীবাণু শকুনের পেটে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে রাখলেও তা একশ বছর সংক্রমণক্ষম থাকে।

Advertisement

শকুনপ্রখর দৃষ্টিশক্তির অধিকারী পাখিটি বটগাছ, কড়ইগাছ, শিমুল, বাঁশঝাড়, দেবদারু গাছে বাসা বানায়। এদের দৃষ্টি এতটাই প্রখর যে, অনেক উঁচু থেকেও এরা মাটি বা পানির ওপরে থাকা লাশ দেখতে পায়। শকুন সাধারণত দল বেধে থাকে। মৃতপ্রায় মানুষ বা প্রাণীর আশেপাশে শকুন দলবদ্ধভাবে উড়তে থাকে। তবে জীবিত কোনো মানুষ বা প্রাণীকে সাধারণত শকুন আক্রমণ করে না।

এ পাখি একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০টি ডিম পাড়ে। তিন সপ্তাহ তা দেয়ার পর বাচ্চা ফোটে। এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ২৫ বছর। তিন থেকে চার ফুট উচ্চতার হয় এ পাখি। দেশে দু’শ’ প্রজাতির পাখি হুমকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শকুনও। ক্রমাগত কমছে শকুনের সংখ্যা।

তিন দশক আগে বাংলাদেশের আকাশে ১০ লাখ শকুন উড়ত। এরপর কমতে কমতে তা এখন মাত্র ২৬০-এ নেমে এসেছে। মূলত ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই ৯৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে দেশ থেকে।

শকুনশকুনের অবিশ্বাস্য গতিতে হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ১৯৯২ সালে। গবেষকরা মাঠে নেমে পড়েন। শুরু হয় কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা। দ্রুত বিলুপ্তির রহস্য উন্মোচনে লেগে যায় ১১ বছর। গবাদি পশুর শরীরে তখন ডাইক্লোফেনাক ওষুধ প্রয়োগ করা হতো। মৃত গরুর মাংসই শকুনের প্রধান খাদ্য। তাই এ ধরনের পশু মারা গেলে সেটিই হয়ে উঠত শকুনের বংশ নির্মূলের প্রধান নিয়ামক।

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ড. লিন্ডসে প্রমাণ করেন, ডাইক্লোফেনাক প্রয়োগ করা গরুর মাংস খাওয়ার তিন মিনিটের মধ্যে শকুনের মৃত্যু হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আগেই পৃথিবীর আকাশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শকুন হারিয়ে যায়। এমনকি এ তথ্য জানার পরও বাংলাদেশে ওষুধটি নিষিদ্ধ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

২০১০ সালে দেশব্যাপী শকুনের জন্য ক্ষতিকারক ওষুধ ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হয়। দেশব্যাপী শকুনের খাদ্য প্রাণীর চিকিৎসায় কিটোটিফেনও নিষিদ্ধকরণ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা চলছে।

শকুনের দল শকুন বিলুপ্তির পেছনে রাসায়নিকই একমাত্র কারণ নয়। কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সংকট, কবিরাজি ওষুধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, ইউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ ও বাসস্থানের অভাবকেও দায়ী করছে আইইউসিএন।

২০১৩ সালে ‘বাংলাদেশ জাতীয় শকুন সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দেশের ৪৭ হাজার ৩৮০ বর্গঃ কিলোমিটার এলাকায় শকুনের জন্য দু’টি অঞ্চলকে নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৬ সালে দশ বছর মেয়াদি (২০১৬-২০২৫) বাংলাদেশ শকুন সংরক্ষণ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের শকুন রক্ষা করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই কর্মপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়েই শকুন সংরক্ষণে বর্তমানে সকল ধরণের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

২০১৫ সালে শকুনের প্রজননকালীন সময়ে বাড়তি খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে ও সুন্দরবনে দু’টি ফিডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৬ সালে অসুস্থ ও আহত শকুনদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দিনাজপুরের সিংড়ায় একটি শকুন উদ্ধার ও পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

শকুনউল্লেখ্য, এ পর্যন্ত ৯৩টি হিমালয়ান গ্রিফন প্রজাতির শকুন উদ্ধার, পরিচর্যার পর পুনরায় প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছে।

২০১৭ ও ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ৭ম ও ৮ম আঞ্চলিক পরিচালনা কমিটির সভায় শকুন সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার শকুন সংরক্ষণের জন্য একটি মাইলফলক। শকুন রক্ষায় বাংলাদেশের এই উদ্যোগ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে বেসরকারি পর্যায়ে অনুসরণ করা হচ্ছে। এছাড়া আফ্রিকার কয়েকটি দেশও বাংলাদেশের শকুন রক্ষার এই মডেল অনুসরণের কথা ভাবছে।

সারাবিশ্বে শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে থাকে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!