রোদ-বৃষ্টিতেও তিনি সাইকেল চালিয়ে বিলি করেন বই
আতিফ আসাদ। সাইকেল চালিয়ে তিনি বই ফেরি করে বেড়ান। তৈরি করেছেন একটি পাঠাগারও। দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ায় সাহায্য করে আসছে এই যুবক। নিজে অর্থের অভাবে ভালো স্কুলে পড়তে পারেননি এমনকি নোটবই কিনতে পারেননি। এ কারণে যাতে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এই সমস্যায় না পড়ে এজন্য বিভিন্ন বাড়ি গিয়ে বিনামূল্যে বই দিয়ে সাহায্য করেন আতিফ।
জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাসড়া মাজালিয়া প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আতিফের বসবাস। সংসারে তার বাবা-মা আর সাত ভাই-বোন। এতো বড় পরিবার চালাতে হিমশিম খায় আতিফে বাবা। বাবার পরিশ্রম ও সংসারের দুর্দশা দেখে লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোট থেকেই বিভিন্ন কাজ করে উপার্জন করা শুরু করে আতিফ। অনেকেই তাকে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে বা বিভিন্ন জায়গায় চাকরির কথা বলেছে। তবে আতিফের বরাবরের ইচ্ছা তিনি উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করবেন। আর তাই শত বাঁধা বিপত্তি স্বত্ত্বেও আজ আতিফ পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাইমারি স্কুলে থাকা অবস্থায় মায়ের সঙ্গে নকশিকাঁথা সেলাই করতেন আতিফ। এছাড়াও ধানকাটা, দিনমজুরি, রং বার্ণিশ, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি ইত্যাদি কাজ করে লেখাপড়া চালিয়েছেন এই মেধাবি তরুণ। স্কুল বন্ধের দিনগুলোতে এভাবেই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে সংসারের হাল টানেন আতিফ। তিনি ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, টাকার অভাবে ভালোভাবে স্কুলে যেতে পারিনি, বই, গাইড কিনতে পারিনি। ভালো কোনো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেটও পড়তে পারিনি। এই কষ্টগুলো ছোট থেকেই বিবেকে নাড়া দিতো। ভাবতাম সমাজের জন্য শিক্ষার আলো দরকার। কারণ আমার মতো অনেকেই রয়েছে। এদের নিয়ে আমার ছোট থেকেই কিছু করার ইচ্ছা।
আতিফের পাঠাগারের নাম ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’। এই প্রসঙ্গে আতিফ বলেন, ভালো কিছু করতে হলে এবং জ্ঞানকে বিকশিত করার জন্য বই পড়ার ভূমিকা অপরিসীম। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাঠাগার নেই, বই পড়ার সুবিধা নেই। আবার টাকা দিয়ে বই কিনে পড়ার মতো অর্থ নেই সবার। ছেলেমেয়েরা অবসর সময়টুকু কাটাতে তাই বিনামূল্যে বই পড়ানোর পরিকল্পনা করি বড় ভাই মিলনের সঙ্গে। প্রথমে ২০ টি বই দিয়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শুরু করি। কোথাও ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠাগার শুরু করার টাকাও আমাদের ছিল না। ভাবলাম যেহেতু শিক্ষার ও জ্ঞানের আলো ছড়ানোই আমার মূল কাজ সেখানে অবকাঠামো কোন বাধা হতে পারে না। তাই নিজের বাড়িতেই ঘরের বারান্দায় পাটকাঠির বেড়া দিয়ে পাঠাগার শুরু করি।
প্রথমে নিজের ঘর থেকেই পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করেন আতিফ। তারপর ঘরের বারান্দায়। এরপর বই সংরক্ষণ করতে কিছু কাঠ দিয়েই নড়বড়ে একটা বই রাখার তাক/বুকশেলফ তৈরি করেন এই যুবক। ব্যাতিক্রমী এই উদ্যোগ শুরুর গল্প জানাতে গিয়ে আতিফ বলেন, শুরুর দিকে বিভিন্ন লোকদের কাছ থেকে চেয়ে চেয়ে ২ থেকে ১০টি করে বই যোগাড় করি। এরপর গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেড এর নির্বাহী পরিচালক কে এইচ মালেক স্যার পাঠাগারের এই ভালো কাজ দেখে ১০০ বই দেন এবং ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ ম্যাম বই কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। এতে আমার পাঠাগার সমৃদ্ধ হয় এবং পাঠকরা ভালো বই পড়তে পারে। এরপর এতোগুলো বই সংরক্ষণ করতে সমস্যা দেখা দিলে মালেক স্যার আবার একটি বুকশেলফ বানানোর টাকা দেয়।
ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরীজীবী, প্রবাসী থেকে সবার দেয়া বইগুলো নিয়ে আজকে আতিফের পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ২০০০ বই আছে। আতিফ লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে গিয়ে বই দিয়ে আসে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন। এছাড়াও কেউ যদি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও ফোন করে। তাকে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে বই দিয়ে আসেন আতিফ। বর্তমানে তার পাঠাগারে ১০০ পাঠক আছে।
আতিফের এই ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের শুরুর দিকে বিভিন্ন বাধা পথ সেঁধেছে। তিনি বলেন, শুরুর দিকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীণ হয়েছি। অনেকে উপহাস করতো টিটকারি দিয়ে কথা বলতো। এখনো বলে! কি শুরু করেছে ছেলেটা, এখন কি আর এই বইগুলো পড়ে কেউ! লেখাপড়া না করে মানুষের সেবা করবে! অনেকে সামনে না বললেও পিছে পিছে পাগল বলতো। তাতে আমার কষ্ট লাগতো কিন্তু দমে যাইনি। আমার অবসর সময়টুকু মানুষের জন্যই কাজে লাগাচ্ছি এবং সেটা বই দিয়ে আলোকিত করার। প্রথমে তো পাঠাগার কি বুঝতোই না অনেকে।
পাঠাগারের নাম নিয়েও রয়েছে আরেক গল্প। এই বিষয়ে আতিফ বলে, শুরুর দিকে পাঠাগারের নাম ঠিক করতে পারিনি। পারিবারিক জমির বিরোধের জেরে আমার বড় ভাই মিলনকে জবাই করে হত্যা করে পাশের গ্রামের কালভার্টের মধ্যে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। ২০১৮ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাইকে হত্যা করা হয়। হঠাৎ খবরে পাগলের মতো হয়ে যাই। বরাবরই আমার ভাই আমাকে দিকনির্দেশনা দিতো। তাই ভাইয়ের নামেই, ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’ নামে আবার শুরু করলাম। আমার ভাইকে এর মাঝে খুঁজে পাই।
বর্তমানে আতিফ আসাদের বয়স ১৯ বছর। জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন আতিফ। একাদশে পড়াকালীন ‘মিলন স্মৃতিক পাঠাগার’ চালু করেন এই যুবক। তার ইচ্ছা, বই পড়ার আন্দোলন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম এবং সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়া। প্রত্যেকটি গ্রামেই একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক। লাখো পাঠাগারে সারা দেশ ভরে উঠুক। সবাই বই পড়ুক। বই পড়ার বিকল্প কিছু নেই। তিনি বলেন, বই পড়ো, পড়ো এবং পড়ো। মৃত্যুর আগে হলেও দেখে যেতে চাই সব গ্রামেই একটি করে পাঠাগার হয়েছে। তাতেই আমার মৃত্যু সার্থক হবে।