দেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র গবেষক, সাংবাদিক ও শিক্ষক অনুপম হায়াত। তার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জানান, শব্দচয়ন ও বাক্যগঠনে নতুনত্ব আসছে না। প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির উন্নতি সাধন যেভাবে হয়েছে সে অর্থে বিনোদন সাংবাদিকতা গঠনমূলক হচ্ছে না। আমরা অতীতে শুটিং স্পটে একটি তথ্যের জন্য দিন-রাত থাকতাম। তথ্য যাচাই বাছাই করে লিখতাম। এখন তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। নায়ক বা নায়িকা ফোনে যা বলছে তাই লেখা হচ্ছে। বিষয়বস্তুর সন্ধানও হয় না। অর্থাৎ স্পট রিপোর্টিং বলতে যা বোঝায় তা এখন হয় না। গুরুত্বহীন সংবাদকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে সংবাদ। এককালে নাটক– সিনেমার রিভিউ হতো। এখন তাও হয় না। একটি সিনেমাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। রূপকের মাধ্যমে সিনেমায় বার্তা তুলে ধরা হতো এককালে। এখন সেটিও হচ্ছে না। অর্থাৎ, গঠনমূলক বিনোদন সাংবাদিকতা দেখছি না।
দৈনিক খবরের সিনিয়র রিপোর্টার শপথ চৌধুরী। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন। বিনোদন সাংবাদিকতার রেশ ধরে প্রেস ক্লাবের সদস্য হয়েছেন। বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করছেন। তিনি বিনোদন সাংবাদিকতার মান প্রসঙ্গে বলেন, অতীতের চেয়ে বর্তমানে মেধাবী ছেলে–মেয়েদের বিনোদন সাংবাদিকতায় বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যান্য বিটের চেয়ে এই বিটের যোগ্যতা কিছুটা আলাদা। ক্রাইম বা পলিটিক্যাল বিটে একটি ছকে বাঁধা সাংবাদিকতা হয়। কিন্তু বিনোদনে নিজের মুন্সিয়ানা দেখানোর সুযোগ রয়েছে। ভাষাগত দক্ষতার মাধ্যমে সাহিত্যমন্ডিত রিপোর্ট করার দারুণ সুযোগ বিনোদন সাংবাদিকদের। পাশাপাশি এ সময়ের সাংবাদিকতার কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে প্রায়ই। পড়াশোনা করার অভ্যাস কমে যাওয়ার কারণে বিষয়ের গভীরে যেতে পারেনা অনেকে। শিল্পীর অতীত ইতিহাস না জানলে তাকে গতানুগতিক প্রশ্ন করতে হয়। কাউন্টার প্রশ্নও কেউ করে না। আবার সাংবাদিকতা করতে গিয়ে কেউ গান লিখতে চায়, কেউ অভিনয় করতে চায়। প্রশ্ন আসতে পারে, আহমেদ জামান চৌধুরী– ও তো সাংবাদিকতার বাইরে গান লিখেছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন। তাদের যোগ্যতা সে জায়গায় নিয়ে গেছে।
.png)
সবশেষে শপথ চৌধুরী বলেন, আরেকটি কথা না বললেই নয়, শিল্পীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায় না। আমরা দেখছি, এ প্রজন্মের সাংবাদিকরা তাদের মুখপাত্র হয়ে যাচ্ছেন। এতে করে তাদের মূল্যায়ন কমে যাচ্ছে। এক কথায় বলতে গেলে, প্রকৃত সাংবাদিক হতে গেলে পেশাদার হতে হবে। যা অতীতে থাকলেও এখন কম দেখা যায়।

২০০৩ সাল থেকে মডেল ও অভিনেত্রী আসমা পাঠান রুম্পা শোবিজে কাজ করছেন। তিনি বিনোদন সাংবাদিকতার বাঁকবদল দেখেছেন। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে বললেন, পত্রিকায় খবর ছাপা হলে কেটে রাখতাম। এভাবে ছাপা খবরের অ্যালবাম করেছি। এখন ছোট ছোট বিষয় নিয়ে সংবাদ হচ্ছে অনলাইনে। আগের মতো সংরক্ষণের সুযোগ নেই। আগে মানুষ শিল্পীর লাইফস্টাইল সম্বন্ধে জানতো না। তাদের প্রতি অদম্য কৌতূহল ছিল। যেমন চাচা (চিত্রনায়ক ফারুক) ঈদের সময় বাসায় এলে গেটের সামনে ভক্ত–দর্শকের ভিড় জমে যেত। আমরা তার সঙ্গে গাড়িতে করে গেলে মানুষ গাড়ির সঙ্গে দৌড়াত। চিৎকার করে বলতো– নায়ক ফারুক যাচ্ছে। কিংবা মিঞা ভাই যাচ্ছে। সেই দিন এখন নেই। মানুষের কৌতুহলও বোধহয় কম।
রুম্পা যোগ করে আরও বলেন, আমরা বাসায় বিনোদন ম্যাগাজিন রাখতাম। একটি সংখ্যার পর আরেকটি সংখ্যার জন্য অপেক্ষা করতাম। বাসায় ম্যাগাজিন স্ট্যান্ড রেখেছি। পত্রিকা স্টলে ম্যাগাজিন চোখে পড়লে কয়েকটা কিনে ফেলি। এখনো বাসায় পত্রিকা রাখি। প্রথম পাতা দেখার পর বিনোদন পাতায় চোখ বুলাই। আগে সাংবাদিকরা আড্ডা দেয়ার জন্য বাসায় আসতো। আমরা পত্রিকা অফিসে যেতাম। খুবই হৃদত্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেতো। যা এ যুগে বিরল।
অভিনেত্রী ও লেখিকা শানারেই দেবী শানু প্রায় দুই দশক বিনোদন অঙ্গনে জড়িত। তিনি দেখেছেন গণমাধ্যমের পালাবদল। তার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বললেন, এখন সংবাদ সহজলভ্য হয়ে গেছে। যা আগে ছিল না। দেখা যায়, সরাসরি কথা না বলে নিজের মতো সংবাদ প্রকাশ করছে। যা ঠিক নয়। এতে ভুল তথ্য প্রকাশ হতে পারে। বিষয়টিকে সময়ের দোষ বলা যেতে পারে। সঠিক সংবাদ প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সময়ের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম বদলে গেছে। কিন্তু মানসম্মত সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রস্তুতির বিকল্প নেই। পর্যাপ্ত পড়ালেখা করে বিনোদন সাংবাদিকতা করলে লেখার মান বাড়ার পাশাপাশি গড়ে উঠবে নিজস্ব পাঠকশ্রেণী। শুধু তাই নয়, বিনোদন সাংবাদিকতায়ও থাকতে হবে অনুসন্ধানী ভাবনা।