ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

খবরের পথে পরশের জীবন

আলজাবের আহমেদ, রাবি
প্রকাশিত: ১৬:১৭, ৩০ নভেম্বর ২০২৪
খবরের পথে পরশের জীবন
ফরহাদুল আলম পরশ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন ফরহাদুল আলম পরশ। সঙ্গে একটি সাইকেল আর দেশবিদেশের নানা খবর। সাইকেলে চেপে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে সংবাদপত্র পৌঁছে দেন তিনি। গত ২৬ বছর ধরে রাজশাহীতে এই কাজ করছেন পরশ। সবার কাছে তিনি ‘হকার পরশ’ নামেই পরিচিত। তবে, দিনে দিনে চাহিদা কমে আসায় পত্রিকা বিক্রির পাশাপাশি বই বিক্রিও শুরু করেছেন তিনি। 

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা ফরহাদুল আলম পরশের পড়াশোনার প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। কিন্তু দারিদ্রতার কারণে নবম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। অপ্রাপ্তবয়স্কেই বাধ্য হয়ে তাকে সংসারের হাল ধরতে হয়। পেশা হিসেবে তিনি বেঁছে নেন সংবাদপত্র বিপণনের কাজ। ১৯৯৮ সালে তিনি এই কাজ শুরু করেন। তবে সংবাদপত্রের চাহিদা কমতে থাকায় তিনি ঐ কাজের পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে ক্যাম্পাসে বই বিক্রি শুরু করেন। এক সময় অর্থের অভাবে বই কিনতে না পারা পরশ এখন বই বিক্রেতা। 

সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের সংবাদ পৌঁছানোর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ছাপা কাগজ থেকে কালের বিবর্তনে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারে এখন পৌঁছে যাচ্ছে খবর। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আজও অনেক পাঠকের সকালের নাস্তা বা চায়ের সঙ্গী সংবাদপত্র। তাদের কাছে এখনও বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছাপা পত্রিকা। বহুবছর ধরে এই পেশায় জড়িত থাকায় ভালোবাসা আর মায়ায় এই কাজ ছাড়তে পারেননি পরশ। 

Advertisement

রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে ভোরে কোকিল ডাকার আগেই পরশ রাজশাহীর সংবাদপত্রের এজেন্টের কাছে চলে যান। সেখান থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করে তিনি পাঠকের দুয়ারে দুয়ারে ছুটেন। বিলি করে আসেন দেশবিদেশের নানা খবর। 

পরশের পৈত্রিক ভিটা রাজশাহী নগরের কাশিয়াডাঙার ডাসমারি এলাকায়। তবে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তিনি ক্যাম্পাস সংলগ্ন কাজলার ফুলতলা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। বড় মেয়ে রাজশাহী মহিলা কলেজে স্নাতক শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছেন আর ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। 

সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত পরশ সংবাদপত্র বিলি করেন। নগরীর বিনোদপুর, কাজলাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দফতর ও সাতটি আবাসিক হলে নিয়মিত সংবাদপত্র সরবরাহ করেন তিনি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন্দ্রনাথ বসু অ্যাকাডেমিক ভবন সংলগ্ন রাস্তার সামনের একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানে বই বিক্রি করেন। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তার বইয়ের দোকান খোলা থাকে। 

পরশের বইয়ের দোকানে তার সঙ্গে কথা হয়। গল্পে গল্পে তিনি বলেন, আমাদের যৌথ পরিবারে বাবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মহুরির কাজ করে সংসার চালাতেন। বাবার আয়ে আটজনের পরিবারে আর্থিক টানাপোড়েন লেগেই থাকত। আর্থিক সংকটের কারণে দশম শ্রেণিতে থাকাকালে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হয়। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে ১৯৯৮ সাল থেকে সংবাদপত্র বিপণনের কাজ শুরু করি। শুধু পত্রিকা বিক্রি করে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় হয়। ঐ টাকা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। পত্রিকার চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে হকারির পাশাপাশি ২০১৮ সাল থেকে বইয়ের ব্যবসা শুরু করি।

এই পেশা শুরুর যাত্রার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম দুই বছর মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে অন্যের হয়ে পেপার সরবরাহের কাজ করতাম। পরবর্তীতে ২০ হাজার টাকা ধার নিয়ে এলাকাভিত্তিক এজেন্টশিপ কিনে নিই। ঐ সময়ে সংবাদপত্রের অনেক চাহিদা ছিল। মানুষের সকাল শুরুই হতো পত্রিকা পড়ার মাধ্যমে। তবে এখন দিন বদলেছে। করোনা মহামারির পর মানুষের পত্রিকা পড়ার সেই আগ্রহ অনেকাংশেই কমে গেছে।

এই পেশায় তার তিক্ততার অভিজ্ঞতাও কম নয়। তিনি বলেন, একদিন আমি অসুস্থ থাকায় হবিবুর হলে পেপার দেওয়ার জন্য আরেকজনকে পাঠিয়েছিলাম। ঐ দিন হলের ছাত্ররা ল্যাপটপ চুরির অভিযোগে আমার পাঠানো ঐ ব্যক্তিকে আটকে রাখে। একপর্যায়ে আমাকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। ঐদিন ছাত্রদের তোপের মুখে পড়ি। পরে প্রমাণিত হয় আমার পাঠানো ঐ ব্যক্তি ল্যাপটপ চুরি করেননি। এ ছাড়া অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পেপার নিয়ে অর্থ পরিশোধ করেননি।

এতকিছুর পরেও পরশ স্বপ্ন দেখেন সংবাদপত্রের সেই সোনালি দিন আবার ফিরে আসবে। মানুষ উদগ্রীব হয়ে খবরের পাতায় চোখ রাখবে। সংবাদপত্রের পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বদলে যাবে তার সংসারের দুরবস্থার চিত্র। মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে এভাবেই বাকিটা জীবন পার করতে চান পরশ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: রাবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!