ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

গণহত্যার সাক্ষী জবির গুচ্ছ ভাস্কর্য

তৌফিকুর রহমান, জবি
প্রকাশিত: ২০:৪০, ২৫ মার্চ ২০২৪
গণহত্যার সাক্ষী জবির গুচ্ছ ভাস্কর্য
ভাস্কর্য ‘৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

২৫ মার্চ ১৯৭১। নির্মম গণহত্যার নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্য। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে অবস্থিত এই ভাস্কর্যের নাম ‘৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’। 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে। এ গণহত্যার স্মারক হিসেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্মাণ করা হয়েছে ‘৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’ শীর্ষক দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্যটি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাধারণ মানুষ ধরে এনে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে পাক-হানাদার বাহিনী। হত্যার পর মরদেহগুলোকে গণকবর দেওয়া হয়। সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্মারক হিসেবে কবরের ওপর এ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্মাতা ভাস্কর রাশা।

Advertisement

জবি ক্যাম্পাসে অবস্থিত এই ভাস্কর্য।

এ ভাস্কর্যটিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও যুদ্ধের প্রস্তুতির চিত্র ফুটে উঠে। ভাস্কর্যটি দুটি অংশে বিভক্ত। এর এক অংশে রয়েছে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। আর অপর অংশে রয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যার চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের নির্মম অধ্যায় তুলে ধরার জন্য এ ভাস্কর্যটি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা অসম্পূর্ণ।

এটির নির্মাতা ভাস্কর রাশা। তিনি মূলত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পাঁচটি ভাগে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তা হলো একাত্তরের গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি, ঘাতক, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ এবং বিজয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্যে এ পাঁচটি থিমের দুটি তুলে ধরা হয়েছে। এখনো তিনটি বাকি। তা হলো ঘাতক, মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ এবং বিজয়। শিক্ষার্থীদের আশা প্রশাসনের সহায়তায় অতিদ্রুত এর নির্মাণকাজ শেষ হবে।

ভাস্কর্যটির যে অংশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে বেদনার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৫ মার্চের কালরাতকে। এ অংশে দেখানো হয়েছে- এই রাতে ইয়াহিয়া খান মাতাল অবস্থায় আছেন, পাকিস্তানির হানাদাররা হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, গর্ভবতী মাকে অত্যাচার করে হত্যা করা হচ্ছে, মরদেহ ফেলে রাখা হচ্ছে যেখানে সেখানে। ভাস্কর্যের অংশ হিসেবে রয়েছে একটি পত্রশূন্য বৃক্ষ। তার ওপর একটি শকুন বসে আছে। এর দ্বারা সে সময়ে শ্মশান হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতীক বোঝানো হয়েছে।

‘৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি’ শীর্ষক দেশের একমাত্র গুচ্ছ ভাস্কর্য।

অপর অংশে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির চিত্র। বাংলার কামার, কুমার, জেলে, কৃষিজীবী মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়ে যুদ্ধে লড়ছেন। দা, বটি, খুন্তি, কোচ, বর্শা সবকিছু নিয়ে যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন। পরের অংশে দেখা যায়, সবাই আধুনিক অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। যুদ্ধে নামার পর যখন যোদ্ধারা বুঝতে পারেন যে, পুরোনো পদ্ধতি দিয়ে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয়, তখন সবাই প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করেন। যেখানে রয়েছে সব বয়সী নারী-পুরুষ। পরিপূর্ণ যুদ্ধের জন্য গেরিলা কৌশল, মাঝারি আকারের অস্ত্রের ব্যবহার শিখছেন তারা। 

ভাস্কর্যের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে প্রশিক্ষণ নেয়া সাহসী এক কৃষকের ছেলে। তার চোখে যুদ্ধজয়ের নেশা। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সবার চোখে প্রতিশোধে স্পৃহার ছাপ রয়েছে। ভাস্কর্যটির নিচে রয়েছে পানি, যা দিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশকে বোঝানো হয়েছে। আর পানির ভেতরে রয়েছে বাংলা বর্ণমালা, যা দিয়ে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সফলতায় বাংলার মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার ভাবনা।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। আর শেষ হয় ১৯৯১ সালে। ২০০৮ সালের ৩১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম খান এটি উদ্বোধন করেন। ভাস্কর্যটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক দিয়ে ঢুকলেই সামনে পড়ায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা যে কারো প্রথমেই এটি চোখে পড়ে। এটি সবাইকে একাত্তরের হানাদার বাহিনীর বর্বরতার সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: জবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!