ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]
শিক্ষাঙ্গনে মুক্ত শিক্ষার্থী

বিলুপ্তির পথে রাবির ‘র‌্যাগিং’

আলজাবের আহমেদ, রাবি
প্রকাশিত: ১৪:৩২, ১১ জানুয়ারি ২০২৪
বিলুপ্তির পথে রাবির ‘র‌্যাগিং’
রাবিতে এমন আনন্দদায়ক পরিবেশ এসেছে। ছবি: ফুয়াদ পাবলো

শিক্ষাঙ্গনের অগ্রজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নবীনদের সখ্য গড়ার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি অপসংস্কৃতি ‘র‌্যাগিং’। র‌্যাগিংয়ে আদবকায়দা শেখানোর নামে নবীনদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‌্যাগিং নামক অত্যাচারের ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। প্রথমদিকে র‌্যাগিং ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, পরে ছাত্রীরাও র‌্যাগিংয়ের শিকার হতে থাকে। 

তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) র‌্যাগিং নামক এই কুপ্রথার ইতি হয়েছে অনেক আগেই। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অত্যাচার এখন বিলুপ্তির পথে র‌্যাগিং। এতে হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর থেকে র‌্যাগিংয়ের নামে নিষ্ঠুরতম কর্মকাণ্ড চলে। এতে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাত। তবে সেই চিত্র বললে গেছে। বিচ্ছিন্ন গুটিকয়েক ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই গত দুই-এক বছরে র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভর্তির পর তারা ক্যাম্পাসে নির্ভয়ে সময় কাটাচ্ছেন। ক্যাম্পাসে চলাচলে কোনো ভীতি নেই।

Advertisement

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর নতুন শিক্ষাবর্ষে নবীন শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম শেষে ক্লাস শুরুর সময়ে প্রতিটি বিভাগের প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের র‍্যার্গিং রোধে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন প্রাঙ্গণে মাইকিংয়ের মাধ্যমে র‍্যার্গিং প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়৷ এছাড়া কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তদন্ত সাপেক্ষে বিচারের আওতায় আনা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম, ছাত্র উপদেষ্টা সবসময় এ বিষয়ে তৎপর থাকেন৷ 

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন ভারতীয় শিক্ষার্থী অন্তরা হালদার। তিনি র‍্যাগিং সংস্কৃতি সম্পর্কে বলেন, ‘বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং নেই বললেই চলে। সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে বন্ডিং, ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক এবং উভয়ের মধ্যে বোঝাপড়ার কারণে রাবিতে এমন আনন্দদায়ক পরিবেশ এসেছে। আমার মনে হয়, ফ্রেন্ডলি বন্ডিং, আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কারণে ক্রমশ র‍্যাগিং সংস্কৃতি বিলুপ্ত হচ্ছে।’ 

হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং অনেকাংশে কম৷ একেবারে নেই বলা যায়। যদিও কিছু কিছু ঘটনা ঘটে তবে সেগুলো প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমাধান করে। আর প্রশাসন থেকে কঠোর নির্দেশনার ফলে কেও সাহস পায় না৷ ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং সংস্কৃতি দিনে দিনে বিলুপ্ত হচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে র‍্যাগিং সংস্কৃতি দিনে দিনে বিলুপ্ত হচ্ছে। ছবি: ফুয়াদ পাবলো

রাবি সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, রাবির শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ছাত্রদের প্রচেষ্টায় র‍্যাগিং হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে৷ শুধু র‍্যাগিং, বুলিং নয়, সবাই সচেতন থাকলে এসব অনিয়ম নির্মূল করা সম্ভব হবে। শুধু শিক্ষকদের ভূমিকায় এটা নির্মূল করা সম্ভব হয়ে উঠবে না৷ যতক্ষণ না শিক্ষার্থীরাও এগিয়ে আসবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক, বিভাগের শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় সচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে। যার কারণে র‍্যাগিং সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। এর বাইরেও যদি অভিযোগ আসে, তা খোঁজ নিয়ে সমাধান করা হচ্ছে।  

রাবি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সাউদ বলেন, মূলত র‍্যাগিংয়ের ক্ষেত্রে সচেতনতা আসে বিভাগগুলো থেকে। বিভাগের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের যে নির্দেশনা দেয়, সেটিই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী৷ এক্ষেত্রে প্রশাসন থেকে বিভাগগুলোতে মেসেজ পাঠিয়ে দেয়া হয়- নবীন শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলে বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে যেন যোগাযোগ করে৷ অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগ নিচ্ছে৷ কেউ যদি দোষী হন, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নির্দেশনা থাকে৷ ফলে রাবিতে সবার মধ্যেই র‍্যাগিংবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে।  

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, র‍্যাগিং কোনো ভালো পথ না! সিনিয়র কর্তৃক কোনো জুনিয়রকে নিজের মতো করে নেওয়ার পথ র‍্যাগিং না। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তখন কিন্তু এক পরিবেশ থেকে অন্য পরিবেশে আসে। সেখানে তাদের আশা থাকে তাদের বড় ভাইয়েরা তাদেরকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করবে, তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা (সিনিয়র) যে শিক্ষা অর্জন করেছে সেটা তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিবে, বিশ্ববিদ্যালয় নামক পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করবে৷ 

প্রসঙ্গত, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে র‌্যাগিং বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির আহ্বানে এ বিষয়ে অ্যান্টি র‌্যাগিং টিম গঠন হতে থাকে। অ্যান্টি র‌্যাগিং টিম সর্বদাই মনিটরিং করে, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সৌজন্যবোধ ফের ফেরানোর উপলব্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলো। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!