ডা. ইমদাদুল মাগফুর বলেন, সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থীর উপর একটি গবেষণা পরিচালরা করি। এ জরিপে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহতার তথ্য উঠে এসেছে। এদের অধিকাংশ মানসিক সমস্যা তথা সিজাফ্রোনিয়া, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, সুইসাইডাল ওসিডিতে আক্রান্ত। যার কারণ হিসেবে ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক চাপ, অতিমাত্রায় গেমিং ও ইন্টারনেট আসক্তি, একাকীত্ব, প্রেমঘটিত সমস্যা ও মাদকাসক্তি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক না থাকা বা যোগাযোগ কমে যাওয়া কিংবা ঘরকুনো হয়ে বসে থাকা ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা বাড়ছে। এমনকি এ সমস্যা পারিবারিকভাবেও হতে পারে বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, যখন কোনো শিক্ষার্থী এ সমস্যায় আক্রান্ত হয় তখন তারা কারো সঙ্গে এ সমস্যা নিয়ে কথা শেয়ার করতে চাই না। এমনকি বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও এ সমস্যার কথা বলে না। এতে তাদের মধ্যে একাকীত্ব চলে আসে। এক পর্যায়ে যখন তারা পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় তখন তারা আমাদের শরণাপন্ন হয়। এমনকি একপর্যায় অনেকে নিজের স্বাস্থ্যের কিংবা আত্মহত্যার চিন্তাও করে থাকেন।
.png)
সমস্যার সমাধান নিয়ে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মানসিক সমস্যা নিয়ে বেশি বেশি ক্যাম্পেইন করা দরকার। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যা সম্পর্ক জানতে পারবেন। সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ নিলে তাদের পক্ষ থেকে ক্যাম্পেইন করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, এ সমস্যা শুধুমাত্র শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দিনদিন মানসিক সমস্যা ও হতাশা বাড়ছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে এ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক রোগে আক্রান্ত। এই মহামারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও চিকিৎসা নিতে আমাদের কাছে আসে। তবে তার পরিসংখ্যানগত হিসাব রাখা হয়নি।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছর ১১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। যাদের অধিকাংশ মানসিক চাপ তথা সিজোফ্রোনিয়া, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রস ডিসঅর্ডার, মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার, সুইসাইডাল ওসিডি থেকে আত্মহত্যা করেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়ি যশোরে আত্মহত্যা করেন গণিত বিভাগর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজুল আবদীন। এছাড়া ২০২১ সালে ১৪ নভেম্বর রসায়ন বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী চঞ্চল চক্রবর্তী, ২০২০ সালের ৫ আগস্ট বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী তারাবি বিনতে হক, ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী তাইফুর রহমান প্রতীক, এবং ৩ আগস্ট পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষার্থী বকুল চন্দ্র দাস, ২০১৮ সালর ৩ জুলাই সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী মৃত্তিকা রহমান, ২০১৬ সালের ৮ মে ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বিশ্বজিৎ মল্লিক, ২০১৫ সালর ৩ সেপ্টেম্বর স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মজুমদার, ২০১২ সালে শ্রীনিবারণ নামে এক শিক্ষার্থী, ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সৈকত আল ইমরান, ২০১০ সালে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সায়মা সুলতানা এনি আত্মহত্যা করেন।
শাবিপ্রবি কাউন্সিলিং সাইকোলজিস্ট ফজিলাতুন্নেছা শাপলা বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থীরই মানসিক সমস্যায় রয়েছে, তারা আমার কাছ আসে। তবে তা মানসিক রোগের হার পরিসংখ্যান করে দেখা হয়নি। তবে এর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ সবাই মানসিক রোগী, দুশ্চিন্তা ও হতাশাগ্রস্ত। এদেরকে প্রোপার ট্রিটমেন্টের মধ্যে না রাখলে সমস্যা আরো বাড়বে।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা দফতরের উদ্যোগে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘শিক্ষাজীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। যেখানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বক্তব্য দেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কথাশিল্পী ও লেখক অধ্যাপক ড. আনোয়ারা সৈয়দ হক।