দীর্ঘ ক্লান্তিকর রাত্রির পরিসমাপ্তি ঘটেছে। রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের বাতিগুলো তখনও জ্বলছে। জাবি ক্যাম্পাসের সড়কগুলোতে বিরাজ করছে শুনশান নীরবতা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে টহল দিচ্ছে কুকুরের দল। এদিকে ভোরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়েছেন অনেকে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো যেন ঘাড় নেড়ে অভিবাদন জানাতে ব্যস্ত।
দেখে মনে হবে প্রকৃতি ও জীবন যেন এক জায়গায় এসে মিলেমিশে একাকার। যে অনুভূতি মানবমনের মধ্যে সৃষ্টি করে এক অদ্ভুত আলোড়ন। রাস্তার ধারে ধারে গড়ে ওঠা ঘন গাছপালার আচ্ছাদন ক্যাম্পাসের পরিবেশকে করেছে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত।
.png)

সেই সৌন্দর্যে এবার নতুনমাত্রা যোগ করেছে পুরনো দিনের টেলিফোন লাইন বক্সগুলো। তাদের গায়ে নতুন সাজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রঙ-তুলির ছোঁয়ায় নির্জীব বক্সগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। লাল, নীল, হলুদ কালোসহ নানা রঙের ঝলকানিতে রঙিন হয়েছে সেই ক্যানভাস।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক, স্থাপত্যশিল্প, বাহারি কারুশিল্পের প্রায় সব উপাদানই খুঁজে পাওয়া যায় এই বিদ্যাপীঠে। ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানকার আর্ট ও কারুশিল্পীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ও কারুশিল্পীরা তাদের ক্যাম্পাসকে নতুন এক রূপে ফুটিয়ে তুলছেন রঙ-তুলির আঁচড়ে। তাদের আঁকা চিত্রকর্মগুলোই ক্যাম্পাসের ফাঁকা দেয়ালগুলোকে করেছে সৌন্দর্যমণ্ডিত।
অনেক তো হলো লোকজ নকশা আর বাংলা সাহিত্যের রং খেলার যুদ্ধ। চিত্র শিল্পীরা এবার আটঘাট বেঁধে নেমেছেন ভিন্ন আমেজের সন্ধানে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী পরিশ্রান্ত এসব টেলিফোন লাইন বক্সগুলো হারিয়েছিল তাদের চিরচেনা সেই রূপ ও সত্ত্বা। অর্ধমৃত বক্সগুলো নতুন রূপে সাজবে বলে যেন প্রহর গুনছিল। প্রকৃতির মধ্যে নান্দনিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে রং তুলি হাতে উপস্থিত একদল চিত্রশিল্পী। যাদের দুচোখ জুড়ে হাজারো কল্পনা আর ইচ্ছাশক্তি। পুরনো জীর্ণ শীর্ণ বক্সগুলোর ওপর তাদের সেই কল্পনা আর ইচ্ছাশক্তিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন রং তুলির আঁচড়ে।

দেখে মনে হবে যেন রঙের মেলা বসেছে সেখানে। সৌন্দর্যমণ্ডিত এই বক্সগুলো নজর কাড়ছে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষদের। যা দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন ছোট থেকে বড় সবাই। কেউ কেউ আবার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে মুগ্ধতা জানাচ্ছেন।
ব্যতিক্রমধর্মী এমন চিত্রকর্ম এঁকেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একদল শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একজন আবদুল্লাহ মামুর। নিজেদের এমন উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ক্যাম্পাসের ফাঁকা দেয়ালগুলোতে ব্যাচের নাম, আজেবাজে লেখা আর মাত্রাতিরিক্ত পোস্টার দিয়ে দৃষ্টিকটু বানিয়ে ফেলা হচ্ছিল। আর ক্যাম্পাসকে দৃষ্টিনন্দন বানানোর জন্যই মূলত আমাদের এই আয়োজন।
ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা টেলিফোন লাইনের বক্সগুলো রঙিন করার কথাটা অনেক বছর আগেই ভেবেছিলাম, কিন্তু আজ করব-কাল করব ভেবে সেটা আর করা হয়নি। এবার কদিনের জন্য ক্যাম্পাসে গিয়ে অলস বসে থাকতে থাকতে কিছু করার না পেয়ে শেষমেশ এগুলোকেই রঙিন করে ফেললাম আমরা কজন মিলে।

কোনো বার্তা বহন করে এমন উদ্দেশ্যে ওগুলো আঁকিনি। তবে এতটুকু বলতে পারি, যে ক্যাম্পাসের দেয়াল বা অন্যসব জায়গা পোস্টার মেরে, ব্যাচের নাম, নিজের নাম কিংবা নানাকিছু লিখে দৃষ্টিকটু না বানিয়ে সেসব জায়গাগুলো এরকম রঙিন ঝকমকে করেও রাখা যায়, তা অন্তত চোখের শান্তি দেয়। এটাও একটা বার্তা হতে পারে। বলছিলেন মামুর।
তিনি বলেন, একটা ব্যাটসম্যান, একটা মিনিয়ন আর একটা স্পাইডারম্যান করেছি। যদিও আরো কিছু এমন বক্স আছে ক্যাম্পাসে। কিন্তু, সময় আর রঙের অপ্রতুলতার কারণে সেগুলো আর করা হয়নি। মূলত একেকটা বক্স একেকটা চরিত্রের মতো বানিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য এরকম ডিজাইন সিলেক্ট করেছিলাম।
জানা যায়, কাজগুলো করার সময়ে সহায়তা করেছে মিল্টন (৪৩ ব্যাচ), শান্ত (৪৪ ব্যাচ), সিক্ত (৪৫ ব্যাচ), মং (৪৭ ব্যাচ)। বাইরে থেকে কোনো স্পন্সর নেওয়া হয়নি। নিজেদের টাকা দিয়েই মূলত রঙ কেনা হয়েছে। তবে ক্যাম্পাসের কেউ যদি নিজ থেকে রঙের খরচ দিতে চায় তবে নেওয়া হয়। এছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরের কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান টাকা দিতে চাইলেও তা নেওয়া হয়নি।
লেখক: শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ।
ছবি: আবদুল্লাহ মামুর