এই মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কতটা পিষ্ট হচ্ছেন তার চিত্র চোখে পড়েছে রাজধানীর কারওয়ানবাজার ও হাতিরপুর বাজার ঘুরে।
কারওয়ান বাজারে আশিক আহমেদ নামের সরকারি এক চাকরিজীবী জানান, বেতনের টাকায় তিন সন্তান নিয়ে ঢাকায় পরিবার নিয়ে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। বেতন ও রেশন যা পান তা দিয়ে বাচ্চাদের পড়াশোনা, কোচিংয়ের খরচসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের খরচ অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়ানোও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বছর বেতন যে পরিমাণ বাড়ে, পণ্য আর অন্যান্য খরচ বাড়ে তার থেকে কয়েকগুণ বেশি। যার সঙ্গে পাল্লা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
কারওয়ানবাজারের একজন মুরগির ক্রেতা জানান, বাজার দর এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের মুখে একটু বাড়তি পুষ্টিকর খাবার তুলে দেওয়াও কঠিন হয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানি কক মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪শ টাকায়। ব্রয়লার ২২০ টাকায়। আগে বাচ্চাদের কক মুরগি খাওয়ালেও এখন সামর্থ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় ব্রয়লার মুরগি খাওয়াচ্ছেন।
.png)
তিনি বলেন, শুধু খাবারের দামই নয়, ওষুধের দামও নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাধ্য হয়ে ওষুধ খাওয়াও কমিয়ে দিয়েছেন। বেড়েছে বাচ্চাদের বইপত্র, কাগজসহ পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের দামও। এর সঙ্গে টিউশনি কোচিংয়ের বাড়তি খরচ তো আছেই।
এদিকে শুধু নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তই নয়, মূল্যস্ফীতিতে নাকাল মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তরা। রাজধানীর হাতিরপুল, অ্যালিফ্যান্ট রোড এলাকা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের আবাসস্থল হিসেবেই পরিচিত। হাতিরপুল কাঁচাবাজারও রাজধানীর ‘অভিজাত’ কাঁচাবাজার হিসেবেই পরিচিত, যেখানে সব পণ্যের দামই একটু চড়া।
হাতিরপুল বাজারের একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুই ছেলের পরিবার, নাতিসহ তার পরিবারের সদস্য ১১ জন। সবাই মিলে বিকেলের নাস্তায় তার খরচ হয় কয়েকশ টাকা। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে বিকেলের এই নাস্তায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে তাকে।
কারওয়ানবাজার থেকে হাতিরপুল বাজার সবখানেই দেখা গেল নিত্যপণ্যের দামের বেপরোয়া ঊর্ধ্বগতি। ডিম, মুরগি, মাছ, মাংস, কাঁচাবাজার ফলমূল সব পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের কেনার পক্ষে কষ্টসাধ্য। দেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতি মাসেই তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত এক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি প্রায় ডাবল ডিজিটের কাছাকাছি, দশ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। সর্বশেষ এপ্রিল মাসেও মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ বলে উঠে আসে তাদের প্রতিবেদনে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখনও দুই অংকের ঘর অতিক্রম না করলেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি এরমধ্যেই অতিক্রম করেছে ডাবল ডিজিট। বিবিএসের হিসাবে সবশেষ এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে।
অপরদিকে বিবিএসের দেওয়া তথ্যের বিপরীতে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশের অপর সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস। গত ১০ মে একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ বলে জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক বিনায়ক সেন।
দেশের মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের এই শঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্যেই আর মাত্র অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই উপস্থাপন হতে যাচ্ছে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট। দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকে সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার বিষয়টিকে জোর দিয়ে সরকারের প্রতি আগামী বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞরা।
এজন্য প্রয়োজনে খাদ্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারসহ সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় আরো বেশি সংখ্যক মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা এবং প্রয়োজনে খাদ্যের রেশনিং কার্যক্রম চালুর ওপর জোর দেন তারা।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে আগামী বাজেটে এনিমেল ফিড, পোল্ট্রি হ্যাচারির কাঁচামাল ইত্যাদির ওপর যেন ট্যারিফ আরোপ না করা হয় সে ব্যাপারে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। এর প্রভাব কিছুটা হলেও মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির ওপর পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ডলার সংকট নিরসন আর সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি- এই তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে।
তিনি বলেন, এছাড়া আগামী বাজেটে গত বাজেটের মতো পরোক্ষ কর বসানো যাবে না। এর ফলে বিভিন্ন পণ্যের দাম আবার বেড়ে যেতে পারে।