এছাড়া ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি ভালো ব্যাংকের পরিচালক-কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের মতে, যে প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলো একীভূত করা হচ্ছে, তাতে ভালো ব্যাংকগুলোর ওপর খারাপ ব্যাংক চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে দেশের ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়া, সরাসরি জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ লুণ্ঠন, ব্যাংক মালিক হয়ে লুটপাট, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার না করা, উদারভাবে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ায় ব্যাংকি খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। এপ্রিলজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় ছিল ব্যাংক একীভূতকরণ। এটিও কতটা ফলপ্রসূ হবে দেখার বিষয়। বরং দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিচার না করে ব্যাংক একীভূত করার মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংককেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হবে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্কও ছড়িয়ে পড়েছে।
.png)
বিশেষ করে ব্যাংকে টাকা রাখা, না রাখা নিয়ে আমানতকারীরা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছেন। ফলে দেশের ব্যাংকগুলোতে দ্রুত আমানত কমে যাচ্ছে। বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করার পরই থেকেই দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা রাখা তো যাচ্ছেই না, বরং আমানতকারী এবং ব্যাংকারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যেই একীভূতের ঘোষণা আসার পরই চলতি এপিল মাসে সরকারি মালিকানার বেসিক ব্যাংক ২০০০ কোটি টাকার আমানত হারিয়েছে। বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের আমানত রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি থেকে আমানতকারীরা প্রায় ১০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। শরিয়াহভিত্তিক একটি বেসরকারি ব্যাংকে কয়েকদিনে আমানত ফেরতের ১২টি আবেদন জমা পড়েছে। প্রতিটিই বড় অঙ্কের এফডিআর।
ঈদুল ফিতরের পরও দেশের ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি; বরং বেশিরভাগ ব্যাংকেই নগদ টাকার সংকট আরো বেড়েছে। দৈনন্দিন লেনদেন মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করছে দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সংকটে থাকা ২০টি ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে গত বুধবার ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদে ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক রেপো থেকে ধার নিয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া কলমানি থেকে একই দিন ব্যাংকগুলো ধার করেছে ৪ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক দিনেই সংকটে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণ কেলেঙ্কারি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচন নীতি ও বিভিন্ন সময়ে সংস্থাটির ভুল পদক্ষেপের কারণেই ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট কাটছে না।
ব্যাংকিং খাতের যে দুরবস্থা, তার জন্য দায়ী খেলাপি ঋণ, বড় বড় ঋণ খেলাপিরাও এজন্য দায়ী। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাংকিং খাতে কখনই সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে হয় না।