আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যে প্রাণের সুর, ভোলায় শুরু ২৫৯তম কবিগানের আসর
ভোলায় শুরু হয়েছে আড়াইশ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যবাহী ২৫৯তম তিন দিনব্যাপী কবিগানের আসর। বৃহস্পতিবার সকালে ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ বাপ্তা এলাকার রতন মহাজন বাড়ির আঙিনায় পাল্টাপাল্টি যুক্তি, তর্ক আর গানে গানে দুই কবিয়ালের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এ আসরের সূচনা হয়। লোকজ সংস্কৃতির এ আয়োজন ঘিরে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের হাজারো দর্শক-শ্রোতা।
এবারের আসরে পালাগান পরিবেশন করছেন পিরোজপুরের নাজিরপুরের কবিয়াল রতন সরকার ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কবিয়াল নরত্তম সরকার। তাঁদের তাৎক্ষণিক পদ রচনা, সুরের মূর্ছনা এবং যুক্তি-তর্কে জমে ওঠে কবিগানের আসর। হারমোনিয়াম, ঢোল, বাঁশি, কাঁসা ও বেহালাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
আয়োজকেরা জানান, প্রতিবছর লক্ষ্মীপূজার পর স্থানীয় গ্রামবাসী সম্মিলিতভাবে এ কবিগানের আয়োজন করেন। এবারও বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী এ আসর, যা শেষ হবে আগামী শনিবার। কবিগানকে কেন্দ্র করে বসেছে ছোট পরিসরের গ্রামীণ মেলাও। গান উপভোগের পাশাপাশি মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন নানা বয়সের মানুষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল কবিগান, জারি, সারি ও পালাগান। এসব গানের আসরে মানুষ খুঁজে পেত প্রাণের আনন্দ, গড়ে উঠত সামাজিক সম্প্রীতি। তবে আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে লোকজ সংস্কৃতির এসব ধারা এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ বাপ্তার রতন মহাজন বাড়ির এ আয়োজন বাঙালির ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতি ধরে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
মহাজন বাড়ির অন্যতম আয়োজক অপু বলেন, প্রতিবছর আমাদের বাড়ির কবিগানের আসরে আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসেন। আশপাশের হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে বসে কবিগান উপভোগ করেন। এটি যেমন আমাদের বাড়ির ঐতিহ্য, তেমনি গ্রামীণ সংস্কৃতি চর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা আশা করি, গ্রামীণ এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকার এগিয়ে আসবে।
আয়োজকরা আশা করছেন, শনিবার শেষ দিনের আসরে দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতি আরও বাড়বে।
উল্লেখ্য, কবিগান বাংলা লোকসংগীতের একটি বিশেষ ধারা। এ গানে দুই বা ততোধিক কবিয়াল তাৎক্ষণিকভাবে পদ রচনা, সুরারোপ এবং যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। একসময় গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত কবিগানের আসর বসত। কালের বিবর্তনে এ আয়োজন কমে এলেও ভোলার দক্ষিণ বাপ্তার রতন মহাজন বাড়ির ঐতিহ্যবাহী আসরটি আজও সেই লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।