ঢাকা,  বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

সাঁথিয়ায় মহাসড়ক দখল করে রমরমা বাণিজ্য : যানজট, জনভোগান্তি চরমে

সাঁথিয়া ( পাবনা)  প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৩০, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
সাঁথিয়ায় মহাসড়ক দখল করে রমরমা বাণিজ্য : যানজট, জনভোগান্তি চরমে
সাঁথিয়ার বনগ্রাম বাজারে মহাসড়ক দখল করে চলছে এরকম বাণিজ্য, এতে লেগেই থাকে যানজট।

 

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা বনগ্রাম বাজারে ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক ও ফুটপাত এর সিকি কি.মি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ অস্থায়ী হাট। ফলে এ বাজার এলাকাটিতে সবসময় যানজট লেগে থাকে। এতে একদিকে এলাকার ৭- ৮ হাজার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনগনণর চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।  অন্যদিকে, ঘর ভাড়া বাঁচিয়ে ফুটপাতে দোকান বসিয়ে রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন একদল ব্যবসায়ী। এদের কাছ থেকে নেপথ্যে ‘খাজনা’র নামে চাঁদাবাজি করে একটি চক্র।  

সরেজমিনে বনগ্রাম বাজারে গিয়ে দেখা যায়,  ঢাকা-পাবনা মূলমহাসড়কের ওপরই কাঁচাবাজার, ফলের দোকান, মাংসের দোকান এবং গরম তেলের কড়াই স্থাপন করে ভাজাপোড়ার দোকানসহ হরেক রকমের ব্যবসায়িক স্থাপনা বসানো হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর মাসিক ঘর ভাড়া নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও তা বাঁচাতে তারা বেছে নিয়েছেন এই অবৈধ পথ। মহাসড়ক দখলকারী এই ব্যবসায়ীদের অনেকরই দৈনিক আয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা  বাজারের অনেক বড় ব্যবসায়ির চেয়েও বেশি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনগ্রাম বাজারের পুরাতন রূপালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ বছর ধরে নিয়মিত কাঁচা বাজার বসে আসছে। তবে সম্প্রতি কিছু অতি-মুনাফাখোর ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় মূল রাস্তার মোড় ও ফুটপাত দখল করে রীতিমতো অস্থায়ী হাট বসিয়ে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে সাধারণ বাজারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে শাকসবজি ও তরিতরকারি বিক্রি করা হচ্ছে। এই অবৈধ ব্যবসা নির্বিঘ্ন রাখতে তারা আয়ের একটি  অংশ কিছু  প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাঁদা দেয়।   

রাস্তার ওপর সবসময় বাজার জমে থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় স্কুল- কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্কুল চলাকালীন সময়ে ভিড় ঠেলে যাতায়াত করা তাদের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। বনগ্রাম বাজারের ওপর দিয়ে প্রতিদিন বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল, মিয়াপুর হাই স্কুল ও কলেজ, মিয়াপুর দাখিল মাদ্রাসা, ৫-৬টি কিন্ডারগার্টেন, ৪-৫টি  প্রাইভেট মাদ্রাসা এবং বনগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মিলিয়ে প্রায় ৭- ৮ হাজার শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। ফুটপাত দখল করে দোকান বসায় এবং সড়কে যানজট লেগে থাকায় শিক্ষার্থীদের রাস্তা পার হতে রীতিমতো ‘যুদ্ধ’ করতে হয়। বিশেষ করে শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিন পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ রূপ নেয়।

 

৮ম শ্রেণির ছাত্রী মারিয়া খাতুন জানায়, রাস্তার ওপর দোকানপাট আর মানুষের ভিড়ের কারণে তাদের স্কুলে যেতে অনেক ভয় লাগে, কারণ সেখানে সবসময় একটা জটলা লেগেই থাকে। ৯ম শ্রেণির ছাত্রী আফিফা বলে, ভিড় ঠেলে রাস্তা পার হওয়া তাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ এবং হাটের দিনে এই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, স্থানীয় হাটুরিয়া এবং কৃষকদের বিড়ম্বনা চরমে। রাস্তার ওপর হাট বসার ফলে যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সামান্য পথ পাড়ি দিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম পেঁয়াজের হাট হওয়ায় পেঁয়াজ চাষি ও ব্যবসায়িদের   মাল বোঝাই গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হতে হিমসিম খেতে হয়। অনেক বড় গরুর হাট হওয়ায় খামারি ও ব্যবসায়িদেরও একই  সমস্যা পোহাতে হয়।মহাসড়কের বাসগুলোও দীর্ঘ সময় জটে আটকে থাকে  ।   

স্থানীয় হাটুরিয়া বাচ্চু প্রামানিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন , যে রাস্তা পার হতে বড়জোর এক মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে আমাদের এক ঘণ্টা ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। রাস্তার ওপর এভাবে বাজার বসালে আমরা কৃষকরা পণ্য রাস্তা পার হব কিভাবে? একই রকম অভিযোগ বনগ্রামের বাসিন্দা আ. কুদ্দুস, হাবিবুর রহমান, সাগর হোসেন ও জসীম উদ্দিনের কণ্ঠে। তারা জানান, নিয়মিত এই দুর্ভোগের কারণে জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা কৃষি পণ্য সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।  

মহাসড়কের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) একটি সাইনবোর্ড রয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা আছে— সড়কের উভয় পাশের  ১০ মিটারের মধ্যে দোকানপাট বা কোনো কিছু রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দখলদার ব্যবসায়ীরা সেই সাইনবোর্ডটির ওপরই চালা দিয়ে নির্বিঘ্নে দোকান চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে রূপালী ব্যাংক পুরাতন ভবনের কাছ থেকে শুরু করে হাটের সংযোগস্থল পর্যন্ত এই অবৈধ ব্যবসা চলছে।

কয়েক বছর আগে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো অভিযান নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এই দখলদার ব্যবসায়ীরা মোটেই ‘গরীব’ নন, বরং তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জায়গা দখল করে রেখেছেন। যখনই উচ্ছেদের কথা ওঠে, তখনই এক শ্রেণির সুবিধাভোগী মহল তাদের পক্ষ নিয়ে প্রশাসনকে বাধা দেয়। ফলে ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই। দীর্ঘ যানজটের কারণে সম্প্রতি এখানে বেশ কয়েকটি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

 জনস্বার্থে এবং মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকেরা।

মহাসড়কের উপর দোকান  বসানো এক ব্যবসায়ি জানান, বাজারে একটি দোকান ঘর নিতে গেলে মাসিক ভাড়া দিতে হয়। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিলসহ অনেক রকম বাড়তি খরচ লাগে। এজন্য দিনে ৫০ টাকা চাঁদা দিয়ে তিনিএমন সহজভাবে দোকান চালাচ্ছেন।

 

বনগ্রাম বাজারের বেশ কিছু ব্যবসায়ি জানান, বৈধভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে অবৈধ দোকানদারদের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। অনেক জিনিস রাস্তায় পাওয়া যায় বলে ক্রেতারা অনেক সময় দোকানে আসে না।  

এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। মহাসড়ক ও ফুটপাত দখল করে জনভোগান্তি সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে। দ্রুতই খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  

এদিকে  সড়ক ও জনপথ বিভাগ  (সওজ) পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী  মনসুরুল আজিজ  জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। তিনি তার অফিসের  উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

 

 

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/পাবনা
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!