ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

রবীন্দ্রসাহিত্যে সমাজচিন্তা: অধ্যয়ন ও অনুশীলনের প্রাসঙ্গিকতা

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী
প্রকাশিত: ১৩:২১, ৮ অক্টোবর ২০২৬
রবীন্দ্রসাহিত্যে সমাজচিন্তা: অধ্যয়ন ও অনুশীলনের প্রাসঙ্গিকতা
অধ্যাপক তাহমিনা আখতার উপাচার্য রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলা সাহিত্যাকাশে প্রদীপ্ত দিবাকর, বহুমুখী প্রতিভার ঐশ্বর্যময় অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। নানামাত্রিক চিন্তা-চেতনামুখী ভাবব্যঞ্জনা, রূপ-সৌন্দর্যমণ্ডিত দার্শনিক চিন্তা, সাহিত্য সংস্কৃতি এবং সমাজ বিশ্লেষণ ও উন্নয়নধর্মী চিন্তা নিয়ে গড়ে তোলেন এক সুবিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। 


তাঁর সাহিত্যের এক প্রজ্ঞাপূর্ণ দিক ব্যক্তি-মানুষ ও সমাজের কল্যাণ প্রত্যাশার অনুভব-উপলদ্ধিবোধ উৎসারিত স্বদেশী ঐতিহ্যধারার সম্পৃক্ততায় পথ খোঁজার আহ্বান। তাতে মানবপ্রেম ও মানবতাবাদ, ব্যক্তির সামর্থ্য-মর্যাদা, স্বাধীনতা, আত্মশক্তির স্ফুরণ-জাগরণ, বিকাশমানতা, দেশ-সমাজে মানুষের বঞ্চনাহীনতা, সম-অধিকার, প্রাপ্যতা এবং সামাজিক সম্পর্কবন্ধন মুখরতা ও দায়িত্বপরায়ণতা ইত্যাদির পথ-নির্দেশনা দিয়েছেন।


বাংলা সাহিত্যে অফুরন্ত সৌন্দর্য সৃষ্টির ক্ষমতা ও বহুমুখী প্রতিভা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবির্ভাব। তিনি বাংলা সাহিত্যের সব শাখাকে রূপ-সৌন্দর্যের ব্যাপকতায় বিশ্ব-সাহিত্য দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর সৃষ্টি স্বদেশী মৃত্তিকায় প্রোথিত হয়ে শতমুখী ভাবধারায় প্রবাহিত এবং ব্যক্তিজীবনের অনুভূতিতে বিশ্বজনীন ভাবরসে অভিষিক্ত।


রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ-জীবন পরিক্রমায় গড়ে তুলেছেন এক সুবিশাল সাহিত্য সম্ভার। সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ব্যাপকতা, প্রাচুর্য ও বৈচিত্রের দিক থেকে একমাত্র ভিক্টর হুগোর সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে। 


তিনি এক হাজারের অধিক কবিতা লিখেছেন, দ্বাদশটি নাটক লিখেছেন, আটটি উপন্যাস, অষ্টাধিক ছোটগল্পের গ্রন্থ, দুহাজারের অধিক গান-শুধুমাত্র যার বাণী নয়, সুরও তিনি দিয়েছেন। এছাড়া সাহিত্য ও সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি পল্লী উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীল সমাজ গঠন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রবন্ধ তাঁর আছে। ভ্রমণ কাহিনীও লিখেছেন অনেক। সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবেও তাঁর অবদান অস্বীকার করা যায় না।


রবীন্দ্রনাথ প্রথম থেকেই মানবতাবাদে দৃঢ়বিশ্বাসী। তিনি সমষ্টির চাইতে ব্যষ্টিকে, জনতার চাইতে ব্যক্তিকে, জাতীয়তার চাইতে বিশ্বমানবতাকে, ধর্মান্ধতার চাইতে যুক্তিকে শ্রেয় মনে করেছেন। তাঁর কাব্য চর্চায় ভাবপ্রসঙ্গ ও আঙ্গিক, ভাবকল্পনা ও অনুভূতি নানা রূপসৌন্দর্য সূত্রে ক্রমশঃ সুক্ষ্ম ও ব্যপকতা হয়ে বিশেষ থেকে সাধারণে, ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তরে, ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে, ব্যক্তি থেকে আন্তর্জাতিকতায়, একমুখী কল্যাণমুখিতা থেকে বিশ্বমানবতার অভিযাত্রী। 


প্রারম্ভিক পর্যায়ে এক অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতায় প্রকৃতি ও ব্যক্তিমনের বিচিত্র রং ও সুর কবি মানসের উন্মেষ লগ্ন সূচিত করে। আকৃষ্ট হন কবি জীবন ও জগতের প্রতি। দ্বিতীয় পর্যায়ে মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালী, কল্পনা, ক্ষণিকা ইত্যাদি কাব্যে কবিচিত্ত রোমান্টিক কল্পনা ও বিশিষ্ট জীবনদর্শন, বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলনাকুতি, জীবন দেবতার লীলাচেতনা, প্রেম ভাবনার অতীনিন্দ্রিতার উন্নয়ন প্রভৃতি ভাবচেতনায় বিকশিত হয়। 


মানসীতে কবি আশা দিয়ে ভাষা দিয়ে ভালবাসার নিগূঢ়ে জীবনে বিচিত্র গতিপথে মানস প্রতিমা গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত। সোনার তরী কাব্যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপ্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করেন এবং সাথে সাথে জীবন অর্থও নির্ধারণ করেন। তাতে মরমীবাদের স্পর্শে মানুষের চিন্তা ও কর্তব্য সংকল্পবদ্ধ জীবন চৈতন্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সংসার-জীবনে আদর্শ প্রেরণা ও কর্ম তাগিদের টানাপোড়েনে যে দ্বন্ধ-সংঘাত জীবনকে বিশৃঙ্খল করে তোলে তার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সুখপ্রাপ্তির নির্দেশনা দেন। 


রবীন্দ্র-কাব্য সাধনার তৃতীয় পর্বকে অধ্যাত্মভাবপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা যায়। নৈবদ্য, খেয়া, গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য প্রভৃতি এ পর্বের কাব্য। বলাকা, পূরবী, মহুয়া ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে রবীন্দ্রকাব্য প্রতিভার চতুর্থপর্ব বিকাশ পায়। ‘বলাকা’ যখন প্রকাশিত হয় (১৯১৬) তখন ইউরোপে প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বব্যাপী এ বিপর্যয়কে চিত্ত উদ্ঘাটন এবং প্রতিষ্ঠার জন্য কল্যাণকর মনে করলেন। সংগ্রাম এবং বিশৃঙ্খলা জীবনকে নিঃশেষ করে না, বরঞ্চ নবরূপে সজ্জিত করে। বলাকা’র কয়েকটি কবিতার রবীন্দ্রনাথ এ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

 
‘প্রান্তিক, আকাশ প্রদীপ, নবজাতক, রোগশয্যায়, আরোগ্য ইত্যাদি রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের পরিচয় বাহক। এখানে মরণপাড়ে দাঁড়িয়ে নতুন চিন্তা ও অনুভূতিকে নতুন ছন্দে রূপ দিতে রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে এলেন। মানুষকে মর্মান্তিক তীব্রতার সঙ্গে ভালবাসলেন। 


পালের হাওয়ার মতো কল্পনাতরীতে সংবাদ যেন ঠেকা দিয়েছে কখনো এ বাঁকে কখনো ও বাঁকে, কিন্তু পুঁথিগত আইনের সীমা থেকে দূরে। সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে পরিচিত নন। তবে বলিষ্ঠতা ও অসাম্য-অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এসব কবিতায় স্পষ্ট। বস্তুত তাঁর কবিতা ও ভাষা মানব বেদনা ও মনের সৌন্দর্যের শাশ্বত কল্যাণ কামনায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে। জগত-জীবনের সৌন্দর্যরূপের ছায়াতলে ব্যক্তির অন্তর সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও জ্ঞানের মুক্তিতে ব্যক্তিত্ব বিকাশ ঘটিয়ে বিশ্বজনীন মানবধর্মে মানবতার মুক্তির জয়গান করার তাগিদ বা তাড়না রবীন্দ্র কাব্যে আছে।


নাট্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ না হলেও জীবন সম্পর্কে নিজ বক্তব্য সচেতনভাবে প্রকাশ করেছেন। এগুলো চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি না হয়ে বিমূর্তভাবের রূপদান করেছে মাত্র। নিছক নাটক হিসেবে চিহ্নিত ‘বিসর্জন’ এবং ‘রাজা ও রানী’-এর মধ্যে বিসর্জনই হলো শ্রেষ্ঠ। 


‘বিসর্জন’ আমাদের ধর্মের একটা অর্থবিহীন নিষ্ঠুর সংস্কার ও আচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, আর এ প্রতিবাদ প্রথম দেখা দিয়াছে একটি বালিকার ক্ষীণকণ্ঠ হতে এবং সেই প্রতিবাদকে ভাষা দিয়েছেন গোবিন্দমাণিক্য। নাটকটির প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত চিরাচরিত প্রথার সঙ্গে সেই সংগ্রাম সর্বত্র মুখর হয়ে আসে, জয়-পরাজয়ের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তার বিরাম যেন নেই।


বাংলা সাহিত্যে প্রথম ও সার্থক ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথ। আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সংকীর্ণ ও অকিঞ্চিৎকর বহিঃপ্রকাশের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে জীবনের তলদেশে যে নিভৃত ফলধারাটি তা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। সেখানে ঘরের কোনে, নদীর ঘাটে, সহস্র তুচ্ছ পরিচিত ও আবেষ্টনে কত সহস্র তুচ্ছ ঘটনা খুঁটিনাটি উপলক্ষ করে আমাদের জীবনে বিচিত্র আশা-আকাঙক্ষা অবিরত স্পন্দিত হয়েছে, অসংখ্য ক্ষুদ্র বিক্ষোভ আন্দোলিত হয়েছে। 


আমাদের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে সেখানে অপরূপ মাধুর্য সুগভীর ভাররসে বিধৃত হয়ে আছে। আামাদের বৈচিত্রবিহীন বাইরের জীবনী সেখানে বৈচিত্রে ভরপুর, আবেগে চঞ্চল, সেখানে তার কোন দৈন্য নাই, কোন অভাব নাই। আমাদের সামাজিক দ্বন্দ ও অসঙ্গতি, রাষ্ট্রীয় বিক্ষোভ ও আত্মসম্মানবোধের বিকাশ, আমাদের শক্তি ও দুর্বলতা, দুঃখ ও ঐশ্বর্য, সব জড়িয়ে সবকিছুকে ঘিরেই আমাদের জীবন; সেই জীবন-স্রোতের উপরই অগণিত চরিত্রগুলির দৈনন্দিন লীলা। 


তার প্রেক্ষাপটে আমরা যখন পোস্টমাস্টার, রামসুন্দর, নিরুপমা, রামকানাই, শশিভূষণ, ধারামুকুন্দ, তারাপদ, হিমাংশু, বনবালী, গিরিবালা, চন্দরা, ছিদাম, দুখিরাম, ঈশান, কৈলাশচন্দ্র, বৈদ্যনাথ, মোক্ষদাসুন্দরী, প্রভৃতিদের দেখি তখন মনে হয়, এরাতো আমাদের ঘরের লোক, অথচ এদের পরিচয় এতকাল জানতাম না। 


এই গল্পগুলির মধ্যে কবিচিত্তের যে গভীর ভালবাসা, যে সহানুভূতিময় দৃষ্টি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র গভীর ঘনিষ্ঠ ও সমগ্ররূপ পাঠক চিত্তের নিকটতর করেছে, যে মধ্যবিত্ত ও পল্লীবাসী দরিদ্র বাঙালী সমাজ-মানসকে বিকশিত ও প্রস্ফুটিত করেছে, রবীন্দ্রপূর্ব বাংলা সাহিত্যে তার তুলনা  নেই।


রবীন্দ্রনাথের মোট উপন্যাসের সংখ্যা বারো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চোখের বালি, নৌকাডুবি, গোরা, ঘরে বাইওে, যোগাযোগ, শেষের কবিতা ইত্যাদি। চোখের বালি উপন্যাসে মানবচিত্তের বিভিন্ন জটিল বিশ্লেষণ আছে। তাতে সমাজ-আশ্রিত জীবন ও জীবনের আকাঙক্ষা। হিন্দু সমাজের সংস্কারকে জয়ের মালা পাড়ানো হয়েছে নৌকাডুবি উপন্যাসে। গোরা উপন্যাস একটি জাতির আশা-আকাঙক্ষা, ধর্ম ও সমাজের বিভিন্ন মতবাদ নিয়ে রচিত। 


গোরা উপন্যাসে এ সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ মানুষের এবং সমাজকে নির্যাতিত করে। তিনি মনে করেন, সকলের সমান অধিকারের মধ্যে সত্য উপলব্ধিতা নতুন যুগের জাতীয় চেতনার মূল শক্তি মনে করেছেন। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সত্যকে ভাস্বর করে তোলা হয়েছে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে। ‘মানুষের মধ্যে একটি শাশ্বত সত্তা আছে, তা স্বয়ং সম্পূর্ণ আত্ম-তত্ত্ব, অথবা পরিণামী ভাব বা আদর্শ-লোক, মানুষের এই সত্তা জন্ম থেকে জন্মান্তর ব্যাপ্ত করিয়া রহিয়াছে। 


এ উপন্যাসে আরো যে সত্যটি বেরিয়ে আসে তাহলো, ‘সমাজের সামগ্রিক অপরাধ প্রকাশটিকে যদি শয়তান আখ্যাদান করা যায়, তবে জ্ঞানের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের সামগ্রিক প্রকাশ রূপটি অবশ্যম্ভাবীরূপে যে হ্রাস পাইতেছে একথা সত্য; কিন্তু কয়েক সহস্র বৎসরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করিয়াও ইহাকে আমারা তেমন করিয়া উপলব্ধি করিতে পারি না।’


রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার স্পষ্ট ও ব্যাপকরূপ লক্ষ্য করা যায় তার বিভিন্ন প্রবন্ধ, পত্রালাপ ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রবীন্দ্রনাথ তাঁর মন-মানসকে নিজ জীবন-অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধ করেছেন বৃহত্তর সমাজ পরিবেশে। আবার নিজ অনুভব-উপলব্ধি সঞ্জাত বিভিন্ন চিন্তা ও কর্মকে একটি অন্তর্নিহিত ঐক্যসূত্রবন্ধতায় বৃহত্তর সমাজের হিতার্থে ব্যাপক ও গভীরভাবে প্রসারিত করেছেন। ফলে রবীন্দ্র সমাজ চিন্তায় ব্যক্তি ও সমাজ মুখ্য। তাতে সমাজের মধ্যে ব্যক্তি এবং ব্যক্তিকে দিয়ে রূপায়িত হলো সমাজ।


রাষ্ট্রনীতির চিন্তায় রবীন্দ্রনাথ নিজেকে জড়াতে কম আগ্রহী ছিলেন। তিনি সমাজের তুলনায় রাষ্ট্রকে খুব কমই গুরুত্ব দিয়েছেন এবং উভয়ের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করার পক্ষপাতী ছিলেন। রাজনীতির চলমানধারা তাকে নিরুৎসাহিত করে তুলেছিলো।

যার জন্য তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমরা আজকাল পলিটিক্স অর্থাৎ রাষ্ট্রগত স্বার্থপরতাকে সভ্যতার একটিমাত্র মুকুটমণি, বিরোধপরতাকেই উন্নতি লাভের একটিমাত্র পথ বলিয়া ধরিয়া লইয়াছি, আমরা পলিটিক্সের মিথ্যা ও দোকানদারির মিথ্যা বিদেশের দৃষ্টান্ত হইতে প্রতিদিন গ্রহণ করিতেছি, আর টাকাকে মনুষত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলিয়া জানিয়াছি। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, আত্নার স্বাধীনতা ছাড়া অন্য স্বাধীনতার মাহাত্ম্য নেই এবং মঙ্গল করবার স্বাধীনতাই স্বাধীনতা, ধর্মরক্ষার স্বাধীনতাই স্বাধীনতা। অর্থাৎ তাঁর কাছে স্বাধীনতা হলো মনের ব্যাপার যা অর্থনীতি বা রাষ্ট্রনীতিতে খোঁজার কোন যৌক্তিকতা নেই। এ কারণেই ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতার আবশ্যকতার বা মনের ঐশ্বর্যবৃদ্ধিতে রবীন্দ্রচিন্তার প্রসার ও বিকাশ বলা যায়।


রাজনীতির বিকল্প শক্তি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ আত্নশক্তি বিকাশকে গণ্য করতেন তাঁর এ আত্নশক্তি হলো ব্যক্তির শক্তি। সমাজের হিতার্থেই দরকার বিকশিত ব্যক্তি-শক্তি এরূপ ব্যক্তি শক্তিতেই সামাজিক কর্তব্যপালন, প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি আসবে। তিনি তাই বলেছেন, ‘বাইরের সকল কাজের ওপরেও একটি জিনিস আছে সেটা আত্নার সাধনা। রাষ্ট্রিক আর্থিক নানা গোলমালে যখন মনটা আবিল হয়ে উঠে তখন তাকে স্পষ্ট দেখতে পাইনি বলেই তাঁর জোর কমে যায়।’


রবীন্দ্রনাথ সমাজকে অনুভব-উপলব্ধি করেছেন স্পষ্টভাবে। এদেশে বিরাজমান আয়-ধন বৈষম্যের নির্মমতায় তিনি লেখেন, মোটকথা হচ্ছে দেশের যে অতিক্ষুদ্র অংশে বিদ্যাবুদ্ধি ধনবান সেই শতকরা পাঁচ শতাংশের লোকের সঙ্গে বিরানব্বই শতাংশের লোকের ব্যবধান মহাসমুদ্রের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। আমাদের মন-মননের দৈন্যতায় রবীন্দ্রনাথ আফসোস করতেন এবং সমাজ-চৌহদ্দীতে এ বিস্তার কীভাবে আমাদের আত্মপীড়িত ও অনগ্রসর রেখেছে তারও দৈন্যদশা তিনি আঁকতেন।


সমাজের দুর্ভাগ্য ও দীনতায় রবীন্দ্রচিত্ত শুধু ব্যথিতই হতো বরং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে আত্নশক্তির বিকাশে গুরুত্বারোপ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সমাজচিন্তায় সমষ্টির চেয়ে ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং ব্যক্তির বিকাশকে সকল মঙ্গলের চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করেন। 


কেননা তাঁর কথায় ব্যক্তিগত উৎকর্ষই মানব সমাজের স্থায়ী কল্যাণকর ও উন্নয়নের চাবিকাঠি। সমাজচিন্তা ও সমাজকল্যাণে ব্যক্তিমুখ্য হলেও তাকে আবার সমাজ সংশ্লিষ্টতাতেই দেখা হয়। সুতরাং বরীন্দ্র ভাবধারা আধুনিক সমাজকল্যাণ মূল্যবোধের সাথে অনেকাংশেই সঙ্গতিপূর্ণ।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
eMythMakers
Transform Your Digital Presence
Enterprise-grade IT & Web Solutions
Our Expertise
Custom Web Dev News Portals Mobile Apps SEO & Marketing
Ready to Scale Up?
Partner with industry experts today.
Get Started Now
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!