কৃষকরা বলেন, হলুদে গরু, ছাগল ও পোকা-মাকড়ের কোনো উপদ্রব নেই, ফসল হানির আশঙ্কাও কম। পরিত্যক্ত জমিতে হলুদের চাষ ভালো হয়। বাজারে মশলা জাতীয় পণ্য হলুদের চাহিদা অনেক, দামও অন্য ফসলের চেয়ে ভালো। এ কারণে ঘাটাইল, মধুপুর ও সখীপুর উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় হলুদের আবাদ দিনদিন বাড়ছে।
জেলা কৃষি অফিস জানায়, জেলার ১২টি উপজেলায় তিন হাজার ২০৮ হেক্টর জমিতে হলুদ চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৪৫ হেক্টর, বাসাইলে ২০, কালিহাতীতে ৩০, ঘাটাইলে এক হাজার ৪৫৬ হেক্টর, নাগরপুরে ৫০, মির্জাপুরে ১২৫, মধুপুরে ৯৮০, ভূঞাপুরে ১৫, গোপালপুরে ৩৭, সখীপুরে ৩৫০, দেলদুয়ারে ৮০ ও ধনবকাড়ী উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে হলুদ আবাদ করা হয়েছে।
.png)
উর্বরতা ও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি হলুদ চাষের জন্য ভালো। তবে সবচেয়ে উত্তম দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ লালমাটি। জেলার ঘাটাইল, মধুপুর ও সখীপুর উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ লালমাটি অধিক পরিমাণে রয়েছে। ফলে জেলার ওই তিন উপজেলায় মশলা জাতীয় পণ্য হলুদের আবাদ সবচেয়ে বেশি হয়েছে।
হলুদের স্থানীয় জাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- হরিণপালি, আদাগতি, মহিষবাট, পাটনাই, আড়ানী ইত্যাদি। তবে উচ্চফলনশীল ডিমলা ও সিন্দুরী নামে দুটি জাতের হলুদ রয়েছে। ডিমলা জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ৩ গুণ এবং সিন্দুরী জাতটি স্থানীয় জাতের তুলনায় ২ গুণ ফলন বেশি দেয়। দুটি জাতই লিফ ব্লাইট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বারি হলুদ-৩, বারি হলুদ-৪, বারি হলুদ-৫ জাতের হলুদ চাষ করে কৃষকরা আশানুরূপ ফলন পাচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলেন, হলুদকে অনেকসময় ‘মিরাকল হার্ব’ বা অলৌকিক ভেষজ বলা হয়ে থাকে। হলুদ আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি মশলা। রোজকার রান্নায় হলুদ না দিলে রান্নাটাই যেন কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয়। মশলা জাতীয় ফসল হলুদ বাঙালি তো বটেই প্রায় গোটা এশিয়ার রান্নাতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি উপাদান।
হলুদে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি-৬, ম্যাগনেশিয়াম ও ভিটামিন সি থাকে এবং কারকিউমিন নামক রাসায়নিক থাকে- যা বিভিন্ন রোগের হাত থেকে মানুষকে বাঁচায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচা হলুদ খেলে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে, খাবার ঠিকমতো হজম হয়। মশলা হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও অনেক ধরণের প্রসাধনীর কাজে ও রং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে হলুদ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
জানা যায়, মধুপুর উপজেলার জয়নাতলী, ভুটিয়া, অরণখোলা, বেরিবাইদ, কুড়াগাছা, মমিনপুর, মিজার্বাড়ি, গাছাবাড়ি এলাকায় হলুদ চাষ হয়েছে। মধুপুরে এ বছর ৯৮০ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর ৭৬০ হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ছিল ৯ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি হলুদ উৎপাদন হয়েছিল। কোনো প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে এ বছর মধুপুরে প্রায় ৫৮ কোটি টাকার হলুদ বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন কৃষকরা।
উপজেলার মির্জাবাড়ি ইউনিয়নের ব্রাক্ষ্মণবাড়ি গ্রামের হলুদ চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছরের মতো এ বছরও হলুদ রোপণ করেছি। সাথী ফসল হিসেবে অন্য ফসলের সঙ্গে বেশিরভাগ উঁচু জমিতে হলুদ চাষ করা হয়েছে। অন্য ফসলের তুলনায় হলুদ চাষ অনেকাংশে সহজ ও লাভজনক। প্রতি বিঘায় সব মিলিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতি বিঘায় ৭০ থেকে ৮০ মণ হলুদ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজার মৃল্য আশানুরূপ পাওয়া গেলে বিঘা প্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ হবে বলে আশা করছি।
কৃষক বাপ্পি বলেন, হলুদের কন্দ রোপণের পর পরিপক্ক হতে জাতভেদে ৭ থেকে ১০ মাস সময় লাগে। যখন গাছের নিচের পাতা হলুদ হয়ে আসে এবং গাছটি মরে যেতে শুরু করে তখন ফসল তোলার জন্য প্রস্তুত হয়- যা সাধারণত শীতকালে দেখা যায়। তবে হলুদ চাষে খুব একটা ঝামেলা পোহাতে হয় না। সার ও কীটনাশকও ব্যবহার করতে হয় খুবই কম। প্রতি বিঘা জমি হলুদ চাষের জন্য খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। উৎপাদন ভালো হলে খরচ বাদে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাভ থাকে।
মধুপুর উপজেলার আনারশিয়া গ্রামের কৃষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি দুই বিঘা জমিতে হলুদ চাষ করেছি। খরচ বাদ দিয়েও প্রায় ৭০ হাজার টাকা লাভ হবে মনে হচ্ছে। আগের চেয়ে এ বছর ফলন অনেক ভালো।
মধুপুরের গোলাবাড়ি এলাকার তরুণ কৃষক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, আমরা কয়েকজন মিলে একত্রে হলুদ চাষ শুরু করেছি। এখন চাহিদা বেশি, তাই ব্যবসায়ীরা আগেভাগে বুকিং দিচ্ছে। এই ফসল আমাদের গ্রামে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা বলেন, হলুদ বছরব্যাপী ফসল হওয়ায় সাথী ফসল হিসেবে কৃষকরা এর আবাদ করে থাকে। হলুদে তেমন কোনো রোগবালাই নেই বললেই চলে। ফলে চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। হলুদের কন্দ রোপণ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকতার্রা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের আবাদ দেখভাল করে থাকেন।
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ দুলাল উদ্দিন বলেন, জেলার পাহাড়ি অঞ্চল বা উঁচু এলাকায় সাধারণত হলুদ সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। হলুদে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি মশলা জাতীয় পণ্য। কাঁচা হলুদের ন্যূনতম ৪৬টি ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে। এবার জেলায় হলুদের বাম্পার ফলন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারে দাম ভালো থাকলে কৃষকরা লাভবান হবে।