এই ঐতিহাসিক যুদ্ধের এক অন্যতম যোদ্ধা ছিলেন খন্দকার লিয়াকত আলী, যিনি ডেইলি বাংলাদেশকে যুদ্ধের নানা স্মৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
যুদ্ধের প্রস্তুতি: খন্দকার লিয়াকত আলী জানান, ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। স্থানীয় নান্নু মিয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, পাক বাহিনীতে থাকা ৪ জন বেলুচ যোদ্ধা আমাদের সাথে যোগ দিতে চায়। তাদের সাহায্যে আমরা লেছড়াগঞ্জের সুতালড়ি ক্যাম্পে আক্রমণের পরিকল্পনা করি। নৌকাযোগে ১২ থেকে ১৫টি নৌকায় আমরা ক্যাম্প আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হই। ক্যাম্পের কাছের বুড়ির বটতলায় আমাদের বাহিনীর একটি দল অবস্থান নেয়।
.png)
যুদ্ধের সীমানা ও সংঘর্ষ: পাক সেনারা খেতে বসবে, এমন সময় আমরা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু, আমরা পজিশন নিতে না নিতেই ক্যাম্পের ভেতর থেকে প্রচণ্ড ব্রাশ ফায়ারের আওয়াজ আসে। আমি হতবম্ব হয়ে বুঝতে পারি, আমাদের পরিকল্পনা আগেই ফাঁস হয়ে গেছে। তাই আমি তখনই সংকেত দিই, এবং আমাদের বাহিনী গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময়, পাক সেনারা দৌড়ে ক্যাম্পের ভেতর থেকে পালানোর চেষ্টা করে।
আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধের ফল: আমরা ক্যাম্পের ভেতর প্রবেশ করার পর বেলুচ সেনারা আমাদের কাছে এসে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। তারা জানায়, ক্যাম্পে আর কোনো পাক সেনা নেই। এরপর আমরা ক্যাম্পের ভেতর লাশগুলোর সন্ধান পাই। সেখানে ৭-৮ জন নারী বিবস্ত্র অবস্থায় বন্দী ছিল। তাদের হাত বাঁধা ছিল। আমরা তাদের বাঁধন খুলে দিই এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।
অস্ত্র সংগ্রহ: এরপর, আমরা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র। এর মধ্যে ছিল ২টি এলএমজি, ১ টি মর্টার, ৮৫টি চাইনিজ রাইফেল, ৩০৩ রাইফেল, এবং প্রচুর গোলাবারুদ। আমরা বেলুচদের কাছ থেকে ৪টি এলএমজি উদ্ধার করি। এই যুদ্ধ আমাদের বাহিনীর জন্য ছিল অত্যন্ত স্মরণীয়, কারণ এত পরিমাণ পাক সেনা নিহত এবং বিপুল অস্ত্র উদ্ধার এই যুদ্ধে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরাট অবদান রেখেছে।
লাশের মাটি চাপা ও নিহত সেনাদের সংখ্যা: ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে একত্রে ৫৩টি লাশ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ১০-১৫টি বাঙালি ছিল বলে আমরা ধারণা করি। তাদের অধিকাংশের বাড়ি বরিশালে ছিল। আমরা তাদের লাশ খুঁড়ে বাংকারে একত্রিত করে মাটিচাপা দিই। পরবর্তীতে, এক পাক সেনাকে হত্যা করা হলে নিহত পাক সেনাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ জন।
শেষ মুহূর্তে দুর্ঘটনা: যুদ্ধের শেষে, আমরা ক্যাম্পের ওয়্যারলেস অফিস ধ্বংস করতে পেট্রোল দিয়ে আক্রমণ করি। কিন্তু পেট্রোল ভর্তি ড্রাম বিস্ফোরিত হয়ে মাহফুজুর রহমান খান গুরুতরভাবে দগ্ধ হন। পরে তিনি ১৬ অক্টোবর শাহাদাত বরণ করেন। এই যুদ্ধ আমাদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে সফলতার মাধ্যমে আমরা একদিকে যেমন হানাদার মুক্ত করেছি হরিরামপুর, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদও পেয়েছি। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
হরিণা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা শুধুমাত্র একটি সফল অভিযান চালিয়ে হানাদার মুক্ত হরিরামপুর প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং এর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগ্রামে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। খন্দকার লিয়াকত আলীর মতো বীর যোদ্ধাদের সাহস, একাগ্রতা ও আত্মত্যাগের গল্প আজও আমাদের ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।