ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

শিল্পবর্জ্যে অস্তিত্ব সংকটে নদী-খাল

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ১৩:২৬, ২২ জুন ২০২৪
শিল্পবর্জ্যে অস্তিত্ব সংকটে নদী-খাল
অস্তিত্ব সংকটে ময়মনসিংহের নদী-খাল

একসময় ময়মনসিংহের ভালুকার খিরু নদীতে মানুষ গোসল করতেন। গবাদি পশু পানি পান করত। গৃহিণীরা রান্নার কাজে নদীর পানি ব্যবহার করতেন। কিন্তু গত ১৫ বছরে খিরু নদীটি ধ্বংসের দারপ্রান্তে। খিরু নদী এখন এতটাই দূষিত যে, এর কালো পানির দুর্গন্ধে নদীর পাশ দিয়ে রাস্তা-ঘাটে হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদে একাধিকবার মানববন্ধন করা হয়েছে। সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসন ও ময়মনসিংহের পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা আশ্বাস দিলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি!

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এই নদীর পানিতে গবাদি পশুকে গোসল করালে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হয়। এই পানি ফসলি জমিতে ব্যবহার করা হলে গাছ দুর্বল হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষ এই পানি স্পর্শ করলে অসুস্থ হয়ে যায়। কোনো মাছও এখানে বেঁচে থাকতে পারে না।

মূলত শিল্প কারখানার বর্জ্য নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে ফেলার কারণেই পানির রঙ কালো হয়েছে। উপজেলায় ডাইং, কম্পোজিট, ওয়াশিং, সিরামিক, টাইলস ও ব্যাটারি তৈরির চার শতাধিক ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প-কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে অনেকগুলোতে নেই বর্জ্য শোধনাগার। 

Advertisement

যেগুলোতে আছে- ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। দূষিত বর্জ্য ও রাসায়নিক মিশ্রিত নানা রঙয়ের পানি বড় বড় ড্রেনের মাধ্যমে নদী-নালা, খাল-বিলে পড়ছে। ভয়ঙ্কর গন্ধের সঙ্গে পিচের মতো কালো পানি দিনরাত পড়ছে গড়গড়িয়ে। এতে পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নানা দুর্ভোগে নাকাল হচ্ছে এলাকাবাসী। এছাড়া দখলও হয়েছে খিরু নদীসহ উপজেলার অনেক খাল-বিলের জায়গা। দিন যত যাচ্ছে ততই এগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশে কাঠালী গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ধোপাজান খাল। এর বিভিন্ন অংশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে প্রভাবশালীরা মাটি ভরাট করে খালের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বেইত্যাগুনি খাল প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে মাটি ভরাটের পর স্থাপনা নির্মাণ করেছে। উপজেলার হবিরবাড়ি ও পাড়াঁগাও এলাকার লাউতি খালের অনেক অংশ দখল হয়ে গেছে। পৌর এলাকায় গজারিয়া খালটির অনেক অংশও দখল হয়েছে। এগুলো ছাড়াও আডাইয়ের খাল, বিলাইঝুড়ি খাল এবং ভালুকার প্রধান নদী খিরুসহ খাল-বিলের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে।

পৌর এলাকার বাসিন্দা জাহিদুর রহমান বলেন, সময় যত যাচ্ছে ততই নদী, খাল-বিল অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। পানি কালো হওয়ার কারণে স্পর্শ করতেও ভয় হচ্ছে।

নদীতে মিশছে দূষিত বর্জ্য ও রাসায়নিক মিশ্রিত পানি

তোফাজ্জল হোসেন বলেন, একসময় নদী ও খাল-বিলগুলোতে প্রচুর পানি থাকলেও অনেকগুলো এরই মধ্যে নিশ্চিহ্নের পথে। নদী ও খাল-বিল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লাউতির খালের পাশাপাশি স্থানে প্রায় ১০ বছর ধরে উৎপাদন করছে এক্সিলেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ (টাইলস এবং সিরামিক) নামে শিল্প কারখানা। গড়ে তোলা এই কারখানার তরল বর্জ্য বেশ কয়েকটি ড্রেনের মাধ্যমে খালে ফেলা হচ্ছে। 

ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (ইটিপি) বিষয়ে জানতে চাইলে কারখানাটির এইচআর এন্ড অ্যাডমিনের ম্যানেজার হাসিবুল ইসলাম বলেন, আমাদের ইটিপি চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। কাজ শেষ। আমরা শিগগিরই ইটিপি উদ্বোধন করব।

আর্টি কম্পোজিট ডায়িং লিমিটেডের এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন ম্যানেজার আল আমীন বলেন, খালের নিচে কালভার্ট স্থাপন করে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এখান দিয়েই বর্জ্য পানিতে যাচ্ছে। 

তিনি বলেন, বর্জ্য খালের পানিতে না ফেলে অন্যত্র ফেলা সম্ভব না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ভালুকা উপজেলার আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ আশরাফুল হক জর্জ বলেন, অনেক কারখানায় ইটিপি রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগই তাদের খরচ কমানোর জন্য তা বন্ধ রাখে। যদি ইটিপি চালু থাকত, তাহলে পানির রঙ এতটা কালো হতো না এবং এমন দুর্গন্ধও থাকত না। ওয়াশিং, সিরামিক, টাইলস, রাসায়নিক ও ব্যাটারি কারখানায় উৎপাদিত ক্ষতিকর বর্জ্য সরাসরি নদী, খাল-বিলে পড়ছে। বিশেষ করে খিরু নদীর পানি বিষের চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। এই পানি পান করে গরু ও হাঁস মারা যাওয়ার প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। এমনকি এই নোংরা পানির সংস্পর্শে আসলে মানুষ রোগে আক্রান্ত হয়।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারহান লাবীব জিসান বলেন, যারা নদী কিংবা খাল-বিল দখল করে, তারা অতি গোপনে এই অনৈতিক কাজগুলো করে থাকে। খালের জমি দখলমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

পরিবেশ অধিদফতর ময়মনসিংহের উপ-পরিচালক দিলরুবা আহমেদ বলেন, ইটিপি সব কারখানায় চালু থাকলে পানির এই অবস্থা হতো না। নিয়মিত কারখানাগুলো পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে জরিমানাও করা হচ্ছে। দ্রুত আবারো অভিযান চালানো হবে। ইটিপি না থাকলে কিংবা বন্ধ রাখলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!