ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চালক-সুপারভাইজারের মৃত্যু নিয়ে গল্প সাজিয়েছেন হেলপার: পুলিশ

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:২১, ১০ এপ্রিল ২০২৪
চালক-সুপারভাইজারের মৃত্যু নিয়ে গল্প সাজিয়েছেন হেলপার: পুলিশ
ছবি: সংগৃহীত

সাভারের আশুলিয়ায় বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে যাত্রীদের মারধরে চালক ও সুপারভাইজারের মৃত্যু হয়নি। বরং আরেকটি বাসের চাপায় তারা নিহত হয়েছেন। নিজেকে বাঁচাতে যাত্রীদের মারধরের গল্প সাজিয়েছেন সেই বাসের হেলপার। আর তিনিই তখন চালকের আসনে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও হেলপারকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। 

ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত সোমবার (৮ এপ্রিল) আশুলিয়ার ডিইপিজেড এলাকায় নবীনগর-চন্দ্রামুখী মহাসড়কের লেনে ইতিহাস পরিবহনের একটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর একটি দূরপাল্লার বাস পাশ দিয়ে চলে যায়। এরপর বাসের গেট ঘিরে মানুষের ভিড়। যাত্রীরা যে যার মতো নামছেন। কিছুক্ষণ পর দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। 

জানা যায়, হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পর মারা যান ইতিহাস পরিবহনের বাসটির চালক সোহেল রানা ও সুপারভাইজার হৃদয়। তাদের সঙ্গে থাকা বাসের হেলপার আব্দুর রহমান দাবি করেছিলেন, বাড়তি ভাড়া নিয়ে বিতণ্ডার জেরে যাত্রীরা তাদের মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিলে তাদের মৃত্যু হয়। এ সময় আব্দুর রহমান প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যান। 

Advertisement

প্রত্যক্ষদর্শী সুমন শেখ বলেন, ওইদিন আমি আমার পরিবারের লোকজনকে গাড়িতে তুলে দিতে আসি। এ সময় দেখতে পাই, ইতিহাস বাসের গেটে দুজন ঝগড়া ও হাতাহাতি করছে। এরপর একটি বড় বাস তাদের ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। এরপর তাদের নিচে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। আর বাসের ভেতরে চালকের আসনে বসে থাকা কালো গেঞ্জি পরা এক লোক জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আহত দুজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ ও লোকজন। 

এদিকে নিহতদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনানসহ প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয় পুলিশের। ঘটনার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করলে বেরিয়ে আসতে শুরু করে আসল ঘটনা। 

হেলপার দাবি করা আব্দুর রহমান মঙ্গলবার (৯ এপ্রিল) বিকেলে পুলিশকে বলেন, ঘটনার সময় যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছিল। তখন চালক সোহেল রানা বাবু আমাকে গাড়ি চালাতে বলে ঝামেলা মেটানোর জন্য নিজেই গেটের কাছে আসেন। এ সময় সোহেল ও সুপারভাইজার হৃদয় মিলে সড়ক থেকে যাত্রীদের ডাকছিলেন। বাড়তি ভাড়া নিয়ে ভেতরে যাত্রীদের সঙ্গে তর্ক-বির্তকও চলছিল। এ সময় আরেকটি বাস গেটে থাকা বাবু ও হৃদয়কে ধাক্কা দেয়। তারা রাস্তায় পড়ে যান। আমি ভয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে পালিয়ে যাই। একটু পরে আবার ফিরে এসে অনেকের সঙ্গে মিলে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাই।

নিহত সুপারভাইজার হৃদয়ের ভাই আতিকুর রহমান বলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ও লোকজনের কথা শুনে মারামারি হয়েছে কি না, তেমন বুঝতে পারিনি। শুনেছি, গাড়ি চাপা দেওয়ায় তারা মারা গেছে। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাই। 

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী বলেন, হেলপার আব্দুর রহমান নিজেকে বাঁচাতে যাত্রীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসেন। আমরা যেটি পেয়েছি, প্রথমত সাংবাদিকদের কাছে তার যে বক্তব্য বা পুলিশ অফিসারের কাছে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাতে আমাদের খানিকটা সন্দেহ হয়। কেননা, তার বক্তব্য অনুযায়ী ১০-১২ কিংবা ১৫ জন মিলে বাস থেকে নামিয়ে দুইজনকে পিটিয়ে আহত করেছে। আহত করার পর তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের মৃত্যু হলে পুলিশ যখন সুরতহাল করে। আরো অফিসাররা যখন সেখানে যান, তখন ইনজুরি মার্ক (আঘাতের চিহ্ন) যে রকম থাকার কথা, সেই মার্ক বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় না। একজনের বুকে, অন্যজনের মাথার দিকে খানিকটা আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ১০ থেকে ১২ জন মিলে কাউকে আঘাত করলে কিংবা পেটালে যেরকম ইনজুরি হওয়ার কথা, সে রকমটি পরিলক্ষিত না হলে আমাদের সন্দেহ হয়।

তিনি আরো বলেন, পরে আমরা একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে পাই, যিনি আমাদের জানান, এখানে আরেকটি বাস চলে এলে দুইজন দুই বাসের মাঝখানে চাপ খেয়েছেন। পরে তাদের হাসপাতালে নিলে সেখানে মৃত্যু হয়। আমাদের হাইওয়ে পুলিশের র‍্যাকার কর্মকর্তা ওই বাস সড়ক থেকে সরিয়ে নিতে গিয়েছিলেন, তার বক্তব্যেও সেখানে মারামারি হয়েছে এরকম কোনো বক্তব্য পাইনি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, অর্থাৎ বাসে যিনি ছিলেন তিনি নিজেকে বাসের হেলপার পরিচয় দিয়ে এ ঘটনাগুলো বলেছিলেন, তার সঙ্গে আবারো আমরা কথা বলি। একপর্যায়ে তিনি প্রাথমিকভাবে এরকম বলেন যে, আসলে স্টিয়ারিংয়ে তিনি নিজেই ছিলেন। ওই সময় তিনি নিজেই বাস চালাচ্ছিলেন।

হেলপারের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ওই হেলপার বাস চালানোর একপর্যায়ে অন্য আরেকটি পরিবহন পাশ দিয়ে যায়। বাসটি ‘মা-বাবার দোয়া’ এরকম নাম আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখেছি। বাসটি যখন ওভারটেক করতে যাচ্ছিল, তখন তিনি (হেলপার) আগে থাকার জন্য প্রতিযোগিতা করে বাম দিকে গাড়ি চাপান। তখন দুজনের একজন বাসের পাশেই রাস্তায় ছিলেন, আরেকজন মনে হয় বাসের গেটের দিকে ছিলেন। বাসটি যখন জরুরি ভিত্তিতে বামে চাপাতে যান হেলপার, তখন অপর বাসের সঙ্গে ওই দুই ব্যক্তির ধাক্কা লাগে। তারা চাপ খেয়ে পড়ে যান। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। প্রাথমিক তদন্তে আমরা এতটুকু পেয়েছি। ময়নাতদন্ত করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে যে রিপোর্ট ডাক্তাররা দেবেন এবং আমাদের তদন্ত আরো বাকি রয়েছে। 

প্রাথমিকভাবে হেলপার আব্দুর রহমান যা বলেছেন, তার সঙ্গে আজকের বক্তব্যের মিল নেই উল্লেখ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী বলেন, ঘটনা ঘটার পর বাস থেকে লাফিয়ে তিনি পালিয়ে গেছেন। এটি প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য। আজকে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে যে, যেহেতু দুইজন মারা গেছেন, হয়তো মামলা হতে পারে, জেল হতে পারে, শাস্তি হতে পারে, এ জন্য ওই ঘটনা বলেছেন তিনি। 

কারণ, তার যে দুজন সঙ্গী ছিলেন, দুজনই মারা গেছেন। আর এত ব্যস্ত সড়কে হয়তো বিষয়টি কেউ খেয়াল করবে না, আর এভাবে বললে এটি বিশ্বাসযোগ্য হবে—এমনটি ভেবেছিলেন বলে স্বীকার করেছেন হেলপার আব্দুর রহমান।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!