ভ্যান চালিয়ে বিএ পাশ, স্বপ্ন এবার মাস্টার্স
নাম হায়দার আলী। পেশায় একজন ভ্যানচালক। অভাব অনটন আর নিয়তির সঙ্গে লড়াইটা সেই শৈশব থেকেই। তবে পড়াশোনার নেশাটা ছিল অঘাত। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক, ২০১৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসিসি) আর ২০২৪ সালে করলেন বিএ পাস। এবার স্বপ্ন মাস্টার্স অর্জন করার।
হায়দার আলী (৪৭) পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার শেখ মাটিয়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের মৃত কাঞ্চন খানের ছেলে। অভাব অনটন আর নিয়তির সঙ্গে লড়াইটা সেই শৈশব থেকে। তবে পরাজিত সৈনিক নন বরং অপরাজিত নায়কের মতো বাঁচার প্রত্যয়ে চলছে তার জীবন সংগ্রাম।
কখনো ভ্যান চালানো, দিনমজুরের কাজ কিংবা মাছ ধরা এ তার জীবিকার উৎস। এভাবেই এসএসসি ও এইচএসসি পাস তার। এরপর ২০১৮ তে নাজিরপুর কলেজে ডিগ্রিতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাউবি) ভর্তি হন তিনি। বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বাউবির বিএ/বিএসএস এর প্রকাশিত ফলে ২.৮৩ (জিপিএ) পেয়ে উত্তীর্ণ হন হায়দার আলী।
জীবনে কোনো কিছুই বাধা হতে পারেনি হায়দার আলীর শিক্ষা অর্জনের পথে। ভ্যান চালানোর পাশাপাশি লেখাপড়া শেখার অদম্য আগ্রহের কারণে রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে এবং দিনে ভ্যান চালানোর ফাঁকে ফাঁকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতেন হায়দার। ইংরেজিতে তার বেজায় দখল। কথায় কথায় ইংরেজি বলার প্রাকটিস ও নতুন শব্দ শেখার আগ্রহ তার শব্দ ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। রেডিওতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক বিশ্বের সংবাদ শোনাও তার নেশা।
ব্যক্তিগত জীবনে হায়দার আলী ৪ সন্তানের জনক। হায়দার আলী ১৯৯৪ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাস করেন। সংসারের অভাব অনটনের কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে হয় তার। দীর্ঘ শিক্ষা বিরতির পর ২০১৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এইচএসসিতে ভর্তি হন। পরিবারের ঘানি, স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ আর দায়িত্ব পালনের পরেও ৩.৮৩ পেয়ে এইচএসসিতেও এলাকায় চমক দেখান তিনি।
ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৩০০ টাকা আয় হয় তার। পৈতৃক সম্পত্তির মধ্যে তার একটি ঝুপড়ি ঘর আর মাত্র তিন শতাংশ জমি আছে।
হায়দার আলী বলেন, এবার আমার স্বপ্ন উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন। যত বছরই লাগুক আমি এমএ পাস করবই করব। চাকরি প্রাপ্তির জন্য না, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার বাসনা থেকে এ শিক্ষা অর্জন করছি। তারপরও যদি একটি অন্য কাজ পেতাম, পরিবার পরিজন নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারতাম।
বাউবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, হায়দার আলী একটি সাহসের নাম। সংগ্রামী, পরিশ্রমী, দৃঢ়, অপরাজিত, স্বপ্নবান একজন। শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের আদর্শ তিনি। এ রকম মানুষের পাশে সবসময় রয়েছে বাউবি।
শেখ মাটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান চৌধুরী নান্নু বলেন, মানুষের ইচ্ছা শক্তি ও পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে তবে সফলতার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। এটি আমাদের জন্য আনন্দদায়ক বিষয়ক। যদি কখনো তার প্রয়োজন হয় সহযোগিতার তবে আমি তাঁর পাশে দাঁড়াব।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতিমা আজরিন তন্বী বলেন, সমাজসেবায় একটি শিক্ষাবৃত্তি চালু আছে। যদি হায়দার আলী আবেদন করেন তাহলে তাকে সেই শিক্ষাবৃত্তি দিতে পারবো।