পাবনা সদর উপজেলার চোমরপুর কদমতলা গ্রামে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তার নামেই এ খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন আমির সোহেল মিলন। তিনি জাপানে নাবিকের চাকরি ছেড়ে গ্রামে এসে এমন উদ্যোগ নেন। এ ধরনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ অনুসরণ করলে অন্যরাও লাভবান হতে পারেন বলে জানায় প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
মাস্টার্স করা উদ্যোক্তা মিলন পাবনা সদর উপজেলার চোমরপুর কদমতলা গ্রামের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। মিলন দম্পতি এখন এলাকার বেকার যুবকদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন। তার সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন নতুন খামারিরা।
.png)
সরেজমিন দেখা গেছে, কয়েক বিঘা আয়তনের বাড়িতে নির্মিত হয়েছে জান্নাত এগ্রো ফার্ম। একাধিক পাকা শেড তৈরি করা হয়েছে। খামারের ভেতর-বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খামারের পাশেই গো-খাদ্যের জন্য উন্নত জাতের ঘাস চাষ করা হয়েছে।
মিলন জানান, জাপানে চাকরি করলেও তার মন পড়ে থাকতো গ্রামে। তিনি পরিকল্পনা করতেন গ্রামেই কোনো উদ্যোগ নিবেন। প্রাণের টানেই তিনি খামার করছেন বলে জানান। খামার করার প্রতি আগ্রহ থাকায় বছর পাঁচেক আগে তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে করেছেন জান্নাত এগ্রো খামার। স্ত্রীর নামে প্রতিষ্ঠিত খামারটিতে এখন অর্ধ শতাধিক ষাঁড় এবং গাভি রয়েছে। এখন বছরে তিনি শতাধিক গরু মোটাতাজাকরণ করার পরিকল্পনা করছেন। বাংলাদেশ কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাইরে থেকে গরু আনার প্রয়োজন হয় না। এতে করে নতুন নতুন খামারি আসছে।
_1699268471.jpg)
তরুণ ও বেকারদের উদ্দেশ্যে মিলন বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার বিকল্প নেই। আধুনিক খামার করে দেখিয়ে দিচ্ছি দেশে শ্রম দিলে জাপান বা অন্য দেশে থাকার দরকার নেই। শ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে দেশে থেকেই অনেক আয় করা সম্ভব। খামারে বর্তমানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। আমার স্বপ্ন আছে শতাধিক শ্রমিক এই খামারে কাজ করবে। এতে করে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
তিনি বলেন, সবার আগে ক্রেতার সন্তুষ্টির কথা চিন্তা করি। সতেজ হৃষ্টপুষ্ট গরুতে মানুষের আগ্রহ বেশি। ক্রেতা খুশি হলে আমাদের প্রচার এমনিইতেই হবে। কারণ দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করছি।
মিলনের স্ত্রী শাকিলা ফেরদৌস জানান, স্বামীর বাইরের অনেক কাজ সামলাতে হয়। সেজন্য সার্বক্ষণিকভাবে খামার দেখভাল করে থাকেন। গো-খামারের পাশাপাশি তিনি হাঁস- মুরগি ও ছাগল পালন করেন। শুরুতে তার গো-খামার করার কথা শুনে অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করতেন। এমনও বলেছেন, ঢাকার খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে শেষে কিনা গরুর খামারে! এখন তারাই সাফল্য দেখে প্রশংসা করছেন।
মিলন জানান, ষাড় পালনের পাশাপশি তারা গাভি পালন করছেন। গাভি পালন করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন গো-খাদ্য নিয়ে। গত ১০ বছরে মধ্যে গো-খাদ্যের দাম ৫-৬ গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে। এজন্য খামারকে লাভবান করার জন্য তিনি একটি বিশেষ কৌশল হাতে নিয়েছেন বলে জানালেন। খামারে প্রতিদিনের উৎপাদিত শতাধিক লিটার দুধের দই তৈরি করছেন। সে দই পাবনা শহরে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। এতে তিনি ক্ষতি কাটিয়ে ভালো মুনাফা করছেন।
মিলনের বাবা সাদুল্লাপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুস জানান, তার সহায় সম্পদ মোটামুটি রয়েছে। তার উচ্চ শিক্ষিত ছেলে জাহাজের নাবিক ছিল ভালো বেতনও পেতো। তবে ছেলে শুধু টাকার জন্য বিদেশে পড়ে থাকুক তা তিনি চাননি। তিনি আশা করতেন ছেলে দেশে এসে কোনো উদ্যোগ নিক। এতে তার আয় হওয়ার পাশাপাশি এলাকার কিছু যুবকদেরও কর্মসংস্থান হোক। তার ছেলেও গ্রামে এসে উদ্যোক্তা হতে চেয়েছিল। তার উদ্যোগ সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, ছেলের খামারটিকে তিল তিল করে বেড়ে উঠতে দেখছি। আজ সে সফল উদ্যোক্তা হয়েছে। গ্রামের অরো কয়েকজন যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সে এখন অনেক বেকার যুবকের অনুপ্রেরণা। আমি বাবা হিসেবে তাদের পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফ হোসেন জানান, মিলন যে খামার করেছেন তা এলাকায় একটি দৃষ্টান্ত। উচ্চ শিক্ষিত এ দম্পতি বেশ কিছু লোকের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছেন।
আনসার ভিডিপি ব্যাংকের সাবেক পরিচালক আব্দুল খালেক জানান, এ দম্পতি আনসার ভিডিপির সদস্য। তাদের দেখাদেখি আনসার ভিডিপির অন্য সদস্যরাও উৎসাহিত হবে।
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আল মামুন হোসেন মন্ডল বলেন, দুধের দাম কম বলে মিলন দম্পতি দই তৈরি করে বিক্রির যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা একটি সৃজনশীল চিন্তা। যেটা তাদের সাফল্য দিয়েছে। তাদের দেখাদেখি অন্য শিক্ষিত যুবকেরা উৎসাহ পাবে।