ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

নৌকার দোলায় চলে বেচাকেনা

মো. তামিম সরদার, পিরোজপুর
প্রকাশিত: ১১:৩৪, ১ জুন ২০২৩
নৌকার দোলায় চলে বেচাকেনা
নাজিরপুরে অর্ধশত বছরের ভাসমান হাট

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নদীর বুকে নৌকায় বসে হাট। নৌকায় ঢেউয়ের তালে তালে চলে শাক-সবজি ও ধান-চাল বেচাকেনা। দুপুরের আগেই আবার ভেঙে যায় হাট।  পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজার সংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বসে এ ভাসমান হাট। ভাসমান এ হাট চলছে প্রায় ৭০ বছর ধরে বলে জানান স্থানীয়রা। এখানে নৌকায় করে বেচাকেনা করতে আসেন নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বানরীপারা উপজেলার প্রায় ২০ গ্রামের মানুষ।

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভাসমান হাট বসে। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে এ হাটে স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজি, ধান ও চাল বেচাকেনা করছেন। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত বলে স্থানীয় লোকজন এই ভাসমান হাটে নৌকায় বেচাকেনা করে আসছেন। সকাল ৭টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই হাটে চলে বেচাকেনা।

এ ভাসমান হাটে বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি ও ধান-চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বেচাকেনা চলে। নাজিরপুর উপজেলা মুগারজোড়, উত্তর কলারদোয়ানিয়া, মুনিরাবাদ, গাওখালী, কর্ণখালী, মেদা, কলারদোয়ানিয়া, নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, গগণগ্রাম, চামিগ্রাম এবং বানরীপাড়ার মলুহার, ইলুহার, বিশারাকান্দিসহ ১৫ থেকে ২০ গ্রামের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এ হাটে বিক্রি করেন। 

ভাসমান হাট

হাটে রয়েছে ভাসমান খাবারের দোকানও। জেলার সবচেয়ে বড় ভাসমান হাট বলে এ হাটে সকল প্রকার পণ্যই পাওয়া যায় খুব সহজে। এলাকার কৃষকরা ছোট ছোট নৌকায় করে পণ্য নিয়ে এই হাটে আসেন। হরেক রকম সবজি ও ফলমূল মেলে ভাসমান বাজারে। পাওয়া যায় আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, আতা, জামরুল, এবং সবজি বরবটি, করলা, কাকরোল, পানিকচু, কচুরলতি, লেবু, বোম্বাই মরিচ, শসা, পেঁপে, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, তাল, নারিকেল, পাটশাকসহ বিভিন্ন সবজি। এসব বিক্রি হয় পাইকারি দরে। পাইকাররা এখান থেকে এসব কিনে ট্রলারে বোঝাই করে নিয়ে যান ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। প্রতি হাটে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বেচাকেনা হয়।

এ ভাসমান বাজারটি তিন উপজেলার মোহনায় বলে অনেকেই ঘুরতে আসেন এখানে। তবে তিন উপজেলার শেষ প্রান্তে বলে এখানে তেমন স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। বৈঠাকাটা বাজার ও এর আশেপাশে নেই তেমন কোনো ভালো হোটেল, যেখানে এসে থাকতে পারেন পর্যটকরা। তবে স্থানীয়দের দাবি, এখানে পর্যটকদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

মুগোরজোর এলাকার কৃষক মোস্তফা জানান, বছরের ১২ মাসই বেলুয়া নদীতে ভাসমান হাট বসে। ২০ থেকে ২৫ গ্রামের মানুষ এ ভাসমান হাট থেকে পাইকারী ও খুচরা জিনিসপত্র ক্রয় করে থাকে। এখানে শাক, সবজি, গাছের চারা, ধান, চাল, সুপারী, আমড়াসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পাওয়া যায়। এ অঞ্চলের মানুষ এ বাজার থেকেই কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। 

বৈঠাকাটার ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে এখানে ভাসমান হাটে চলে বেচাকেনা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এ এলাকার রাস্তা ভালো হয়নি। তাই সেই থেকে এখন পর্যন্ত মানুষ একই ভাবে নদীপথে নৌকায় করে এখানে আসে কেনাকাটা করে চলে যায়। এখানে থাকার জন্য কোনো আবাসিক হোটেল নেই যে বৈটাকাটা বাজারে কেউ ঘুরতে এসে থাকবে। 

ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, প্রায় ৭০ বছর ধরে চলে বেলুয়া নদীতে দুই দিন হাটে চলে বেচাকেনা। এখানে চাল, ডাল, মুদি মনোহরি, সবজিসহ সব ধরনের পণ্য বেচাকেনা করা হয়। নেছারাবাদের নার্সারির গাছের চারা এ হাটে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয়। এখানকার মানুষজন নৌকায় করে আসে আর নৌকায় করেই কেনাবেচা করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায়।

ভাসমান হাট

বৈঠাকাটা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ওবায়দুল হক বাদল জানান, বাজারটি দীর্ঘদিনের পুরানো বাজার। এখানে সব ধরনের পণ্য সামগ্রী পাওয়া যায়। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে এখানে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে সেনাকাটার জন্য। ৬ থেকে ৭ দশক ধরে চলছে এখানে বেচাকেনা। এই বাজারের বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রফতানি করা হয়।

জেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম জানান, পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাঘাটায় ভাসমান বাজারটা দীর্ঘদিনের পুরনো। নৌকায় করেই সব জিনিসপত্র আসে এবং নৌকায় করেই বিক্রি হয়। জেলা এবং জেলার বাইরে থেকেও এ বাজারে ফল, শাক-সবজি ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য এখানে কেনাবেচা হয়। বাজারে বেশ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যে অনেক টাকার লেনদেন হয়। স্থানীয় কৃষকরা এ বাজার থেকেই পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করে। এ বাজারটি জেলার কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!