শনিবার উপজেলার সদর ইউপির কুলিকুন্ডা উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ শুঁটকি মেলা বসে। আগামী রোববার পর্যন্ত চলবে এ মেলা।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুলিকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে দেখা যায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা দোকানিরা ব্যস্ত তাদের দোকান সাজাতে। স্থানীয়রা তাদের পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পঞ্জিকা অনুযায়ী বাংলা বর্ষের প্রথম দিন এই শুঁটকি মেলার আয়োজন করে আসছেন।
.png)
মুগল আমল থেকে এ মেলা হয়ে আসছে বলে জানান তারা। নাসিরনগল উপজেলা সদরের কুলিকুন্ডা গ্রামের কুলিকুন্ডা উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরর মাঠে অনুষ্ঠিত শুঁটকি মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুঁটকি ব্যবসায়ী ছাড়াও ভোজন রসিকরা আসেন। মেলা শনিবার ও রোববার দুই দিন থাকবে।
_1681628272.jpg)
মেলায় নাসিরনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, নরসিংসী, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শুঁটকি নিয়ে আসেন। মেলায় প্রায় শতাধিক রকমের শুঁটকি নিয়ে বসেছেন দোকানিরা। এসব শুঁটকির মধ্যে বোয়াল, শোল, গজার, বাইম, ছুরি, আই মাছ (গুছি), চাপাতি, বামট, কাইক্কা, রিডা, কেচকি, টেংরা, চিংড়ি, পুটি, ইলিশ, চাপিলিয়া, পুঁটিসহ দেশীয় মাছের তৈরি শুঁটকিই বেশি পাওয়া যায়।
এছাড়া মেলায় বিভিন্ন সামুদ্রিক জাতের মাছের শুঁটকি, ইলিশ এবং কার্প জাতীয় মাছের ডিম পাওয়া যায়। মেলায় বাইমের শুঁটকি সাইজ বুজে ১২ শ থেকে দেড় হাজার, শোল মাছের শুঁটকি সাইজ অনুযায়ী ১২০০ থেকে ১৫০০, বোয়াল মাছের শুঁটকি ১ হাজার থেকে ১২০০ ও গুছি মাছের শুঁটকি ৮ থেকে ১ হাজার ধরে বিক্রি হচ্ছে।
মেলা শুরুর প্রথম দিকে নারীরা পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকি কিনতেন। পণ্য হিসেবে সবজি, চাল, ধান, গম, ডালসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসতেন নারীরা। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম ও করোনার জন্য এই পণ্যের বিনিময়ে শুঁটকি দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
গত বছর অল্প হলেও এ বছর একেবারে বন্ধ রয়েছে বিনিময় প্রথা। এবার মেলায় শুঁটকির দাম নিয়ে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এদিকে শুঁকটি মেলাকে কেন্দ্র করে স্কুল মাঠের আশে পাশে বসেছে লৌকজ মেলা।
নাগর দৌলা, খাবারের দোকান ও মাটির তৈরি তৈজসপত্রের দোকান নিয়ে বসেছে দোকানিরা। এতে শিশু কিশোরসহ সব বয়সী সাধারণ মানুষ আনন্দে মেতে উঠছেন।
জেলার সরাইল থেকে আসা ব্যবসায়ী মুজিবুর হক জানান, মেলায় ২টি দোকান নিয়ে বসেছেন তিনি। ২ দোকানে ৬ জন লোক কাজ করছেন। প্রায় ১০-১২ লাখ টাকার শুঁটকি রয়েছে। বিগত ৬-৭ বছর ধরে এ শুঁকটি মেলায় অংশগ্রহণ করেন বলে তিনি জানান। ব্যবসা ভালো হবে বলে তিনি আশাবাদী।
_1681628353.jpg)
হবিগঞ্জের মাধবপুরের ব্যবসায়ী কলম মিয়া বলেন, আগে বাপ দাদারা এ মেলায় শুঁটকি নিয়ে আসতেন। গত ১০ বছর ধরে আমি নিয়ে আসি। গত বছর এ মেলায় প্রায় আড়াই লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করি। এ বছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার শুঁটকি মেলায় নিয়ে এসেছি।
ব্যবসায়ী চিত্ত রঞ্জন দাস বলেন, ২৫ জাতের প্রায় ৫ লাখ টাকার শুঁটকি নিয়ে মেলায় এসেছি। সব সময় মেলার কথা শুনতাম, তাই এবার এসেছি। শুনেছি এ মেলায় শুঁটকি বেশ ভালো বেচা হয়।
শুঁটকি ব্যবসায়ী দীলিপ দাস বলেন, ২৫ বছর ধরে এ মেলায় আসি। আগে বাপ দাদারা আসতেন। প্রতি বছর এখানে বেশ ভালো ব্যবসা হয়। এ বছর প্রায় ৬ লাখ টাকার শুঁকটি নিয়ে এসেছি। গত বছর প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করি। এ মেলায় কোনো জমা খরচ দিতে হয় না। এ বছর মেলায় শুঁটকির প্রায় দ্বিগুণ দোকান বসেছে। দেশীয় মাছের দাম বাড়াতে, শুঁটকিতেও গতবছর থেকে এবার প্রতি কেজি শুঁটকিটির দাম একটু বৃদ্ধি পেয়েছে।
_1681628378.jpg)
স্থানীয় ৬৪ বছর বয়সী রেনু মিয়া বলেন, আগে নারীরা আম, মরিচ, চাল, ধানসহ বিভিন্ন পণ্য দিয়ে শুঁটকি বিনিময় করতেন। করোনার জন্য এ বিনিময় প্রথা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। গত বছর অল্প বিনিময় হলেও এবার একেবারে বন্ধ রয়েছে। এ শুঁটকি মেলায় প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো মেলা। এবার মেলায় অনেক দোকানি এসেছেন।
_1681628506.jpg)
স্থানীয় ৫৩ বছর বয়সী দিলু মিয়া বলেন, দিন দিন শুঁটকির দোকান ও ক্রেতা বাড়ছে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা বিক্রেতারা মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। মেলাতে যাতে কোনো চুরি ছিনতাই না হয়, সে দিকে আমরা স্থানীয়রা নজর রাখি। করোনার জন্য বিনিময় প্রথা কমে গেলেও এ বছর একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। মুগল আলম থেকে এ শুঁটকি মেলা হয়ে আসছে।
_1681628405.jpg)
সহদেব দাস নামে এক ক্রেতা জানান, এবার শুঁটকির দাম বেশি। স্থানীয় তুল্লা বাজারে শুঁটকি বিক্রি করেন তিনি। এখান থেকে শুঁটকি কিনে বাজারে বিক্রি করে থাকেন।
মুসলে উদ্দিন নামে এক ক্রেতা বলেন, বোয়াল মাছের মাথা ৯০০ টাকা করে কেজি কিনেছি। সব সময় এ বাজার থেকে শুঁটকি কিনি। আরো কিনবো, তবে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।
মেলায় শুঁটকি কিনতে আসা কুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা রজব মিয়া বলেন, ছোট বেলা থেকে নিয়মিত এ মেলা থেকে শুঁটকি কিনে থাকি। এ মেলায় দেশীয় মাছের শুঁটকি ভালো পাওয়া যায়। তবে এবার দাম একটু বেশি।