বাজারে আসা লোকজন কেউ শখের কবুতর বিক্রি করছেন, কেউ শখে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ বা আসছেন দেখতে।
এমন দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউপির মোগড়া বাজারে।
.png)
প্রতি সপ্তাহে দুই দিন শনিবার ও মঙ্গলবার রঙ-বেরঙের, দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির কবুতর নিয়ে হাট বসছে এ বাজারে। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে কেনা বেচা। হাটের দিন এই বাজারে ছাত্র, তরুণ, যুবক, কিশোর, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি পেশার লোকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে।
সপ্তাহে দুদিন বসা এই হাটে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হচ্ছে।

শখের কবুতর বেচাকেনায় এই বাজার যেন দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে আসা কবুতরের মধ্যে রয়েছে গিরিবাজ, বাজিকর, হোয়াইট কিং, বোম্বাই কালদুম, সিরাজী, নরেশ, কোপার, লুটন, মুক্ষি, ফ্লাই, রেইসিং, প্যান্সি, ম্যাগপাই, মুন্ডিয়ান, কালোদোম, ঘিয়াচুন্নী, সবুজগলা, লালবোম্বাই, শুয়াচন্দন, বিউটি হোমা, পারভিন, চকলেটসহ নানা জাতের কবুতর। দেশি-বিদেশি সব জাতের কবুতর যেন সবার নজর কাড়ছে।
একাধিক বিক্রেতা জানান, এই হাটে প্রতি জোড়া দেশি কবুতর বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। বিদেশি জাতের কবুতর তিন হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মোগড়া বাজারের ঐতিহ্য রয়েছে দীর্ঘ বছরের। বিভিন্ন এলাকার লোকজন এ বাজারে কবুতর বিক্রি করছেন। সপ্তাহে দু’দিন বসছে এ বাজার। এই দুই দিনে অন্তত আড়াই লাখ টাকার কবুতরসহ অন্যান্য পাখি বিক্রি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ উপজেলার ২ শতাধিক নানা বয়সের লোক কবুতর পালনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তবে এদের মধ্যে বেশিরভাগ লোকজনই বাণিজ্যিকভাবে দেশি-বিদেশি কবুতর পালন করে টাকা উপার্জন করছেন। নিজেদের খরচের পাশাপাশি পরিবারেও তারা টাকা দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
মনিয়ন্দ এলাকার কলেজ ছাত্র মো. নাজমুল হাসান বলেন, নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় কবুতর পালন করছি। বর্তমানে ৬০ জোড়া কবুতর রয়েছে। ৭ জোড় কবুতর বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে আসি। এরমধ্যে ৩ জোড়া কবুতর ১ হাজার ৫শ টাকায় বিক্রি করি। প্রতি মাসে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার কবুতর বিক্রি করি। এই টাকায় পড়াশুনাসহ অন্যান্য খরচ চলছে।
কলেজ ছাত্র মো. এমরান হোসেন বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় কবুতর পালনে শখ হয়। অনেক কষ্টে জমানো টাকায় প্রথমে ১ জোড়া দেশি কবুতর দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। গত ৩ বছর ধরে বিদেশি জাতের কবুতর পালন করছি। এখন ঘরে প্রায় ৬০ জোড় কবুতর রয়েছে।

তিনি বলেন, সাপ্তাহিক এই হাটে প্রতি মাসে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার কবুতর বিক্রি করছি।
ক্রেতা অটোচালক মো. ফারুক মিয়া বলেন, গত ১ বছর ধরে শখের বসে কবুতর পালন করছি। বাড়িতে ১৮ জোড়া কবুতর রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে বাজারে এসে কবুতর দেখছি। পছন্দ ও দরদাম ঠিক হলে বিদেশি জাতের এক জোড়া কবুতর কেনা হবে বলে।
সিরাজ মিয়া বলেন, শখের বসে এক জোড়া দিয়ে প্রায় ৭০ জোড় কবুতর হয়েছে। ১ জোড়া কবুতর প্রতিমাসে ১ জোড়া বাচ্চা দেয়। বড় প্রতি জোড়া কবুতর ৫শ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা বিক্রি হয়। আর ছোট বাচ্চা ২৫০ থেকে ৩শ টাকায় প্রতি জোড়া বিক্রি হয়। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে কবুতর বিক্রি করে প্রতি মাসে অন্তত ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা আয় হয়।
তিনি বলেন, কবুতর পালনে পুঁজি কম লাভ বেশি হয়। দেশি জাতের কবুতরে রোগ বালাইও কম থাকে। তাছাড়া দাম কম হওয়ায় সবার কাছে বিক্রি করা যায়।
মো. সোহাগ মিয়া বলেন, ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। বাড়ি সংলগ্ন অন্যান্য ছেলেদের কবুতর পালন দেখে তার খুবই শখ হয়। তাই বাজারে আসা। ছেলের পছন্দ করা ২ জোড়া কবুতর ১ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। কবুতর পেয়ে ছেলে খুবই খুশি।

মো. বাবুল মিয়া জানান, তিনি একজন অটোরিকশা চালক। গত ৪ বছর ধরে তিনি কবুতর পালন করছেন। বর্তমানে তার ঘরে ৭০ জোড় দেশি বদেশি কবুতর রয়েছে। সাপ্তাহিক হাটে তিনি ৫-৬ জোড় কবুতর বিক্রি করছেন। প্রতিমাসে তার ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা তিনি কবুতর বিক্রি করছেন ।
ক্রেতা মুবারক বলেন, বাজার ছাড়া পছন্দের কবুতর পাওয়া যায় না। তাই এখানে আসা। ৩ জোড় কবুতর ১৫শ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছি।
সিরাজ মিয়া বলেন, দেখে শুনে ২ জোড় বিদেশি জাতের কবুতর ৩ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করেছি। অনেক দিন ধরে এই কবুতর খোঁজা হচ্ছে তাই কেনা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. হানিফ ভূঁইয়া বলেন, এক সময় এই মোগড়া বাজারের ঐতিহ্য ছিল। নানা কারণে বাজারটি জমজমাট হচ্ছে না। তবে সপ্তাহে দুদিন বেশ জমজমাট হয়ে উঠায় মনে খুবই আনন্দ লাগছে। এই দুদিনে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার কবুতর বিক্রি হয়।
উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা জুয়েল মজুমদ বলেন, কবুতর পালনে শ্রম ও খরচ কম হয়। অল্প পুঁজি ও স্বল্প জায়গায় অতি সহজে কবুতর পালন করা যায়। এ উপজেলায় নতুন প্রজন্মের যুবকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কবুতর পালন করে অনেকেই বেকারত্ব গুছিয়েছে। কবুতর পালনে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।