একটা সময় ছিল, যখন বগুড়ার যেকোনো বাজারে গেলে দেখা মিলতো দেশীয় নানা প্রজাতির মাছের। বাজার ছাড়াও নদীর পাড়েও এসব মাছ বিক্রি করা হতো। রাস্তাঘাট, পাড়া-মহল্লায় ফেরি করে দেশীয় মাছের বেচাকেনা হতো। সংকটের দিনগুলোতে ভাতের চেয়েও বেশি পরিমাণ মাছ খেতো এই অঞ্চলের মানুষ। বগুড়ার প্রবীণদের কাছে শোনা যায় সেই গল্প। তখন নদীতে অসংখ্য মাছ পাওয়া যেতো। তবে, এখন নদীতে আগের মতো মাছ নেই। এই এলাকার মানুষ ভুলতে বসেছেন দেশি মাছের স্বাদ।
অপরদিকে নানা কারণে মাছের সংকট হওয়ায় মাছ ধরে আর জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না জেলেরা। ফলে জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
.png)
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। নদীর নাব্যতা কমে গেছে। নদীর ধারের কৃষিজমিতে দেওয়া কীটনাশক গড়িয়ে পানিতে মিশে যাচ্ছে। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। এছাড়া রয়েছে নদী দখল। এসব কারণে প্রচুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নদীর অনেক মাছ এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, নদীতে মাছের সংখ্যা কমার পেছনে নদী দখল-দূষণ, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়াসহ নানা কারণ রয়েছে। দেশের নদীগুলোতে ২৬০ প্রজাতির মাছ আছে। তবে এরমধ্যে ৫৪ প্রজাতির মাছ বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক আবু সাঈদ বলেন, নদীতে মাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো নদীর পানিতে নাব্যতা ও দ্রবীভূত অক্সিজেন মাত্রা কমে যাওয়া। তবে মাছ কমে যাওয়ায় কারণ হিসেবে বেশি ভূমিকা রাখছে নদী দূষণ। এক্ষেত্রে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকে দোষারোপ করা যায় না।
বগুড়া পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গণ্ডগ্রাম এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক। ৫৮ বছরের মালেক পেশায় মাছ ব্যবসায়ী।
বগুড়ার মাছ ব্যবসায়ী মালেক বলেন, এক সময় করতোয়া নদীতে চিংড়ি, আইড়, গুজি আইড়, বাইম, বেলে, গুলসা, গছি, ট্যাংরা, বোয়াল, পাবদা, আখলা, পাথর চাটা, মলা-ঢেলা, চ্যালাসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো। বর্তমানে শুধু করতোয়ায় নয়, অন্য নদীগুলোতে এ মাছগুলোর দেখা সহজে মেলে না।
বগুড়ার ৬৫ বছর বয়সী আলম প্রামাণিক বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের ভাতের অভাব ছিলো। তখন নদী-জলাশয়ে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। ঐ সময় আমরা ভাতের চেয়ে বেশি মাছ খেতাম। এখন ভাতের অভাব নেই কিন্তু মাছের দাম এত বেশি যে কিনতে পারি না। জলাশয়ও নেই যে মাছ ধরে খাবো। এখন বৃষ্টিও তেমন হয় না। আগে বৃষ্টি হলে বাড়ির ধারেই মাছ চলে আসতো।
বগুড়ার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরকার আনোয়ারুল কবীর আহম্মেদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, নদী সংকোচন এবং দূষণ মাছ কমে যাওয়ার মূল কারণ। বিপন্ন প্রজাতির মাছগুলো কৃত্রিমভাবে চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া মাছের অভয়ারণ্য করা হচ্ছে। এভাবে মাছ রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
কানাডার পানি সম্পদ প্রকৌশলী সাবরিনা রশিদ সেওঁতি ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, কৃষিজমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক পানিতে মেশাই হলো নদী দূষণের মূল কারণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি পানির বিশুদ্ধতা রক্ষার বিষয়ে সাধারণ মানুষদের সচেতন করতে হবে।