চট্টগ্রামে কমেছে ‘ম্যালেরিয়ার ভয়’
ম্যালেরিয়া। যার মূলে রয়েছে প্লাজমোডিয়াম গোত্রের এক ধরনের অণুজীব; যার নাম প্রোটিস্টা। মশাবাহিত এ রোগ শুধু মানুষ নয়, ছড়ায় প্রাণীদের মধ্যেও। দেশে ম্যালেরিয়া প্রবণ ১৩ জেলার মধ্যে ৯০ শতাংশ রোগীই বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার।
যার মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য তিন এলাকার বাসিন্দা। তবে সুখবর হচ্ছে- একসময় ম্যালেরিয়া নিয়ে মানুষের আতঙ্কে দিন কাটলেও সেই আতঙ্ক এখন কাটতে শুরু করেছে তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায়। এ অঞ্চলগুলোতে মাত্র সাত বছরের ব্যবধানেই রোগী কমেছে প্রায় সাড়ে ৭৫ শতাংশ। আর সচেতনতা আরো বাড়াতে পারলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করা সম্ভব হবে বলে বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িতে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায় ২৯ হাজার ৫২৩ জন। ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার কমে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৮৪০ জনে। পরের বছর ২০১৭ সালে পাওয়া যায় ২৯ হাজার ২৩ জন।
তবে ২০১৮ সালে এসে অর্ধেকের বেশিতে নেমে আসে আক্রান্তের সংখ্যা। সে বছর রোগী পাওয়া যায় ১০ হাজার ৩০৯ জন। ২০১৯ সালে তা আবার প্রায় সাত হাজার বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ২৯৩ জনে। ২০২০ সালে ফের তিন ভাগের একভাগে নেমে শনাক্ত হয় ছয় হাজার ১০৪ জন। সর্বশেষ ২০২১ সালে শনাক্ত হয় সাত হাজার ২০১ জন। অর্থাৎ বলা চলে- সাত বছরে অন্তত চার ভাগ কমেছে ম্যালেরিয়া রোগী।
আজ ২৫ এপ্রিল, পালিত হচ্ছে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারে স্লোগান ‘উদ্ভাবনী কাজে লাগাই ম্যালেরিয়া রোধে জীবন বাঁচাই’।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বলেন, এখনো সারাদেশে সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যায় চট্টগ্রাম বিভাগে। এ বিভাগের তিন পার্বত্য জেলায় রোগী বেশি, ফলে তা কমে আসছে না। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম চলমান থাকায় গত কয়েক বছর ধরে রোগীর সংখ্যা অনেকাংশে কমে এসেছে। একটি সময় ছিল যখন ম্যালেরিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করতো। আর এখন সেটি নেই বললেই চলে। এ সাফল্য অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা ম্যালেরিয়ামুক্ত বাংলাদেশ পাবো বলে আশা করছি।
এদিকে, তিন পাবর্ত্য জেলায় ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্তের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন- পার্বত্য এলাকার জলবায়ু, জঙ্গল ও পাহাড়ি ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ম্যালেরিয়ার মশা বিস্তারের জন্য বিশেষ উপযোগী। তাই এ এলাকাতে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবও বেশি। তবে এ থেকে রক্ষা পেতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই এ সংখ্যা আরো কমে আসবে।
জানা গেছে, প্রথম এ রোগের লক্ষণসমূহের বর্ণনা দেন প্রাচীন গ্রীসের চিকিৎসক হিপোক্রেটিস, যাকে ‘ঔষধের জনক’ বলা হয়। যেখানে বছরের কোন সময় এটি হয় ও কোন জায়গায় রোগীরা বাস করে সেই তথ্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন তিনি।
বলা হয়, ম্যালেরিয়ার প্রথম নথিবদ্ধ চিকিৎসা পদ্ধতির সময়কাল ১৬০০ সাল। তখন চিনচোনা গাছের তিক্ত ছালকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করত পেরুর আদিবাসীরা। ১৬৪৯ সালের দিকে ইংল্যান্ডে এটি ‘জেসুইট পাউডার’ হিসেবে পাওয়া যেত।
পরে ১৮৮০ সালের দিকে চার্লস ল্যাভেরন লোহিত রক্ত কণিকা থেকে ম্যালেরিয়ার কারণ হিসেবে একটিমাত্র কোষবিশিষ্ট পরজীবী প্রোটোজোয়াকে চিহ্নিত করেন। ফলে শত বছর ধরে চলা দূষিত বায়ু সেবনের ফলে রোগ সৃষ্টির ভুল ধারণার অবসান ঘটে। ১৮৯৭ সালে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রস ‘অ্যানোফিলিস মশা’ এ রোগের বাহক বলে প্রামাণ করেন। এ যুগান্তকারী আবিষ্কারের কারণে ১৯০২ সালে তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।