ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

গাছের মুঠি ধরে টানলেই বেরিয়ে আসছে ‘গুপ্তধন’

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৫০, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২
গাছের মুঠি ধরে টানলেই বেরিয়ে আসছে ‘গুপ্তধন’
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাদাম চাষে আগামীর স্বপ্ন বুনছেন যমুনার চরাঞ্চলের কৃষকরা। যমুনার বামতীর ঘেষা টাঙ্গাইল সদর, গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, নাগরপুর ও সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এবার প্রচুর বাদাম চাষ হয়েছে।

কেউ কেউ আগাম বাদাম তুলে রোদে শুকাচ্ছেন। চাষাবাদ সহজ, বিপণনে ঝামেলাহীন ও তুলনামূলকভাবে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা কাঁচা বাদামের নাম দিয়েছেন ‘গুপ্তধন’। বাদাম গাছ প্রায় পরিপক্ক হওয়ায় যমুনার চরে বালির নিচে হাত বাড়ালেই উঠে আসছে মুঠো মুঠো গুপ্তধন। প্রতিটি বাদাম গাছের মুঠি (উপরের অংশ) ধরে টান দিলেও উঠে আসছে থোকা থোকা সোনালী রঙের চিনা বাদাম তথা বালির নিচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধন।

বর্ষায় প্রমত্ত্বা যমুনা আগ্রাসী হয়ে যেমন গিলে খায় বসতি তেমনই শুকনো মৌসুমে ফিরিয়ে দিচ্ছে কিষাণ-কিষাণীর স্বপ্ন। যমুনার ভাঙা গড়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা মানুষগুলো চরাঞ্চলে চিনা বাদাম চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে বাদামের ফলন অনেকটা ভালো। এছাড়াও বাজারে দাম বেশি পাওয়ায় জেলার কৃষকরা উৎফুল্ল। 

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় দুই হাজার ২০১ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে যমুনার চরাঞ্চলের টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ৩৭৫ হেক্টর, ভূঞাপুরে ১ হাজার ৭২২ হেক্টর, গোপালপুরে ২৮ হেক্টর, কালিহাতীতে ২০ হেক্টর, নাগরপুরে ৭ হেক্টর, বাসাইলে ২০ হেক্টর, ঘাটাইলে ৯ হেক্টর, সখীপুরে ৫ হেক্টর, দেলদুয়ারে ১৪ হেক্টর ও মির্জাপুর উপজেলায় ১ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। 

জেলা কৃষি বিভাগের মতে, বেলে, দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে তেল জাতীয় ফসল বাদামের ভালো ফলন পাওয়া যায়। তাই যমুনা তীরঘেঁষা উপজেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি চিনা বাদাম চাষ হয়েছে। চরাঞ্চলে বেশির ভাগ বারি চিনাবাদাম-৭ ও ৮ এর চাষ হয়। এছাড়া বিনা-৪ ও বিজি-২ এর ফলনও ভালো হয়ে থাকে। বীজ বপনের ১২০ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে চিনাবাদাম পরিপক্ক হয়। রবি মৌসুমের শুরুতে বপন করা চিনাবাদাম এখন ঘরে তোলার মৌসুম। এখন বাদামের সবুজপাতা হলদেটে রঙ ধারণ করছে। আগাম চাষ করা চিনাবাদাম এখনই তোলার উপযুক্ত সময়। 

আরো পড়ুন: নতুন ঘরের স্বপ্ন হলো না পূরণ, টাকা হারিয়ে পাগলপ্রায় নুরজাহান

সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও বাদাম তোলা হচ্ছে। আবার কোথাও বাদামের পরিপক্ক চারা তোলার অপেক্ষায় রয়েছে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরাঞ্চলের কৃষকরা বাদাম তুলছেন। পরিবারের নারী ও শিশুরাও এ কাজে সহযোগিতা করছেন। 

বাদাম চাষিরা জানায়, বাদাম রোপণের পর অন্য ফসলের ন্যায় পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয় না। বীজ বপন ও বাদাম উঠানোর শ্রমিক খরচ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই বললেই চলে।

ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা গ্রামের বাদাম চাষি আজমত আলী, সালেহ দেওয়ান, রশমত মণ্ডল, আজগর আলীসহ অনেকেই জানান, যমুনা চরের বালিমাটি চিনা বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ বছর বাদাম চাষ করে তিনি বেশ লাভবান হবেন। বর্তমানে প্রতিমণ কাঁচা বাদাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং প্রতি মণ শুকনা বাদাম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। এবার ফলন ভালো হওয়ায় এক বিঘা জমিতে ৮-১০ মণ বাদাম পাওয়া যাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বাদামের বেশি ফলনও হয়েছে। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা লাভ হবে।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশসদর উপজেলার চরপৌলী গ্রামের কৃষক আবু তালেব প্রামাণিক জানান, তিনি ৬৬ শতাংশ জমিতে বাদাম চাষ করেছেন। ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাদামের ফলন ভালো হয়েছে। এবার তার খরচ বাদে ২৫-৩০ হাজার টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি আরও জানান, বাদাম গাছগুলো গো-খাদ্য ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবেন। এতেও ৫-৭  হাজার টাকা পাওয়া যাবে। 

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাকুয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, কাকুয়া ইউনিয়নটি পুরোপুরি যমুনা নদীর তীরে। ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা নদীগর্ভে। কিছু কিছু জায়গায় চর জেগে উঠায় নদী পাড়ের মানুষগুলো বাদাম চাষ করছে। চাষিদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক দিক-নির্দেশনা দেওয়া হলে তারা বাদাম চাষে আরও বেশি আগ্রহী হবেন। 

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. আহসানুল বাসার জানান, টাঙ্গাইল জেলায় চলতি বছর ২২০১ হেক্টরে ৪ হাজার ৮০১ মেট্রিক টন বাদাম ফলনের আশা করা হচ্ছে। টাঙ্গাইলে বাদাম চাষের বড় অংশ যমুনার চরাঞ্চল। কৃষকরা বাদাম চাষে লাভবান হওয়ায় প্রতিবছর বাদাম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ বাদাম চাষিদের প্রতিবছর বিনামূল্যে বীজ দিয়ে সহায়তা করে থাকে।   

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
ট্যাগ: টাঙ্গাইল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!