এক নীতিতে বিশ্বাসী, আগে টাকা পরে কথা
বয়স্ক, বিধবা কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতা; সব ধরনের কাজেই লাগে টাকা। সরকারি ঘর করে দিতেও নেন খরচ। দিতে হয় মাসিক কমিশনও। পকেট ভারী করতে না পারলে মেলে না সেবা। টাকা না দিলে কথাও বলেন না। বলতে গেলে এক নীতিতেই বিশ্বাসী। ‘আগে পকেট খরচ, পরে সেবা’। এভাবেই প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞ চালান মাহেনারা পারভীন পান্না। নারী হয়েও অনিয়ম আর দুর্নীতিতে রয়েছেন একধাপ এগিয়ে।
মাহেনারা পারভীন পান্না লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার লামচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইনে অভিযোগ করেন ৯ জন ভুক্তভোগীসহ দুই ইউপি সদস্য।
ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে সেবা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে ‘খরচাপাতির’ নামে টাকা নেন চেয়ারম্যান মাহেনারা পারভীন। বিধবা, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং বিনামূল্যের সরকারি ঘর দিতে উপকারভোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। টাকা না দিলে কাজ করেন না।
পানপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এমরান হোসেনের স্ত্রী আমেনা বেগম বলেন, মাতৃত্বকালীন ভাতা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় আমার কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছেন চেয়ারম্যান পারভীন। প্রথম কিস্তির সাড়ে ছয় হাজার থেকে ১৫শ’, দ্বিতীয় কিস্তির ২৫শ’ থেকে ৫শ’ ও তৃতীয় কিস্তির ৯ হাজার থেকে দুই হাজার টাকা কেটে নেন তিনি।
ভাতার বই করতে দেওয়ার ছয় মাসেও টাকা পাননি দক্ষিণ হাজিপুর গ্রামের তাহমিনা আক্তার। এর জন্য বিকাশ নম্বর ও ব্যাংক হিসাব নম্বর দিলেও এখনো টাকা আসেনি তার। তাহমিনার মতো দক্ষিণ হাজিপুর গ্রামের শারমিন আক্তারসহ আরো অনেকের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা দিনমজুর শারীরিক প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার কাছ থেকেও সরকারি ঘর বরাদ্দ দেবেন বলে ১২ হাজার টাকা নেন চেয়ারম্যানপুত্র। তবে একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে দিলেও নিজ খরচেই মেঝে পাকা করতে হয়েছে।
ইউনিয়নের উত্তর মজুপুর এলাকার ফেরিওয়ালা শহিদ উদ্দিন জানান, কয়েক মাস আগে কালবৈশাখী ঝড়ে তার বসতঘর ভেঙে যায়। চেয়ারম্যান নিজেই স্থানীয় ইউপি সদস্যকে নিয়ে পরিদর্শন করেন। এ সময় তাকে সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে ১২ হাজার টাকা নেন চেয়ারম্যানের ছেলে টাইফুন। তিনি বলেন, ঘর নির্মাণের জন্য ইট-টিনসহ বিভিন্ন মালামাল আনতে আমাকেই গাড়ি ভাড়া দিতে হয়েছে।
লামচর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মহসিন মিঝি বলেন, দেড় বছর ধরে সম্মানী পাচ্ছেন না ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা। কিন্তু চেয়ারম্যান নিজের টাকা ঠিকই তোলেন। এতে আমরা আর্থিক সংকটে রয়েছি। বিভিন্ন ভাতার জন্য আমরা নামের তালিকা দিলেও তা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। টাকার বিনিময়ে তিনি ইচ্ছেমতো পছন্দের লোকজনকে সুবিধা দেন। আমাদের কিছু না জানিয়েই তিনি খামখেয়ালিভাবে পরিষদ চালান।
অন্যান্য ইউপি সদস্যরা জানান, পরিষদের কাজে সদস্যদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করেন না চেয়ারম্যান। কোনো কাজেই সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগও করেন না। মনগড়া পরিষদ চালাচ্ছেন। গত বছর এ ইউনিয়নে ১০ টাকা মূল্যে চালের ৭০৫টি কার্ড বরাদ্দ হয়। সদস্যদের না জানিয়েই চেয়ারম্যান ১৯১টি কার্ড বাতিল করে বাকি কার্ডগুলো হতে ৫শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা পর্যন্ত করে নিয়ে অনুমোদন দেন। এতে বাতিল কার্ডগুলোর সুবিধাভোগীরা ক্ষুব্ধ।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অস্বীকার করে চেয়ারম্যান মাহেনারা পারভীন বলেন, সরকারি ঘর ও ভাতার যে অভিযোগ তা সত্য নয়। একটি কুচক্রি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তবে করোনাকালীন পরিষদের ট্যাক্স ওঠাতে না পারায় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের ভাতা দেওয়া যায়নি।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপ্তি চাকমা বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো আমার কাছে আসেনি। এমন অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।