ঢাকা,  রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

বাবা মায়ের বিচ্ছেদে কপাল পুড়ল অবুঝ ৩ ভাই বোনের 

সাবজাল হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) 
প্রকাশিত: ১৮:২৩, ১৭ আগস্ট ২০২১
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে কপাল পুড়ল অবুঝ ৩ ভাই বোনের 
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে কপাল পুড়ল অবুঝ ৩ ভাই বোনের 

আসিফ যখন ১ বছরের শিশু। তখন হঠাৎ জ্বর হয়। সাধারণ জ্বর ভেবে বাবা মা তখন কোনো গুরুত্ব দেননি। পরে সে ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকে। সে সময়ে হতদরিদ্র বাবা মা টাকার অভাবে তার ঠিকমত চিকিৎসা করাতে পারেননি। এর কিছুদিন পরেই আসে আরেক ঝড়। মা বাবার মধ্যে শুরু হয় বিচ্ছেদের ‍সুর। তখন ৩ ভাই-বোনকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মা। 

সর্বশেষ তাদের গতি হয় হতদরিদ্র নানা বাড়ি যশোরের রহমতপুরে। এরপর তার মা আবার স্বামীর বাড়ি আসলেও জায়গা হয়নি বরং বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের চরম অসহায়ত্ব। ফলে তাদের আবার ফিরতে হয়েছে সেই নানার বাড়িতে। রক্তের অনেকে থাকলেও পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। 

আসিফের মা শাহানারা বেগম জানান, বিচ্ছেদ হওয়ার পরে আসিফসহ ৩ সন্তানের কোনোদিন খোঁজ খবর নেইনি তাদের পাষণ্ড বাবা। বাবা আক্কাস আলী অনেক আগেই মারা গেছেন। ভাইয়েরা থাকলেও তারা যে যার মত পৃথক সংসার করছেন। 

তিনি আরো জানান, মা হয়ে সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে যশোর শহরে একটি ঝুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়ে পরের বাসায় কাজ করে প্রতিবন্ধী আসিফসহ ৩ সন্তান নিয়ে খেয়ে না থেয়ে বেঁচে আছি। পাশে কেউ না থাকায় অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে আমাদের। 

আসিফের মা বলেন, প্রতিবন্ধী আসিফের বয়স এখন ১১ বছর। নিজের বুকের ধন আসিফ চলাফেরা করতে পারেনা। কথা বললেও বোঝা যায় না। চিকিৎসক বলেছেন আসিফের লিভারে সমস্যা। তবে ঠিকমত চিকিৎসা করাতে পারলে সুস্থ হয়ে যাবে আসিফ। টাকার অভাবে নিজের সন্তানকে চিকিৎসা করাতে পারছিনা। মা হিসেবে এটা সহ্য করা যে কোনো মায়ের জন্য অনেক কষ্টের ব্যাপার। এখন প্রতিমাসে আসিফের ওষুধবাবদ কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। 

তিনি বলেন, বাবার বাড়ি যশোরের রহমতপুরে ভোটার হলেও সন্তানদের পরিচয় তাদের বাবার বাড়ি ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের ঝনঝনিয়া গ্রামের ঠিকানায়। বেশ কিছুদিন আগে ওখানকার ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন ও ওই গ্রামের লোকজনের সহযোগীতায় অসহায় আসিফের নামে একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। সেখানেও ভাগ্য সঙ্গে নেই। এ পর্যন্ত মাত্র এক চালান আসিফের নামে ৪ হাজার টাকা পেয়েছি। পরে আর টাকা আসেনি। অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখলাম একাউন্টে আর কোনো টাকা নেই। 

আসিফের বাবার বাড়ি ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের ঝনঝনিয়া গ্রামের বাসিন্দা শামীম হোসেন জানান, আসিফ তার প্রতিবেশী শিকজান হোসেনের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটি প্রতিবন্ধী। বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পর তারা অন্যস্থানে চলে গেছে। কিন্ত অসহায় আসিফসহ তাদের ৩ ভাই বোনের বাবার ঠিকানায় বহাল আছে। ফলে তাদের সব কিছু এখানকার ঠিকানায়। 

কাষ্টভাঙ্গা ইউপি সদস্য কামরুল ইসলাম জানান, আসিফ শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তার গ্রামেই বাড়ি। কিন্ত শুনেছি তার মায়ের সঙ্গে বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। এখন তার মা সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকে। তারা বড্ড অসহায়। 

কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়নের সমাজকর্মী রবিউল ইসলাম জানান, প্রতিবন্ধী আসিফের একাউন্টে কোনো টাকা নেই। অনলাইনে যখন রেজিস্ট্রে শন হয় তখন প্রতিবন্ধী আসিফকে ওই গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়নি তাই তার নাম পুনরায় ওঠেনি। তবে তার মা বই নিয়ে আমার সঙ্গ যোগাযোগ করেছেন। ছেলেটি প্রতিবন্ধী ও খুব অসুস্থ তাই খুব শিগগিরই তার ভাতার ব্যবস্থা যাতে হয় সে জন্য চেষ্টা করা হবে। 

কালীগঞ্জের কাষ্টভাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন বলেন, ঝনঝনিয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী আসিফ অনেক অসহায়। বাবা মায়ের বিচ্ছেদের পর তাদের আরো অসহায়ত্ব বেড়েছে। তারা এখানে থাকে না কিন্ত এখানকার নাগরিক হওয়ায় তাদের খুঁজে বের করে তার নামে প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছিলাম। এখন শুনছি ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। কেন বন্ধ হলো তা খতিয়ে দেখা হবে।

এদিকে যশোরের হৈবতপুর ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস জানান, স্বামীর সঙ্গে আসিফের মা শাহানারার ছাড়াছড়ি হওয়ার পর তার নিজ গ্রাম রহমতপুরে ভোটার হয়েছেন। প্রতিবন্ধী আসিফের মা ৩ সন্তান নিয়ে পরের বাসায় কাজ করেন। তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করে। এছাড়াও ওই ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামের সঙ্গ মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের জন্য চেষ্টা করবো। বাবা মায়ের বিচ্ছেদে কপাল পুড়েছে অসহায় ৩ সন্তানের বলে তিনি যোগ করেন।  

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে/জেএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!