ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

পদ্মা-মেঘনার ভয়ংকর ঘূর্ণিপাক, ভিডিওতে মিলেছে ভয়াবহতা

চাঁদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:৩৫, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০
পদ্মা-মেঘনার ভয়ংকর ঘূর্ণিপাক, ভিডিওতে মিলেছে ভয়াবহতা
ভিডিও থেকে নেয়া ছবি

পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া তিন নদী এসে মিলেছে এখানে। নদীগুলো তিনদিক থেকে প্রবাহিত হয়ে মিশে যাওয়ায় সেখানে পানির বিশাল এক ঘূর্ণিগর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আর এ ট্রায়াঙ্গেলে পড়েই নিখোঁজ হয়েছে শত শত মানুষ, লঞ্চসহ কার্গো কিংবা ট্রলার। তিন নদীর এ সঙ্গমস্থল যেন এক মৃত্যুকূপ।

ভয়ংকর ওই ঘূর্ণিপাকে কিছু তলিয়ে গেলে মেলে না আর কোনো হদিস। এখানে যেসব বড় লঞ্চ তলিয়ে গেছে, সেগুলোর সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। চাঁদপুরের তিন নদীর এই সঙ্গমস্থল স্থানীয়ভাবে কোরাইল্লার মুখ নামেও পরিচিত।

আরো পড়ুন: সদ্য জন্ম নেয়া ছেলের নাম রাখলেন শুভশ্রী

মোহনাটি নদীর একেবারে তীরে অবস্থিত। সাধারণত নদীর তীর অগভীর থাকে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, নদীর তীরে হওয়া স্বত্ত্বেও এই মোহনা অনেক গভীর। বর্ষাকালে এটি রূপান্তরিত হয় মৃত্যুকূপে। পানির ভয়ংকর ঘূর্ণি দেখে মানুষের মনে শিহরণ জাগে। এই মোহনা নিয়ে লোকমুখে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে।

জনশ্রুতি আছে, এই মোহনা এক ছেলের অভিশাপে সৃষ্টি হয়েছে। সে হয়তো হাজার বছর আগের কথা। তখন মোহনাস্থলে কোনো নদী ছিল না। ছিল ছোটখাটো বাজার, হোটেল আর দোকানপাট। নদী ছিল কয়েক কিলোমিটার দূরে। একদিন বিকেলে ছোট এক দ্ররিদ্র ছেলে একটি হোটেলে গিয়ে খাবার চায়। হোটেলের মালিক তাকে তাড়িয়ে দেয়। ছেলেটি পুনরায় খাবার চাইতে গেলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।

আরো পড়ুন: বোলার ছেলের ব্যাটসম্যান মা

ছেলেটি আবারো ওই হোটেলে যায়। এবার হোটেলের লোকটি রেগেমেগে তার গায়ে গরম তেল ছুড়ে মারে। অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাদঁতে কাঁদতে ছেলেটি চলে যায়। ওই রাতেই হোটেল অবধি কয়েক কিলোমিটার জায়গা নদীর অতলে হারিয়ে যায়। তৈরি হয় মোহনা। ওই ঘটনার বহু বছর পর ওই ঘূর্ণিপাকে পড়ে একটি লঞ্চ ডুবে যায়। তখন ডুবুরিরা লঞ্চের সন্ধানে নদীর তলদেশে গিয়ে দেখে একটি ছোট ছেলে চেয়ারে বসে আছে। ঘটনাগুলো আদৌ সত্যি কি না তা বলা কঠিন।

অবাক করা বিষয় হলো একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে এই ঘূর্ণিপাকে। সেই অতীতকাল থেকে এখন পর্যন্ত এলাকাটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ও জাহাজ চলাচলের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারিভাবেও চাঁদপুরকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে মোহনার চারপাশে এক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বৃত্তাকারে খুঁটি পুঁতে দেয়া হয়। এখান দিয়েই প্রতিদিন চরাঞ্চলের বহু ট্রলার যাত্রী নিয়ে পদ্মা-মেঘনা পাড়ি দেয়।

চাঁদপুরে চার উপজেলায় প্রায় ৪০টি চরাঞ্চল রয়েছে। এসব এলাকার লোকজনকে দৈনন্দিন কাজ ও চিকিৎসার জন্য জেলা ও উপজেলা সদরে যেতে হয়। যোগাযোগের একমাত্র বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলার। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিশু, নারী ও পুরুষ সবাই এসব ট্রলারে করে নিয়মিত জেলা সদরে যাতায়াত করেন। ফলে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিয়মিতই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এই ট্রায়াঙ্গেলে ২৪ ঘণ্টাই প্রবল ঘূর্ণিস্রোত বইতে থাকে। প্রতি সপ্তাহেই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে এখানে। মালবোঝাই জাহাজ কিংবা কার্গো ডুবির মতো ঘটনাও ঘটেছে এখানে। আর এসব দুর্ঘটনাজনিত জাহাজের সন্ধান কোনোদিনই আর পাওয়া যায়নি। মোহনায় এত বেশি স্রোত থাকে যে এসব নৌযান উদ্ধার কখনোই সম্ভব হয়নি।

আরো পড়ুন: অদ্ভুতভাবে নলকূপে একাই উঠছে পানি, গোপন রোগ সারাতে মানুষের ভিড়

অতীতের দুর্ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয়রা জানায়, পাকিস্তান আমল থেকে এখানে বহু যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। যার মূল কারণ মোহনার তীব্র স্রোত। এখানে এমভি শাহজালাল, মদিনা, দিনার ও নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে যায়। সবগুলো লঞ্চেই প্রচুর যাত্রী ছিল। তীব্র স্রোতের কারণে অধিকাংশ যাত্রীই বেঁচে ফিরতে পারেননি। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এমভি নাসরিন-১, যার প্রায় ৯০ ভাগ যাত্রীই মারা গেছে। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবিতে মারা যান ১১০ জন, নিখোঁজ হন ১৯৯ জন। এখন পর্যন্ত এখানে ডুবে যাওয়া কোনো লঞ্চের সন্ধান পায়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ - বিআইডব্লিউটিএ।

বর্তমানে বর্ষার মৌসুম শেষ হলেও নদীর তীব্র স্রোত ও ঢেউ এখনো রয়েছে। আর এরইমধ্যে ঝুঁকি নিয়ে মালামাল ও যাত্রী বোঝাই করে ট্রলারগুলো তাদের গন্তব্যস্থলে ছুটছে। প্রতিদিনই মালবোঝাই বড় বড় কার্গো কিংবা ট্রালার এ মোহনা পেরিয়ে চাঁদপুরের ব্যবসায়িক এলাকা পুরানবাজারে যায়। স্রোত বাড়লে মালামাল নিয়ে অনেক নৌযান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্রোতের গতিপথ বুঝতে না পেরে অনেক নৌযান দুর্ঘটনার শিকার হয়।

আরো পড়ুন: ডিসঅর্ডারে ভুগছেন মিমি, ভিডিও পোস্ট করতেই ভাইরাল

এই মোহনার পাশ দিয়েই বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের লঞ্চ চলাচল করে। তিন নদীর এ সঙ্গমস্থল চাঁদপুর জেলা সদরের অন্যতম একটি পর্যটন স্পট। প্রতিদিনই এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে।

স্থানীয় কাউন্সিলর ফরিদা ইলিয়াস বলেন, মোহনায় দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। জেলে নৌকা, মালবোঝাই ট্রলার ও যাত্রীবাহী ট্রলার প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। আমরা এসব দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বদা কাজ করছি। যতদিন ডুবচর ও বিপরীত পাশের চরগুলো খনন করা না হবে, ততদিন এখানে স্রোত কমবে না। স্রোতের কারণে শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন হলে এখানে দুর্ঘটনা কমে আসবে।

ভিডিওটি ইউটিউব চ্যানেল- ‘এক্সট্রিম লঞ্চ লাভার’ থেকে নেয়া

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!