সাকরাইন উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হলেও বহু বছর ধরে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসবকে ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বা ঘুড়ি উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

.png)
সাকরাইন উৎসবের সারাদিন পুরান ঢাকা পুরো আকাশকে বেগুনী, কমলা, হলুদ, সবুজ, লালসহ নানা রঙের ঘুড়ি ছেয়ে রাখে। আর সন্ধ্যা হলেই ফানুশ, আতশবাজির ঝলকে পুরো আকাশ এক রঙিন ক্যানভাসে রুপ নেয়। বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ছেলে-বুড়ো-বউ-নাতি-মেয়ে-জামাই সবাই মেতে ওঠে এ উৎসবে। ঘরে ঘরে তৈরি হয় বিভিন্ন পোলাও-কোরমা, কাচ্চি-তেহারি, পিঠাপুলিসহ নানান খাবার। আর এসব খাবারের পাশাপাশি ছাদে চলতে থাকে আড্ডা ও নাচ-গান।


সাকরাইন পুরান ঢাকার মাটিতে হয় না, হয় ছাদে ছাদে। আর তাই সাকরাইনকে দেখতে এবং বুঝতে আপনাকে উঠে পড়তে হবে পছন্দ মতো কোনো বাড়ির ছাদে। আর যেকোনো ছাদে উঠেই চমকে যাবেন নিশ্চিত!

পৌষসংক্রান্তির এই উৎসবে সকাল থেকে প্রায় সবাই মেতে ওঠে সুতায় ‘মাঞ্জা’ দেওয়ার উৎসবে। পরে এ মাঞ্জা দেওয়া সুতার ধারে কেটে যাবে একটার পর একটা ঘুড়ি। কাটাকাটির এ খেলার মূল আকর্ষণ মনে হলেও মূল প্রতিযোগিতার জায়গাটি কিন্তু অন্য জায়গায়। আর সেটি হলো- কার ঘুড়ি কত সুন্দর, কত দামি-তা দেখানোর খেলা। এ খেলার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। যে যার মতো ঘুড়ি নাটাইয়ের সুতায় বেঁধে ছেড়ে দিচ্ছে আকাশে। আবার শখের ঘুড়ি আটকাও পড়ে যাচ্ছে অন্যের হাতে ঘুড়ানো নাটাইয়ের জাদুতে।

সাকরাইন উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হলেও বহু বছর ধরে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এ সাকরাইন উৎসবকে ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বা ঘুড়ি উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্তি’ ঢাকাইয়া অপভ্রংশে সাকরাইন রূপ নিয়েছে। পৌষ মাসের শেষ দিনে এই সাকরাইন উৎসব আয়োজন করা হয়। তবে বাংলা ক্যালেন্ডার ও পঞ্জিকা তারিখের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্যের কারণে প্রতি বছর দুই দিনব্যাপী (১৪ ও ১৫ জানুয়ারি) এই উৎসবটি পালন করেন পুরান ঢাকাইয়ারা।
সাকরাইন উৎসব সম্পর্কে পুরান ঢাকার এক বাসিন্দা বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা একে ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বলে থাকেন। তবে পুরান ঢাকায় একে বলা হয় সাকরাইন উৎসব। দুটা একই উৎসব হলেও হিন্দু ধর্মালম্বীদের মধ্যে পূজার বিষয়টা রয়েছে, যা মুলিমদের মধ্যে নেই।

সাকরাইন এর ঐতিহ্যগত একটি ইতিহাসও আছে কিন্তু। যেমন- বুড়াবুড়ি পূজা নামে একটি পূজার আয়োজন হত আগে, পূজার পরে ভোগ বিতরণ করে শুরু হত ঘুড়ি ওড়ানো। এ পূজার আয়োজন হত আত্মার শুদ্ধির জন্য। খড় পুড়িয়ে খারাপ আত্মা তাড়ানোর একটা ধারণা কাজ করত আগুন ধরানোর পেছনে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খড় পোড়ানোর চলটি উবে গিয়ে এখন জায়গা করে নিয়েছে আতশবাজি। আলাদা আলাদা বাড়ির ছাদ থেকে ছুটে আসা ডিজে পার্টির সংগীত ও তালের ঝংকারে এই আদি শহর রুপ নেয় একটা বৃহৎ ডিজে শহরে। আর আতশবাজির লাল, সবুজ, কমলা, সোনালি আলোর বিস্ফোরণ চলে টানা চার-পাঁচ ঘন্টা ধরে।

মনে রাখবেন, এদিন মহল্লার কেউ আপনাকে দাওয়াত দিক বা না দিক; পছন্দ মত ছাদে উঠে যেতে পিছপা হবেন না কিন্তু। যথেষ্ট সমাদর পাবেন যদি মিশে যেতে পারেন উৎসবমুখর মানুষের সঙ্গে। মাঝরাত পর্যন্ত চলবে এই উৎসব। একবার এই উৎসবে শামিল হলে আপনি নিশ্চিতভাবে বারবার চলে আসতে যাইবেন প্রতি পৌষক্রান্তির সাকরাইন উৎসবে।
সাকরাইন উৎসবে কীভাবে, কোথায় যাবেন?
হাতে সময় নিয়ে দুপুরের পর পর বের হয়ে যাবেন। পুরান ঢাকার সব জায়গাতেই সাকরাইন হলেও মূল আমেজটা পাবেন ধোলাইখাল, লক্ষীবাজার, তাঁতিবাজার, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া এসব জায়গায়। তবে শাঁখারিবাজার থেকে ঘুড়ি বা ফানুশ কিনে নিয়ে যেতে ভুলবেন না কিন্তু।
সাকরাইন উৎসবে ফটোগ্রাফারদের জন্য বিশেষ টিপস
সাকরাইন উৎসবের দিন আপনার যদি ফটোগ্রাফের শখ বা পেশা থাকে; তাহলে অযথা এ বাড়ি ও বাড়ি না দৌড়িয়ে যেকোনো একটি বা দুটি বাড়ির ছাদে গিয়ে দাঁড়াবেন। মেমোরি কার্ডে পর্যাপ্ত জায়গা রাখবেন, ব্যাটারিতে রাখবেন পর্যাপ্ত চার্জ। ট্রাইপড রাখতে পারেন সঙ্গে লং এক্সপোজার এ ছবি তুলতে চাইলে।
সাকরাইন উৎসবে যা করবেন না

যেকোনো ধরনের মাদক গ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন। অপরিচিত কোনো নারী-পুরুষের সঙ্গে যেচে গিয়ে রং তামাশা না করাই ভালো হবে বেগম-জনাব।