বরিশালের ৬ জেলার নামকরণ যেভাবে
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের রূপ বৈচিত্রের শেষ নেই। সেইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলার নামকরণের ইতিহাস তো আরো বেশি গৌরবজ্জ্বল। জানেন কি? দেশের বিভিন্ন জেলার নামকরণ করা হয়েছিল কীভাবে।
এমন প্রশ্ন প্রায়ই মনে আসে অনেকের। তবে সময় করে জানা হয় না আর। তাই বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশে থাকছে বিশেষ আয়োজন। এর ১ম পর্বে ছিল ঢাকার নামকরণের ইতিহাস। অনেকে মনে করেন ঢাকার নামকরণ ঢাক বা তবলা কিংবা ঢাকাভাষা নামক ভাষা থেকে।
আজ থাকছে ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার নামকরণের ইতিহাস। বরিশাল, বরগুনা, ঝালকাঠী, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা এই ৬ জেলা নিয়ে বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। এরপর ২০০০ সালে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরো পড়ুন: ঢাকার নামকরণ হলো যেভাবে
চলুন জেনে নেয়া যাক কীভাবে এই বিভাগের বিভিন্ন জেলার নামকরণ হয়েছিল। বাকি বিভাগ এবং জেলাগুলোর নামকরণের ইতিহাসকে জানতে নজর রাখুন পরবর্তী পর্বগুলোতে-
বরগুনা জেলা
বরগুনা নামের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে যতটুকু জানা যায় যে, উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে কাঠ নিতে আসত। সেসময় খরস্রোতা খাকদোন নদী অতিক্রম করতে গিয়ে অনুকুল প্রবাহ বা বড় গোনের জন্য এখানে অপেক্ষা করত তারা। সেজন্য এ স্থানের নাম হয় বড় গোনা।
অনেকের মতে আবার স্রোতের বিপরীতে গুন (দড়ি) টেনে নৌকা অতিক্রম করতে হতো বলে এ স্থানের নাম বরগুনা। কেউ কেউ বলেন, বরগুনা নামক কোনো প্রভাবশালী রাখাইন অধিবাসীর নামানুসারে বরগুনার নামকরণ করা হয়েছে। আবার কারো মতে বরগুনা নামক কোনো এক বাওয়ালীর নামানুসারে এ স্থানের নাম করণ করা হয় বরগুনা।

বরিশাল জেলা
‘আইতে শাল, যাইতে শাল। মোগো বাড়ি বরিশাল।’ এই জেলার নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। এক কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, পূর্বে এখানে খুব বড় বড় শাল গাছ জন্মাতো। আর এই বড় শাল গাছের কারণে (বড়+শাল) বরিশাল নামের উৎপত্তি। কেউ কেউ দাবি করেন, পর্তুগীজ বেরি ও শেলির প্রেমকাহিনীর জন্য বরিশাল নামকরণ করা হয়েছে।
অন্য এক কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, গিরদে বন্দরে (গ্রেট বন্দর) ঢাকা নবাবদের বড় বড় লবণের গোলা ও চৌকি ছিল। ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকরা বড় বড় লবণের চৌকিকে ‘বরিসল্ট’ বলতো। অর্থাৎ বরি (বড়)+ সল্ট(লবণ)= বরিসল্ট। আবার অনেকের ধারণা এখানকার লবণের দানাগুলো বড় ছিল বলে ‘বরিসল্ট’ বলা হতো । কালের বিবর্তনে বরিসল্ট শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে বরিশাল নামে পরিচিতি লাভ করে।
আরো পড়ুন: ‘বিয়ে-মিছিল-মিটিং নেই, ভিক্ষা চাওয়ার সময় এসে গেছে’
ভোলা জেলা
ভোলা জেলার নামকরণের পেছনে স্থায়ীভাবে একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে। সেটি হলো, ভোলা শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতুয়া নামক খালটি এখনকার মত অপ্রশস্ত ছিল না। একসময় এটি পরিচিত ছিল বেতুয়া নদী নামে। খেয়া নৌকার সাহায্যে নদীতে পারাপার করা হত। বুড়ো এক মাঝি এখানে খেয়া নৌকার সাহায্যে লোকজন পারাপার করতো। তার নাম ছিল ভোলা গাজী পাটনী। বর্তমানে যোগীরঘোলের কাছেই তার আস্তানা ছিল। এই ভোলা গাজীর নামানুসারেই এক সময় স্থানটির নাম দেয়া হয় ভোলা। সেই থেকে আজ অবদি ভোলা নামে পরিচিত।

ঝালকাঠি জেলা
এ জেলার নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এখানকার জেলে সম্প্রদায়ের ইতিহাস। মধ্যযুগ এবং এর পরবর্তী সময়ে সন্ধ্যা, সুগন্ধা, ধানসিঁড়ি আর বিষখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায় জেলেরা বসতি স্থাপন করে। এর প্রাচীন নাম ছিল ‘মহারাজগঞ্জ’। মহারাজগঞ্জের ভূ-স্বামী শ্রী কৈলাশ চন্দ্র জমিদারি বৈঠক সম্পাদন করতেন। পরবর্তীতে তিনি এ স্থানটিতে এক গঞ্জ বা বাজার নির্মাণ করেন। এ গঞ্জে জেলেরা জালের কাঠি বিক্রি করত।
এ জালের কাঠি থেকে পর্যায়ক্রমে ঝালকাঠি নামকরণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। জানা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে জেলেরা এখানে মাছ শিকারের জন্য আসত এবং যাযাবরের মতো সুগন্ধা নদীর তীরে বাস করত। এ অঞ্চলের জেলেদের পেশাগত পরিচিতিকে বলা হতো ‘ঝালো’। এরপর জেলেরা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে এখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। এই জেলায় রয়েছে ভাসমান পেয়ারা বাজার।
এভাবেই জেলে থেকে ঝালো এবং জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে তোলার কারণে কাটি শব্দের প্রচলন হয়ে ঝালকাটি শব্দের উৎপত্তি হয়। পরবর্তীকালে ঝালকাটি রূপান্তরিত হয় ঝালকাঠিতে। ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারী ঝালকাঠি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা লাভ করে।
আরো পড়ুন: ১৫০ বছরেও বদলায়নি আহসান মঞ্জিল, বদলেছে বুড়িগঙ্গার রূপ

পটুয়াখালী জেলা
ঐতিহাসিক ঘটনাবলি থেকে জানা যায যে, পটুয়াখালী চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভক্ত ছিল। পটুয়াখালী নামকরণের পেছনে প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছরের লুণ্ঠন ও অত্যাচারের ইতিহাস জড়িত আছে বলে জানা যায়।
পটুয়াখালী শহরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত নদীটি পূর্বে ভরনী খাল নামে পরিচিত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে পর্তুগীজ জলদস্যুরা এই খালের পথ দিয়ে এস সন্নিহিত এলাকায় নির্বিচারে অত্যাচার হত্যা লুণ্ঠন চালাতো। স্থানীয় লোকেরা এই হানাদারদের ‘নটুয়া’ বলত এবং তখন থেকে খালটি নটুয়ার খাল নামে ডাকা হয়। কথিত আছে, এই ‘নটুয়ার খাল’ থেকে পরবর্তীতে এ এলাকার নামকরণ হয় পটুয়াখালী।
পিরোজপুর জেলা
ফিরোজ শাহের আমল থেকে ভাটির দেশের ফিরোজপুর। বেনিয়া চক্রের ছোয়াচ লেগে পাল্টে হলো পিরোজপুর।
উপরের কথন থেকে পিরোজপুর নামকরণের একটা সূত্র পাওয়া যায়। নাজিরপুর উপজেলার শাখারী কাঠির জনৈক হেলাল উদ্দীন মোঘল নিজেকে মোঘল বংশের শেয় বংশধর হিসেবে দাবি করেছিলেন বলে জানা যায়। বাংলার সুবেদার শাহ।। সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার নিকট পরাজিত হয়ে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে এসে আত্মগোপন করেন। এক পর্যায়ে নলছিটি উপজেলার সুগন্ধা নদীর পাড়ে একটি কেল্লা তৈরি করে কিছুকাল অবস্থান করেন।
আরো পড়ুন: পুরুষ হয়েও নারী অধিকার ও শিক্ষার বিষয়ে আজীবন লড়াই করা এক ব্যক্তি
মীর জুমলার বাহিনী এখানেও হানা দেয়, শাহ সুজা তার দুই কন্যাসহ আরাকান রাজ্যে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি অপর এক রাজার চক্রান্তে নিহত হন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ও এক শিশুপ্রত্র রেখে যান। পরবর্তীতে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে পশ্চিমে চলে আসে এবং বর্তমান পিরোজপুরের পাশ্ববর্তী দামোদর নদীর মুখে আস্তানা তৈরি করেন। এ শিশুর নাম ছিল ফিরোজ এবং তার নামানুসারে হয় ফিরোজপুর। কালের বিবর্তনে ফিরোজপুরের নাম হয় ‘পিরোজপুর’। পিরোজপুর ১৯৫৯ সালের ২৮ অক্টোবর পিরোজপুর মহকুমা এবং পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে জেলার রূপান্তরিত হয়।