ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

১৫০ বছরেও বদলায়নি আহসান মঞ্জিল, বদলেছে বুড়িগঙ্গার রূপ

আদি ঢাকা-৭
সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬:১৮, ৪ অক্টোবর ২০২০
১৫০ বছরেও বদলায়নি আহসান মঞ্জিল, বদলেছে বুড়িগঙ্গার রূপ
ছবি: বুড়িগঙ্গা পাড়ের আহসান মঞ্জিল

হাজারো বছর আগে সিন্ধু নদীর কুলে গড়ে উঠেছে হরপ্পা মহেঞ্জাদারো, নীল নদের তীরে মিশরীয়র মত সুপ্রাচীন সভ্যতা। নদীকে আবাহন করেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের আদি শহর, বন্দর। মহাকালের সাক্ষী হয়ে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে আজও। 

তেমনি বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন ঢাকা। রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে দক্ষিণ পশ্চিমাংশ ঘেঁষে বুড়িগঙ্গা নদী নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রবাহিত হয়েছে। খ্রিস্টীয় ৭ম শতক থেকে বুড়িগঙ্গার নদীর তীরে জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। 

আরো পড়ুন: দেওয়ানবাড়ি রূপ হারালেও ১৫০ বছর পুরনো মসজিদ আজও চকচকে

কালে কালে ঢাকার জীবনে বুড়িগঙ্গা হয়ে উঠে এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। বুড়িগঙ্গার জন্যই ঢাকার এত গুরুত্ব। তবে এখন বুড়িগঙ্গা কেবলই দূষণের শিকার। তার রূপ-জৌলুস এখন আর নেই আগের মতো। অন্যদিকে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা আহসান মঞ্জিল কিন্তু এখনো চিরযৌবনা।

বুড়িগঙ্গার পাড়ে এখনো টিকে আছে নবাবী আমলের চিহ্ন। ঢাকার ৪০০ বছরের প্রাচীন ইতিহাসের অংশ হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নবাবদের নিদর্শন ‘আহসান মঞ্জিল’। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিল বাংলার পর্যটন শিল্পের এক অনন্য নাম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই প্রাসাদ নিয়ে রয়েছে মানুষের ব্যাপক কৌতূহল।

আরো পড়ুন: ভয়ংকর জঙ্গল থেকে যেভাবে দেশের প্রথম কলোনির জন্ম

১৯ শতকের মাঝামাঝি ঢাকার মুঘল সূত্রীয় নবাবীর প্রতিনিধি তথা নিমতলীর নায়েবে নাজিম বংশের বিলুপ্তি ঘটলে এখানে মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এই শূন্যতা পূরণ করতে সফলভাবে এগিয়ে আসে কুমারটুলীর খাজা পরিবার। পরবর্তী প্রায় শতবর্ষ ধরে তারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বংশপরম্পরায় নবাব উপাধি ব্যবহারের অধিকার পেয়ে খাজা পরিবার পরবর্তী সময় ঢাকার নবাব পরিবার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আদিতে সমৃদ্ধশালী ব্যবসায়ী থাকলেও পরবর্তী সময়ে ভূসম্পত্তি কিনে পূর্ববঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ জমিদারে পরিণত হন তিনি। 

আহসান মঞ্জিলঢাকা নবাব পরিবারের আদি পুরুষের পরিচয় ও তাদের বাংলাদেশে আগমন সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও লেখকদের মধ্যে মতানৈক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে এ বিষয়ে সবাই একমত, এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা কাশ্মির থেকে এদেশে এসেছিলেন। 

বিদেশি লেখকের রচনা ছাড়াও ঢাকা নবাব পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে বেশ কিছু মৌলিক তথ্য পাওয়া যায় এই পরিবারেরই দুই লেখকের দুটি গ্রন্থে। এর একটি হলো-খাজা আব্দুর রহিম সাবার ফার্সিতে লেখা ‘তারিখে কাশ্মীয়ানে ঢাকা’, অন্যটি নবাব খাজা আহসানুল্লাহের উর্দুতে লেখা ‘তারিখে খান্দানে কাশ্মীরিয়াহ’।

আরো পড়ুন: বাহাদুর শাহ পার্কের গাছে ১১ সৈন্যর লাশ ঝুলে ছিল দীর্ঘদিন

দু’টি গ্রন্থই অপ্রকাশিত অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকার খাজা পরিবার কাশ্মিরে একটি নামকরা আলেম ও ধর্মগুরুর পরিবার বলে পরিচিত ছিল। তারাই ঢাকায় আহসান মঞ্জিল নির্মাণ করেন।

আহসান মঞ্জিলের পটভূমি

আহসান মঞ্জিল হলো ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদার সদর কাছারি। সাধারণভাবে নবাববাড়ির রংমহল তথা গম্বুজবিশিষ্ট দ্বিতল প্রাসাদ ভবনকেই আহসান মঞ্জিল বলা হয়ে থাকে। তবে এর পশ্চিমে নির্মিত দ্বিতল অন্দরমহলও এই প্রাসাদের অংশ হিসেবে বিবেচ্য। 

আহসান মঞ্জিল এমন একটি ইমারত যার সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ঢাকার নবাবদের নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই প্রাসাদ ভবন।

আরো পড়ুন: ঢাকাকে ‘মসজিদের শহর’ বলা হয় কেন?

ঢাকা মহানগরীর বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে আহসান মঞ্জিলের অবস্থান। এই স্থানটি ইসলামপুরের কুমারটুলী মহল্লা নামে পরিচিত। প্রাক মোগল সুলতানি আমলে সাধারণত বাসিন্দাদের পেশা অনুযায়ী এলাকার নামকরণ হতো। 

তখন কুম্ভকারদের বসতির কারণে এই স্থানের এমন নামকরণ হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। এর আশপাশে এমন নামকরণকৃত তাঁতিবাজার, শাখারী বাজার, সীচীপান্দর প্রভৃতি মহল্লা আজও সেই বাসিন্দাদের পেশার পরিচিতি বহন করছে।

মুঘল সুবেদার ইসলাম খান ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গার তীরে এখানেই প্রথম পদার্পণ করেছিলেন বলে তার নামানুসারে এলাকার নামকরণ হয় ইসলামপুর। এটি ব্রিটিশ ভারতের উপাধিপ্রাপ্ত ঢাকার নবাব পরিবারের বাসভবন ও সদর কাছারি ছিল।

দর্শণার্থীদের ভীড়সমগ্র আহসান মঞ্জিল দুটি অংশে বিভক্ত। পূর্ব পাশের গম্বুজযুক্ত অংশকে বলা হয় প্রাসাদ ভবন বা রংমহল। পশ্চিমাংশের আবাসিক প্রকোষ্ঠাদি নিয়ে গঠিত ভবনকে বলা হয় অন্দরমহল। দোতলা এই প্রাসাদের মেঝে ও বারান্দার মেঝে তৈরি হয়েছে মার্বেল পাথর দিয়ে। প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে খাবার ঘর, জলসাঘর, দরবার হল, লাইব্রেরি, বিলিয়ার্ড খেলার ঘর।

প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় আছে অতিথিদের থাকার ঘর, বৈঠকখানা, নাচঘরসহ আরও কিছু থাকার ঘর। প্রাসাদের ঠিক সামনে রয়েছে বিশাল বাগানসহ সবুজ মাঠ। বলা হয়ে থাকে আহসান মঞ্জিল ঢাকা শহরের প্রথম ইট-পাথরের ভবন। 

আরো পড়ুন: মাত্র ১২ নারী নিয়ে যাত্রা শুরু, বাকিটা ইতিহাস

১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। ২৩টি গ্যালারিসহ এই ভবনে প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রদর্শনীর জিনিসপত্র রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য আছে নবাব আমলের ডাইনিং রুম, নবাবদের ব্যবহৃত বড় বড় আয়না, আলমারি, সিন্দুক, কাচ ও চীনামাটির থালাবাসন, নবাবদের অতি বিশ্বস্ত হাতির মাথার কঙ্কাল গজদন্ত। 

এছাড়াও নবাব আমলের বিভিন্ন ধরনের অলঙ্কৃত রুপা ও ক্রিস্টালের তৈরি চেয়ার-টেবিল, বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, ফুলদানি, আতরদানি, পানদান, নবাবদের ড্রয়িংরুম, নাচঘর, সোনা ও রুপার তারজালি কাজ আহসান মঞ্জিলের মডেল।

আহসান মঞ্জিলে দুটি ভবন রয়েছে। একটি হচ্ছে ‘প্রাসাদ ভবন’ আর অন্যটি ‘অন্দর মহল’। এর মধ্যে প্রাসাদ ভবনে ২২টি গ্যালারি রয়েছে। সেখানে প্রায় ২ হাজারটি শিল্পকর্ম ও নিদর্শন রয়েছে। 

আরো পড়ুন: ৪০০ বছর আগেও ঢাকা ছিল চকচকে

জাদুঘর সূত্র জানায়, ভবনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে লোহার তৈরি নবাবের মূর্তিটি যেকোনো দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করবে- কিছু সময়ের জন্য হলেও দর্শনার্থীরা নবাবের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করবে। প্রতিটি গ্যালারির প্রতিটি শিল্পকর্ম ও নবাবী নিদর্শন দর্শনার্থীদের নয়ন জুড়ানোর পাশাপাশি হৃদয়কেও শীতল করবে বলে মনে করেন জাদুঘরটির সঙ্গে জড়িত একাধিক সূত্র। 

আহসান মঞ্চিলতবে এখানকার মূল শিল্পকর্ম হীরার তৈরি ‘দরিয়া-ই-নূর’ বর্তমানে সোনালী ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকার কারণে ‘দরিয়া-ই-নূর’ এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন না জাদুঘরে আগতরা। ‘অন্দর মহল’ নামের আরেকটি ভবন সাজানো হয়েছে নবাব ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রায় ৫০০ ছবি দিয়ে। 

শিল্পীর তুলিতে আঁকা নবাব পরিবারের প্রতিটি ছবিই যেন শিল্পের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। জাদুঘরটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রশাসন, ডিসপ্লে, নিরাপত্তা, সংরক্ষণ, শিক্ষাসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের অধীনে জাদুঘরের কার্যক্রমে ৫৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত আছেন।
 
টিকিট

আহসান মঞ্জিলে ঢুকতে হলে জনপ্রতি ২০ টাকা করে টিকিট কেটে নিতে হয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫ টাকা। সার্কভুক্ত নাগরিকদের জন্য প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৭৫ টাকা। আহসান মঞ্জিল বন্ধের আধঘণ্টা আগ পর্যন্ত টিকিট পাওয়া যায়।

সময়সূচি

বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিন জাদুঘর বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মকালীন সময়সূচি হলো এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা। 

শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। শীতকালীন সময়সূচি অক্টোবর থেকে মার্চ শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা। শুক্রবার দুপুর আড়াইটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার বাইরে থেকে বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ যেকোনো বাহনে আসা যাবে। বাসে এলে মহাখালী থেকে আজমেরী পরিবহন ও স্কাইলাইন বাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসে। সেখান থেকে রিকশায় চড়ে যাওয়া যায়। 

গাবতলী থেকে ৭ নম্বর ও সাভার পরিবহন বাস আসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত। তারপর রিকশায় চড়ে যেতে হবে। সায়েদাবাদ থেকে বেছে নিতে পারেন রিকশা বা উবার। ট্রেনে এলে কমলাপুর থেকে উবার বা রিকশা করে যাওয়া যায়। লঞ্চে এলে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে আহসান মঞ্জিল।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!