ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ সাতরং ]

ভয়ংকর জঙ্গল থেকে যেভাবে দেশের প্রথম কলোনির জন্ম

আদি ঢাকা-৫
সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:২৭, ১ অক্টোবর ২০২০
ভয়ংকর জঙ্গল থেকে যেভাবে দেশের প্রথম কলোনির জন্ম
ছবি: ১৯৫৯ সালে তোলা ছবিতে একদল হাস্যোজ্জ্বল শিশু-কিশোর

ছোট্ট নিরিবিলি ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা তখন মাত্র আড়াই লাখ। রমনার পর জনমানুষের দেখা মেলাই ভার। শহরের পায়ে চলা আঁকাবাঁকা পথগুলো ছেয়ে থাকে কৃষ্ণচূড়ায়। তিন-চার তলার উপরে দালানকোঠার সংখ্যা হাতেগোনা।

১৯৪৭ সালে মাত্র ১২ বর্গমাইলের এই ঢাকা শহর সহসা হয়ে উঠল প্রাদেশিক রাজধানী। বঙ্গভঙ্গের পরে তৈরি কিছু বৃহদাকার স্থাপনা ছিল। তবে তার বেশিরভাগই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকারে। এরকম সময় প্রশাসনিক প্রয়োজনে হঠাৎ করেই শহরের লোকসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। 

এই নতুন নাগরিকদের তালিকায় যেমন ছিলেন দাফতরিক কর্মকর্তা, কর্মচারি, আর তাদের পরিবার, তেমনই ছিলেন পল্লীগ্রাম থেকে শহরমুখী বেকার জনগোষ্ঠী। এককালে কাজের খোঁজে সবাই ছিলেন কলকাতামুখী। দেশভাগের ফলে সেই স্রোত এসে পৌঁছায় ঢাকায়।

আরো পড়ুন: বাহাদুর শাহ পার্কের গাছে ১১ সৈন্যর লাশ ঝুলে ছিল দীর্ঘদিন

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পড়ল ভারী বেকায়দায়। আবাসন তো পরের কথা, ন্যুনতম অফিস আদালত বসাবার জন্য ভবনের ব্যবস্থা করতেও তারা হিমসিম খাচ্ছিল। 

সাময়িক সমাধান হিসেবে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন দখল করে প্রশাসনিক কাজকর্ম শুরু করতে হলো, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- জগন্নাথ হলে বসল প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি, ইডেন স্কুলে বসল সচিবালয় ইত্যাদি।

তবে সরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লোকজন আর তাদের পরিবারকে কোথায় রাখা যায়? ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সৈন্যদের পরিত্যক্ত কিছু অর্ধপাকা ঘরবাড়ি ছিল পলাশি এলাকায়; লোকে বলত পলাশি ব্যারাক। সেই ব্যারাকেই সাময়িক বন্দোবস্ত হলো ২০০ এর বেশি কর্মকর্তা আর কর্মচারির। 

আজিমপুর কলোনির নির্মাণকালীন সময়ের ছবিআর এদিকে নতন প্রাদেশিক রাজধানি নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনার দায়িত্ব পড়ল ইংরেজ স্থপতি কোলম্যান হিক্স এর উপর। বিশেষত বন্যার পানি থেকে বাঁচিয়ে এ শহরের কোথায় দাফতরিক আর আবাসিক স্থাপনা তৈরি করা যায় তা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চললেন হিক্স ও তার দল। 

এসময়েই ঠিক হলো পলাশির পশ্চিমে লালবাগের আগে পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জলাজংগল পরিষ্কার করে সরকারি আবাসন গড়ে তোলা হবে। এলাকাটি তখন চরক আর শাল গাছে আচ্ছাদিত ছিল। ভন নামের এক ইংরেজ প্রকৌশলীর নেতৃত্বে এলাকার জমি ভবন নির্মানের উপযোগী করা হলো। 

দেশভাগের পরপর নির্মাণসামগ্রী ছিল অপ্রতুল। বিশেষভাবে অভাব ছিল লোহার রডের। এই অভাব মেটানোর জন্য তৎকালীন প্রকৌশলীরা ব্যবহার করলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈন্যদের ফেলে যাওয়া ছিদ্রযুক্ত ইস্পাতের পাত। 

আরো পড়ুন: ঢাকাকে ‘মসজিদের শহর’ বলা হয় কেন?

১৯৪১ সালের পর যুদ্ধবিমানের সহজ অবতরণের জন্য তেঁজগাও আর কুর্মিটোলায় সৈন্যরা এই পাতগুলো দিয়ে রানওয়ে তৈরি করেছিল। বাড়ি তৈরির সময় বেশকিছু নকশা করা হল স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে বিবেচনায় রেখে। 

ঘরে আলো প্রবেশের জন্য ছিল খড়খড়ির জানালা। রান্নায় লাকড়ির ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য ছিল চিমনির ব্যবস্থা। প্রথম দফায় ৪২টি দালান উঠলো। ৩ তলা প্রতিটি দালানে মোট ১২টি করে ফ্ল্যাট। নির্মাণ শেষে শুরু হলো ফ্ল্যাট বরাদ্দ। 

নতুন তৈরি আজিমপুর কলোনির বাসিন্দাদের চাহিদা মেটানোর জন্য গড়ে উঠল গভঃ নিউমার্কেট। এক মার্কেটে সবকিছু! এটা সে সময় ভাবাই যায় না। আর মার্কেটটি তৈরিও হয়েছিল খুব আকর্ষণীয় কায়দায়, ত্রিকোণাকার ল্যান্ডস্কেপে মার্কেটের ঠিক মাঝখানটা জুড়ে ছিল সুদৃশ্য গোলাপ বাগান। 

আজিমপুর কলোনিকেনাকাটার থেকে লোকে ঘুরতেই বেশি পছন্দ করত। আজিমপুর কলোনি যখন গড়ে ওঠে প্রথম দিকে তখন কাছাকাছির মধ্যে ভালো বিদ্যালয় ছিল ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল এবং নবকুমার ইন্সটিটিউশন। 

স্থানীয়দের সন্তানদের প্রয়োজনে গড়ে ওঠে আজিমপুর গার্লস স্কুল, আজিমপুর কিন্ডারগার্টেন (পরবর্তীতে অগ্রণী স্কুল), লিটল এঞ্জেলস স্কুল সহ আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তৈরি এই কলোনিতে ফ্ল্যাট পাওয়া তখন সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারিদের জন্য স্বপ্ন পূরণের নামান্তর। সাংবাদিক মীজানুর রহমান শেলীর স্মৃতিচারণ- ‘সেই আজিমপুর কলোনির এক নম্বর ‘জে’ ফ্ল্যাটে যেদিন আমরা প্রথম অধিবাসী হিসেবে দখল নিই, সেই দিনটার নাম-ঠিকানা মনে নেই। 

আরো পড়ুন: মাত্র ১২ নারী নিয়ে যাত্রা শুরু, বাকিটা ইতিহাস

শুধু এটুকু মনে পড়ে যে, সেদিন মা’র মুখে হাসি ছিল, আর বাবার চোখে ছিল দিগবিজয়ের আভাস। দেয়ালে দেয়ালে ছিল নতুন বাসস্থানের মৃদু সৌরভ আর সেদিনের আলুভর্তা, ডিমের তরকারি আর সাদা ভাতের স্বাদ সারা জীবনের মতো আমার জিভে লেগে আছে।’

আজিমপুর কলোনি সম্ভবত এদেশে বহুতলবিশিষ্ট গুচ্ছ আবাসনের প্রথম প্রকল্প। ১৯৪৭-এর ভারতবর্ষ বিভাজন পূর্র্বকালে এই ভূখণ্ডে একতলা বা দোতলা বাংলো ধরনের পাকা আবাসিক ভবন নির্মাণের সূত্রপাত ঘটে। 

তবে বহু পরিবারভিত্তিক বসবাসের জন্য তিন-চার তলাবিশিষ্ট ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘আজিমপুর এস্টেট’ হিসেবে পরিকল্পিত আজিমপুর কলোনি সম্ভবত এখানে পথিকৃৎ। 

আজিমপুর কলোনির গেইট‘আজিমপুর এস্টেট’ নির্মাণ প্রকল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি পথ-প্রদর্শনকারী পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এশিয়ার অন্যান্য দেশে নির্মাণশিল্প যখন স্থবিরপ্রায়, সেখানে এই অনগ্রসর পূর্ববাংলার ঢাকা শহরে সম্পূর্ণ প্রকল্পটি রেকর্ড সময়ে শেষ করা হয়। 

চারটি ব্লকে তিন কক্ষবিশিষ্ট ৪৮টি এবং ৩৮টি ব্লকে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৪৫৬টি ফ্ল্যাট এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবাসিক ঘনত্ব অর্জিত হয় একরপ্রতি ৮৫ জন। ১৯৪৯-এর জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ওই বছরের অক্টোবরে সমাপ্ত এ-প্রকল্পে থেকে দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুটি ফ্ল্যাট সম্পূর্ণ হয়েছে। 

প্রকল্প ব্যয় ছিল কোটি নয়, মাত্র ৭৫ লাখ টাকা! তৎকালে নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের উদ্যমী প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও কর্মকুশলতায় এত স্বল্প সময়ের মধ্যে বিশাল আবাসিক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছিল। 

আরো পড়ুন: ৪০০ বছর আগেও ঢাকা ছিল চকচকে

বিশেষত ইমারত নির্মাণ দপ্তরের প্রথম প্রধান প্রকৌশলী খান বাহাদুর মো. সুলায়মান সিআইইর নেতৃত্ব প্রকল্পটির সফল সমাপ্তির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল। আজিমপুর কলোনি তাই গণ্য হতে পেরেছিল পরবর্তীকালে এদেশে বাস্তবায়িত অসংখ্য সমজাতীয় সরকারি আবাসিক এলাকার পথপ্রদর্শক প্রকল্প হিসেবে।

নিজস্বতা হারিয়েছে আজিমপুর কলোনি

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলের আগেও গোড়াপত্তন আজিমপুর কলোনির। শুরুর দিকে কলোনির পরিধি সীমিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে পরিশীলিত রূপ লাভ করেছে।  

জানা গেছে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে সুবেদার আজিমুসের শাসনামলে (১৬৯৭-১৭০৩) প্রতিষ্ঠিত হয় এই কলোনি। ওই সময় রাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কলোনিতে বসবাস করত। আজিমুসের নামানুসারে নামকরণ হয় আজিমপুর কলোনির। 

আজিমপুর কলোনিঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামল-পরবর্তী সময়ে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে পরিশীলিত রূপ লাভ করে আজিমপুর কলোনি। যদিও প্রথম দিকে হাতে গোনা ভবন ছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ভবন সৃষ্টি হয়।

কলোনির বাসিন্দারা জানান, আজিমপুর উত্তর ও দক্ষিণ কলোনিতে বিভক্ত। সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল। একসময় দুই কলোনির মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন ছিল খুবই দৃঢ়। যেকোনো জাতীয় উৎসবে খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। 

প্রতিটি ভবনের বাসিন্দারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিত। এখন আর সেটি নেই। কাগজে-কলমে সরকারি কর্মকর্তাদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ হলেও থাকে ভাড়াটিয়া। নিজেরা কোনো মতে, এক-দুটি কক্ষে থেকে অন্য কক্ষগুলো ভাড়া দিচ্ছেন। কেউ কেউ রান্নাঘরকে কক্ষ বানিয়েও ভাড়া দিচ্ছেন।

কলোনিতে বসবাসরত এক বাসিন্দা বলেন, কলোনিতে এখন সব ধরনের মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। কখনো কখনো রাস্তার পাশে মাদকের আড্ডাও বসে। রাত-দিন চলে বখাটেদের উত্পাত। কর্মকর্তাদের নামে বাসা বরাদ্দ থাকলেও সেগুলো ভাড়াটিয়াদের সাবলেট দেয়া হয়। 

এতে বাইরের লোকজনের সঙ্গে বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়ে। সাবলেটে একটি কক্ষ ভাড়া দিলেও ভাড়াটিয়া থাকে একাধিক। মানুষের অতিরিক্ত চাপে পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।’

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আজিমপুরের আশপাশে রয়েছে বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ ইত্যাদি) ও সরকারি অফিস। নামিদামি কয়েকটি স্কুল-কলেজও এই এলাকায়। 

কাজেই অন্যান্য স্থানের চেয়ে এখানে আবাসনের চাপ বেশি। নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে অনেকেই আজিমপুর কলোনির ভরসা করেন। আর বাড়তি কিছু অর্থের আশায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন।

ছবি সংগ্রহে কৃতজ্ঞতাঃ শ্রদ্ধেয় ডাঃ তৌফিকুর রহমান

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেএমএস/টিআরএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!