৪০০ বছর আগেও ঢাকা ছিল চকচকে

ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১১ ১৪২৭,   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

আদি ঢাকা-১

৪০০ বছর আগেও ঢাকা ছিল চকচকে

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩১ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৬:৪১ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

স্বপ্নের নগরী ঢাকার রয়েছে গৌরবজ্জ্বল এক ইতিহাস। তবে আজকের ইট কাঠ পাথরের জঞ্জালে ভরা ঢাকা শহরকে দেখে অনেকেই ভুল করেন। জানেন কি? বর্তমানে ঢাকা রাজধানী হলেও আদিকালেও এর রূপ ছিল বেশ চকচকে। আজকের এই ঢাকা কিন্তু একদিনে আসেনি। 

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদের তীরে মানুষের বাস। আজ থেকে প্রায় ১৩০০ বছর আগে, সেই সপ্তম শতাব্দীতে এখানে মানুষের বসবাসের অস্তিত্ব জানা যায়। যদিও প্রথম দিকে এর ব্যাপ্তি বা প্রসার ছিল খুবই ধীর। সবুজ শ্যামলা, বনে ঘেরা ঢাকা আজ কল্পনা করাও কঠিন। 

১৬০০ সালে মুঘল পরবর্তীতে ইংরেজদের শাসন, ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি আমল, এরপর স্বাধীনতা পরবর্তী যুগ এবং বর্তমানে মেগাসিটি ঢাকা। ‘আদি ঢাকা’ প্রতিবেদনে একেক করে ঢাকার ইতিহাস তুলে ধরা হবে। আজকের প্রিথম পর্বে থাকছে আদি ঢাকার স্বর্ণযুগ নিয়ে- 

আরো পড়ুন: লাল শাপলার বিলে ছুঁটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা

৭০০ সালের দিকেও লোকালয়ের খোঁজ পাওয়া গেলেও, মূলত মোগল আমলেই এই ঢাকা এলাকার গুরুত্ব বেড়ে যায় অনেক। বহু প্রচেষ্টার পর ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমদিকে, ইসলাম খাঁর (শেখ আলাউদ্দিন চিশতি) বাংলা দখলের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্য বাংলায় বিস্তার লাভ করে। ইসলাম খাঁ মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে ঢাকাকে বাংলা প্রদেশের রাজধানী নির্ধারণ করেন এবং তখন থেকেই মূলত ঢাকার সম্প্রসারণের প্রথম ধাপ শুরু হয়। 

মুঘল আমলে যখন বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে নির্ধারণ করা হয়, এর প্রসার শুরু হয় তখন থেকেই। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসতে শুরু করে ঢাকার দিকে, হোক তা ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। 

যেহেতু নতুন রাজধানী স্থাপিত হয়েছিল, তাই অবকাঠামোগত বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়। বর্তমান ঢাকার যে এলাকা পুরান ঢাকা নামে পরিচিত, সেটিই মোগল আমলে ছিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। 

আরো পড়ুন: মোমবাতি তৈরির অর্থেই চলছে তাদের পড়ালেখা

লম্বায় ২০ কিলোমিটার এবং আড়াআড়ি প্রায় ১২ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে ছিল তখনকার ঢাকা। সেসময় এখানে প্রায় ১০ লাখ লোক বাস করত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়াও আলাদা প্রশাসনিক এলাকা ঢাকার বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

কিছুদিন আগেও পুরান ঢাকায় যে কেন্দ্রীয় কারাগার ছিল, মুঘল আমলে তা আসলে ছিল একটি দুর্গ। এই দুর্গকে কেন্দ্র করেই মুঘল আমলে ঢাকার বিস্তার হয়। ঢাকার আবাসন ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এই দূর্গ থেকেই পশ্চিম দিকে সরাই বেগমপুর আর উত্তর দিকে বাদশাহী-বাগ পর্যন্ত ঢাকা বিস্তৃত হয়ে পরে। 

যেহেতু তখন সম্পূর্ণ ঢাকাই ছিল নদীবিধৌত, তাই নদীর পারের এলাকাগুলোই ছিল সবচেয়ে দামী এলাকা। তাই সবচেয়ে বিত্তবান লোকেদেরই স্থান হত এসব এলাকায়। বকশিবাজার, রহমতগঞ্জ, চৌধুরি বাজার ছিল এমন এলাকা। অন্যদিকে, তেজগাঁওয়ের দিকে অনেক ইউরোপিয়ান বাংলোর দেখা পাওয়া যেত, কারণ এখানে ছিল বেশ কিছু শিল্প কারখানা। 

১৮ শতকের ঢাকাঢাকার স্বর্ণযুগের সূচনা

ঢাকা এবারই প্রথম এই বদ্বীপ অঞ্চলের রাজধানী হওয়ার মর্যাদা লাভ করেনি। এ শহরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস আজ কালের ধূসর গর্ভে বিলীন। শহরটির স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১৭ শতকে, ১৬০৮ সালে এখানে প্রতাপশালী মোগলদের পা পড়ার পর থেকে। 

১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে চিশতীকে রাজমহলের সুবাদার নিযুক্ত করেন সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খান। ১৬১০ সালে চিশতী ঢাকা বিজয় করেন। দিনে দিনে শহরটির বিস্তার ও জৌলুশ বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে নদী তীরে গড়ে উঠতে থাকে দৃষ্টিনন্দন অসাধারণ সব ভবন। 

সেসব ভবনের কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ আজও টিকে আছে। এ শহরের কিছু মসজিদ সেই মুঘল আমলে তৈরি। ১৭০৬ সালে মগ জলদস্যু ও দুর্বৃত্তদের হাত থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে মুঘল রাজপ্রতিনিধিকে ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় ঢাকার পতন।

আরো পড়ুন: ৩০ টাকার ‘আনানাস’, ভাগ্য বদলে দিচ্ছে পাহাড়িদের

ঢাকার মাটিতে পা রাখা প্রথম ইউরোপীয় ছিল পর্তুগিজরা। ১৬১২ সালে তারা একটি মিশন প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ডাচ, ফরাসি এবং প্রায় ১৬৬০জন ব্রিটিশ আসে এখানে। এদের সবাই নদী ও খাল-বিলের ধারে কারখানা স্থাপন করে। 

১৮ শতকে তাদের পিছু পিছু আসে আর্মেনিয়ান ও গ্রিকরা। এরা মূলত লবণ, সুপারি ও কাপড়ের ব্যবসা করত। পরবর্তীতে ১৮৫০ সালের পর, এরাই আধুনিক পাট ব্যবসার ভিত্তি স্থাপন করে।

ইউরোপীয় আগ্রাসনের ফলে ঢাকায় উন্নয়নের নবজোয়ার আসে। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আসে ১৭৬৫ সালে। ব্রিটিশরা অবশ্য হুগলি নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামকে বর্তমানে যা কলকাতা নামে পরিচিত বাংলায় তাদের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিল। 

আরো পড়ুন: বাংলার শত বছরের ঐতিহ্য ‘ঘরজামাই গ্রাম’

এরপর ঢাকা আবার গুরুত্ব হারায়। তখন নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী নির্বাচিত হলে শহরটি ১৯০৬-১১ সাল পর্যন্ত কিছু সময়ের জন্য আবার পূর্বগৌরব ফিরে পায়। বৃটিশেরা ঢাকার বিস্তারের দিকে নজর না দিয়ে বরং একে একটি আধুনিক শহর হিসাবে গড়ার দিকে মনযোগী হয়। 

বিভিন্ন রাস্তাঘাট, খোলা জায়গা এবং পার্ক, রাস্তার বাতি এবং আলোকসজ্জা, বিশুদ্ধ পানির সাপ্লাই এবং সুয়ারেজ সিস্টেম তাদের সময়ে নির্মিত হয়। ভিক্টোরিয়া পার্ক, যা এখন বাহাদুর শাহ পার্ক নামে পরিচিত, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি পার্ক। এই পার্কটি এখনো দেশের অন্যতম সেরা পার্ক বলে বিবেচিত।

বৃটিশ আমলেই ঢাকা মিউনিসিপলিটি এবং ঢাকার বিভিন্ন উন্নয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ দুয়ের সম্মিলিত উদ্যোগে ঢাকার বেশ সম্প্রসারণ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা ছিল অপরিকল্পিত। 

এসময়েই ঢাকা সম্প্রসারিত হয়ে ফুলবাড়িয়া, নওয়াবপুর এবং চকবাজারের দিকে যায়। এসময় রমনা, শাহবাগ, পল্টন এবং কাকরাইল ছিল সবচেয়ে দামী এলাকা। মুঘল ঐতিহ্যের রোশনাই আর নেই। একদা ‘প্রাচ্যের রোমান্টিক নগরী’ নামে প্রসিদ্ধ ঢাকা এখন হতশ্রী ও ভিড়াক্রান্ত। পরের পর্বটি পড়ার জন্য ডেইলি বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস