পুরুষ হয়েও নারী অধিকার ও শিক্ষার বিষয়ে আজীবন লড়াই করা এক ব্যক্তি

ঢাকা, সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ১১ ১৪২৭,   ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

পুরুষ হয়েও নারী অধিকার ও শিক্ষার বিষয়ে আজীবন লড়াই করা এক ব্যক্তি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৭ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০  

ছবি:ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ছবি:ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

"বিদ্যার সাগর তুমি, বিখ্যাত ভারতে/ করুণার সিন্ধু তুমি, সেইজন/ দীন যে দীনের বন্ধু ।" 

মাইকেল মধুসূদনের লেখা লাইনগুলো। বুঝতেই পারছেন কাকে নিয়ে লেখা। হ্যাঁ, তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সমাজ সংস্কারক তিনি। আরো একটু খোলসা করেই বলি তাহলে। যুগে যুগে যে কয়জন মহাপুরুষ সমাজ সংস্কার করেছেন। তাদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অন্যতম একজন।  ক্ষনজন্মা এই মহাপুরুষ পাণ্ডিত্য, চারিত্রিক দৃঢ়তা, কর্মনিষ্ঠা, নির্ভীকতা, হৃদয়বত্তা মানবসমাজে এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত । হিমালয়ের মতো বিশাল ও উন্নত মনের মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র শুধুমাত্র বিদ্যাসাগর ছিলেন না, করুণার সিন্ধুও ছিলেন ।

তার সম্পর্কে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন "দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার  অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষত্ব ।" তার অজেয় পৌরুষের জন্য তিনি একান্ত নির্ভীক, বড় বড় রাজা মহারাজা থেকে হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ কারসাহেব পর্যন্ত সকলেই তালতলার চটির কাছে অবনত । তিনি ছিলেন সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে । কোনো ক্ষুদ্রতা, নীচতা, নিষ্ফল আড়ম্বর তার মনুষত্বকে কখনো খর্ব করতে পারে নি । তাই দুইশো বছর অতিক্রান্ত হয়েও তিনি আজ সমান ভাবে অম্লান, অমর হয়ে আছেন বাঙালি জাতির হৃদয়ে ও মননে। 

আজ এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী। তিনি ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের পাঠশালায় পাঠানো হয়। ১৮২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে কলকাতার একটি পাঠশালায় এবং ১৮২৯ সালের জুন মাসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করানো হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। আট বছর বয়সে বাবার সঙ্গে হেঁটে কলকাতা যান এবং সংস্কৃত কলেজে ১২ বছর অধ্যয়ন করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তখন থেকেই ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি তার সঙ্গী। তাছাড়া প্রতি বছরই তিনি বৃত্তি এবং গ্রন্থ ও আর্থিক পুরস্কার পান।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাবা- মা
বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বাঙালি সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারে বিদ্যাসাগরের অবদান কোনোদিনও ভোলার নয়। একদিকে যেমন আধুনিক বাংলা ভাষার রূপকার, তেমনি বাল্যবিবাহ রোধ ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় রেখেছেন অবিস্মরণীয় ভূমিকা। তবে বাঙালির কাছে বিদ্যাসাগর নামেই বেশি পরিচিত। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুঃসাহসী এবং পরিশ্রমী চারিত্র্য, পেয়েছিলেন তার দৃঢ়সংকল্প ও সময়ানুবর্তিতার বৈশিষ্ট্য। মেরুদণ্ড সোজা করে লড়াই করার শক্তি তিনি পিতৃ-সূত্রেই অর্জন করেছিলেন।   

পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর লাভ করেছিলেন মানবসেবা ও দানশীলতার আন্তরপ্রেরণা- অর্জন করেছিলেন অনমনীয় তেজস্বিতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ সম্পর্কে বিদ্যাসগর লিখেছেন :'তিনি নিরতিশয় তেজস্বী ছিলেন; কোনো অংশে কাহারও নিকট অবনত হইয়া চলিতে, অথবা কোনো প্রকারে, অনাদর বা অবমাননা সহ্য করিতে পরিতেন না। তিনি, সকল স্থলে, সকল বিষয়ে, স্বীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন, অন্যদীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তন, তদীয় স্বভাব ও অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।' উত্তরকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রেও এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। 

জননী ভগবতী দেবীর কাছ থেকেও বিদ্যাসাগর লাভ করেছেন নানামাত্রিক উচ্চ জীবনাদর্শ। শৈশবে মায়ের কাছ থেকে ঈশ্বরচন্দ্র পেয়েছিলেন নিরহংকারী হবার প্রেরণা। মায়ের হিসাবী এবং মিতচারী মানসিকতা শৈশবে ঈশ্বরচন্দ্রকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। আত্মসুখের চেয়ে অপরের সুখই যে বড়- এই শিক্ষা বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন তার মা ভগবতী দেবীর কাছ থেকেই।

বিদ্যাসাগর পড়তে চেয়েছিলেন ইংরেজি স্কুলে কিন্তু পিতৃ-নির্দেশে তিনি পড়ালেখা করেছেন কলকাতার বিখ্যাত সংস্কৃত কলেজে। বারো বছরেরও অধিক সময় সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন, অর্জন করেন প্রাচীন ভারতীয় নানা শাস্ত্রে অসামান্য ব্যুৎপত্তি। সংস্কৃত কলেজে পাঠাভ্যাসকালে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে তিনি ইংরেজিও পড়েন। সংস্কৃত কলেজ থেকেই ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লাভ করেছিলেন 'বিদ্যাসাগর' উপাধি। সেখানে অধ্যয়নের সময় থেকেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতেন।

পড়া লেখায় ছিলেন দুর্দান্ত তিনি পিতার আর্থিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। তাই পাঠ সমাপ্ত করেই বিদ্যাসাগরকে চাকরিতে প্রবৃত্ত হতে হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং সংস্কৃত কলেজ- প্রধানত এই দুই প্রতিষ্ঠানেই বিদ্যাসাগর চাকরি করেছেন। বিদ্যাসাগর প্রথমেই চাকরিতে প্রবেশ করেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগে। ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পদ লাভ করেন এবং পরের মাসে ওই কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের অনেক সংস্কার করেন। এর আগে এ কলেজে পড়ার অধিকার ছিল কেবল ব্রাহ্মণ এবং বৈদ্য ছাত্রদের, কিন্তু তিনি সব শ্রেণির হিন্দুদের জন্যে কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করেন। তিনি কলেজে পড়ার জন্যে নামেমাত্র বেতন চালু করেন এবং প্রতিপদ ও অষ্টমীর বদলে রবিবার সপ্তাহিক ছুটি চালু করেন। 

কলেজের ডিগ্রি নিয়ে যাতে ছাত্ররা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ লাভ করতে পারে, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সে প্রতিশ্রুতিও আদায় করেন। কিন্তু তিনি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন কলেজের পাঠ্যক্রমে। পূর্বে ব্যাকরণ এবং বীজগণিত ও গণিত শেখানো হতো সংস্কৃতে, কিন্তু তিনি সংস্কৃতের বদলে ব্যাকরণ বাংলার মাধ্যমে এবং গণিত ইংরেজির মাধ্যমে পড়ানোর নিয়ম চালু করেন। ইংরেজি ভাষা শেখাকে তিনি বাধ্যতামূলক করেন এবং ইংরেজি বিভাগকে উন্নত করেন। বাংলা শিক্ষার ওপরও তিনি জোর দেন। তবে তারচেয়ে ব্যাপক পরিবর্তন করেন দর্শন পাঠ্যক্রমে। তিনি সাংখ্য এবং বেদান্ত দর্শনকে ভ্রান্ত এবং প্রাচীনপন্থী বলে বিবেচনা করতেন। সে জন্যে তিনি বার্কলের দর্শন এবং অনুরূপ পাশ্চাত্য দর্শন শিক্ষাদানের বিরোধিতা করেন এবং তার পরিবর্তে বেকনের দর্শন এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের তর্কশাস্ত্র পড়ানোর সুপারিশ করেন। 

অনেকে তার সমালোচনা করলেও, তার এ সংস্কার ছিল সুদূরপ্রসারী এবং শিক্ষা পরিষদ তার এ সংস্কারের প্রশংসা করে এবং পুরস্কারস্বরূপ সে সময় সেরেস্তাদার বা প্রথম পণ্ডিতের পদে মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে। সে কালের বিবেচনায় বেতন যথেষ্টই বলতে হবে। ১৮৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে তার বেতন বৃদ্ধি করে। বিদ্যাসাগরের এই চাকরিপ্রাপ্তি পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুরবস্থা দূর করল। সংস্কৃত কলেজে চাকরিরত অবস্থায় শোভাবাজার রাজবাড়িতে বিদ্যাসাগর নিয়মিত যেতেন অঙ্কশাস্ত্র, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা শিক্ষালাভ করতে। অথচ তিনি তখন ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জ্ঞানস্পৃহা ছিল অসীম। তিনি রাত জেগে পাঠ তৈরি করতেন, কত সহজে কঠিন বিষয় উপস্থাপন করা যায় সেজন্য তিনি আবিস্কার করেছিলেন নিজস্ব এক পদ্ধতি। 

সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়। সংস্কৃত কলেজে টানা বারো বছর তিনি অধ্যাপনা করেন- কখনও সংস্কৃতের অধ্যাপক হিসেবে, কখনো-বা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে। সংস্কৃত কলেজে চাকরি নিয়েই কলেজের সামগ্রিক অব্যবস্থা দূরীকরণ এবং উন্নত পাঠচর্চার দিকে বিদ্যাসাগর মনোনিবেশ করেন। এ সময় সংস্কৃত কলেজের সামগ্রিক অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। কলেজের অব্যবস্থা দূর করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেন বিদ্যাসাগর।

সারা জীবন মানুষের সেবা করেছেন

সংস্কৃত কলেজের উন্নতির জন্য যোগদানের পর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তার এই পরিকল্পনার মধ্যে ছিল কলেজের পাঠক্রমকে জুনিয়র ও সিনিয়র শাখায় বিন্যাস এবং পাঠ্যবিষয় পুনর্গঠন। সংস্কৃত কলেজের চাকরি ছেড়ে দেয়ার পরে বিদ্যাসাগর পুনরায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদান করেন। ১৮৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে চাকরি করার পর ৬ ডিসেম্বর তিনি সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। যোগদানের দশ দিনের মধ্যে সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা সংস্কারের জন্য শিক্ষা সংসদের কাছে একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। 

১৮৫১ সালের ২২ জানুয়ারি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম থেকেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা সরকার ফেলো হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। ১৮৫৫ সালের ১ মে মেদিনীপুর, হুগলি, নদীয়া এবং বর্ধমান জেলায় শিক্ষা বিভাগের সহকারী ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিদ্যাসাগর। এ সময় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ এবং শিক্ষা বিভাগের সহকারী ইন্সপেক্টরের চাকরিসূত্রে বিদ্যাসাগর একত্রে পাঁচশ টাকা বেতন পেতেন। উপার্জিত টাকার অধিকাংশই তিনি ব্যয় করতেন নারী শিক্ষা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে। 

১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ ভারতব্যাপী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে ভারত সরকারের নির্দেশে সংস্কৃত কলেজ বউবাজারে ভাড়াবাড়িতে স্থানান্তরিত হয় এবং সংস্কৃত কলেজের মূল ভবনে সরকারের অনুগত সৈনিকদের জন্য অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুণ্ণ হন বিদ্যাসাগর। একদিকে সংস্কৃত কলেজের সামূহিক উন্নতির জন্য তার পরিকল্পনার প্রতি সরকারের অনীহা, অন্যদিকে তার মতামতকে উপেক্ষা করে সংস্কৃত কলেজে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ- এই দ্বৈত কারণে কলেজের অধ্যক্ষতার প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বিদ্যাসাগর। ১৮৫৮ সালের ৩ নভেম্বর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ কলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। পুনরায় স্মরণ করি, এ সময় বিদ্যাসাগর মাসিক বেতন পেতেন পাঁচশত টাকা, সময়টা ১৮৫৮ সাল, আর বিদ্যাসাগরের বয়স মাত্র ৩৮ বছর। জীবনে কখনো তিনি আপস করেননি। এক্ষেত্রেও কোনো আপস করলেন না সিংহপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

বাংলাদেশে জনশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। শিক্ষা সংসদের অনুরোধে তিনি সমগ্র দক্ষিণ বাংলা মডেল স্কুলের পাঠক্রম রচনা করেন, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির স্কুলসমূহের পাঠক্রম উন্নয়নে পালন করেন মুখ্য ভূমিকা। স্কুলে যাতে যথাযথ পাঠ-পদ্ধতি অনুসৃত হয়, সেজন্য তিনি ভারত সরকারকে বুঝিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মোদিনীপুরসহ নানা স্থানে তিনি দিবা ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত নৈশ বিদ্যালয়ে গ্রামের কৃষক, জেলে, কামার, কুমোর, জোলা- এসব শ্রমজীবী মানুষ পড়ালেখা করতেন। বিদ্যাসাগর স্কুলের শিক্ষকদের বেতন দিতেন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে, স্কুল পরিচালনার জন্য তাকে ঋণগ্রস্তও হতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর কোনো বেতন নিতেন না, উপরন্তু পাঠোপকরণ তিনি নিজের অর্থে ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের উপহার দিতেন। সাধারণ মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বলে উঠুক- এই-ই ছিল বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন।

বাঙালি সমাজে নারীশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। নারীশিক্ষার কথা তিনি কেবল চিন্তাই করেননি, সেই চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য গ্রহণ করেছেন বহুমাত্রিক উদ্যোগও। নারীর কল্যাণকেই বিদ্যাসাগর সমাজের কল্যাণ বলে বিবেচনা করেছেন; তাই নারীশিক্ষার প্রতি তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। কলকাতার বেথুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিদ্যাসাগর প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৮৭৯ সালে যখন বেথুন বালিকা বিদ্যালয় কলেজে উন্নীত হয়, তখন সেটিই ছিল এশিয়ার প্রথম গার্লস কলেজ। বেথুন গার্লস কলেজ প্রতিষ্ঠায়ও বিদ্যাসগর পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একসময় বেথুন স্কুলটি তুলে দেবার উদ্যোগ নেয় বাংলা সরকার, কিন্তু বিদ্যাসাগরের অনড় আচরণ এবং দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ সফল হয়নি- বেঁচে যায় স্যার ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই বালিকা বিদ্যালয়টি।

নারীশিক্ষা বিস্তারের জন্য বিদ্যাসাগর বেছে নিয়েছিলেন প্রধানত চারটি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলকে। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাস- এই স্বল্প সময়ের মধ্যে মেদিনীপুর-হুগলি-নদীয়া ও বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের অর্থে বিদ্যাসাগর মোট ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এসব স্কুলের পাঠক্রম নিজে প্রস্তুত করেন বিদ্যাসাগর। তিনি নিয়মিত স্কুলগুলো পরিদর্শনে যেতেন, স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতেন, কখনো বা নিজেই শ্রেণিকক্ষে গিয়ে ক্লাস নিতেন। প্রথম ছয় মাস স্কুলের যাবতীয় খরচ তিনি নিজে বহন করেন। ভারতবর্ষে নারীশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ইংল্যান্ড থেকে আসা মিস মেরি কার্পেন্টারকেও বাংলা সরকারের অনুরোধে বিদ্যাসাগর প্রভূত সহায়তা করেন। 

মেরি কার্পেন্টারের সঙ্গে বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে যেতেন বিদ্যাসাগর, স্কুলসমূহ পরিচালনার জন্য কার্পেন্টারকে দিতেন যথাযথ পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা। কেবল নারীর প্রাথমিক শিক্ষা নয়, তার উচ্চশিক্ষার জন্যও বিদ্যাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নারীরা পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা, এ বিষয় নিয়ে যখন বাদানুবাদ আরম্ভ হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীর পরীক্ষা দেয়ার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। এন্ট্রান্স থেকে স্নাতক- সকল পর্যায়ে নারী যাতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে, বিদ্যাসাগর তার পক্ষে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছিলেন।

নারী শিক্ষা এবং অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন তিনি বিদ্যাসাগরের একান্ত আগ্রহের ফলেই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭) প্রতিষ্ঠার একুশ বছর পর ১৮৭৮ সালে সিনেটের এক বিশেষ সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে বাংলার নারীর উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। নারীশিক্ষা-বিষয়ক প্রচলিত ধারণাকেই পাল্টে দেন বিদ্যাসাগর। একসময় ভাবা হতো সন্তান লালন-পালন করা আর গৃহস্থালী কাজ শেখাই নারীশিক্ষা। কিন্তু বিদ্যাসাগর মনে করতেন দ্রুত পরিবর্তনশীল সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সমতা রক্ষার জন্য নারীর শিক্ষাই প্রকৃত অগ্রগতি- এ উদ্দেশ্যেই তিনি প্রণয়ন করেছিলেন নারীশিক্ষার পাঠক্রম।
বাঙালি সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিদ্যাসাগরের পরিচিতি সুবিদিত। তার সমাজ সংস্কার চেতনা প্রধানত নারীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। উনিশ শতকে প্রচলিত নারীর জন্য অবমাননাকর ও অমানবিক অনেক প্রথা বিলোপের জন্য তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন, চালু করেন নারীর কল্যাণের জন্য অনেক বিধান। বস্তুত, তার একক সংগ্রামের ফলেই ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তন করেন।

বিদ্যাসাগর বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেন, বিরোধিতা করেন কৌলীন্য প্রথার। বিধবা বিবাহ চালু, বহুবিবাহা প্রথা এবং বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য কাজ করেছেন, বর্জন করেছেন কৌলীন্য প্রথার অনাচার। বর্তমান সময়ের উদার নারীবাদের আলোকে বিদ্যাসাগরের কর্ম ও সাধনাকে মূল্যায়ন করলে তাঁকে অনায়াসেই একজন নারীবাদী তাত্ত্বিক এবং লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
একজন সাহিত্যিক হিসেবেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রেখে গেছেন অনন্য কীর্তির স্বাক্ষর। বাঙালি সমাজকে শিক্ষায় আগ্রহী করে গড়ে তোলার জন্যই বিদ্যাসাগর লেখনী ধারণ করেছিলেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭, শকুন্তলা (১৮৫৪), সীতার বনবাস (১৮৬০), ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯), আত্মচরিত (১৮৯০), প্রভাবতী সম্ভাষণ (১৮৯২)- এসব রচনা বিদ্যাসাগরের সাহিত্যকর্মের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সুবিখ্যাত প্রাইমার বা শিশুশিক্ষার বই বর্ণপরিচয় (১ম-২য় ভাগ)। বাংলা ভাষায় শিশুশিক্ষার বই হিসেবে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস। সরল ভাষায় এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বর্ণ, বর্ণের শ্রেণিবিভাগ, লিখনকৌশল এবং পাঠ্য-বিষয় এখানে উপস্থাপন করেছেন বিদ্যাসাগর।

বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-শিক্ষার ইতিহাসে চিরকালের এক উজ্জ্বল নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পরেও আমরা পেরিয়ে এসেছি একশ' ত্রিশ বছর। তবু বাঙালি সমাজে এখনো তিনি অব্যাহতভাবে প্রাসঙ্গিক। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নানামাত্রিক চিন্তা বাঙালি সমাজে এখনও পথের দিশা হিসেবে কাজ করতে পারে।  

ডেইলি বাংলাদেশ/কেএসকে