‘অবিশ্বাস্য’ উপায়ে সাহিত্যচর্চায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা
হঠাৎ কানে ভেসে এলো ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দ। বইমেলায় হাঁটার সময় সে শব্দে থমকে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। তাকালাম এক তরুণের দিকে। কাছে ভিড়তেই দেখলাম দৃষ্টি যুগল নেই তার। তবুও আঙ্গুলের স্পর্শে একটু একটু করে পড়ছিলেন ‘আজ ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবস। বনভোজনে মেতে উঠলো ছেলেমেয়েরা। কেউ চাল আনলো, কেউ তেল আনলো, কেউ আনলো ডাল’, যা ছিল সত্যিই অবিশ্বাস্য।
গল্পটি ছিল নাজিয়া জাবিনের রচিত ‘বনভোজন’। যিনি ‘বনভোজন’ গল্পটি পাঠ করছিলেন তিনি নুরুল আলম। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আলম সরকারি আশেকানে আউলিয়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্র।
সাহিত্যের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে বললেন, আমরা যে ভাষায় বুঝতে পারি সে ভাষায় সাহিত্যের বই খুব কম রয়েছে। আমি হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তে পছন্দ করি। মোবাইলের ব্রেইল সফটওয়্যারে মাধ্যমে গল্প শুনি কিন্তু পড়া হয় না। যদি প্রকাশিত বইয়ের কিছু বই ব্রেইল ভাষায় লেখা হতো তবে আমরা পড়তে পারতাম।
ব্রেইল প্রকাশনার উদ্যোগ নিয়ে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের প্রকাশক চৌধুরী ফাহাদ বলেন, প্রকাশনাটি যে ধরনের কাজ করছে, তাদের কাজকে সাধুবাদ জানাই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও সাহিত্যচর্চা করছে এর চেয়ে ভালোলাগার আর কী হতে পারে! আমার প্রকাশনীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এ ধরনের কাজ করার ইচ্ছা আছে।
২০২০ সাল থেকে চট্টগ্রাম বইমেলায় স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা স্টল দিচ্ছে। এ প্রকাশনার কোঅরডিনেটর নাসিমা শওকত তাদের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে বলেন, আমরা ২০২০ সালে প্রথম চট্টগ্রাম বইমেলায় স্টল দিয়েছি। এর আগে কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি স্টল হবে সেটা ভাবতেও পারেনি। প্রকাশক বা সাধারণ পাঠকরাও ভাবতে পারেনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সাহিত্যচর্চার প্রতি আগ্রহ আছে বা বলা যায় তারাও পাঠক। তাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের ব্রেইল প্রকাশনের যাত্রা।
তিনি আরো বলেন, আমরা সকল লেখকদের জানাতে চাই যে আপনাদের আরো এক শ্রেণির পাঠক আছে যাদের নিয়ে একটু ভাবুন। তারা আপনাদের বই পড়তে চায়। আপনারা যদি প্রতিবছর প্রকাশিত বইয়ের একটি বা দু'টি কপি ব্রেইল আকারে প্রকাশ করেন তবে এ শ্রেণির পাঠক আপনাদের বই পড়তে পারবে। আমরা আপনাদের বইয়ের অপেক্ষায় আছি। আপনাদের লেখা পড়ে তারা জানতে পারবে আপনারা কীভাবে লেখছেন এবং তারাও আপনাদের পাঠক হবে। একইসঙ্গে বলতে চাই তারা আপনাদের পড়ে ভালোলাগার জায়গাটুকু নিজেদের মতো করে প্রকাশ করতে চায়। আমাদের পাঠকরা আপনাদেরও সম্মান জানাতে চায়।
স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার সম্পর্কে কবি আলমগীর ইমন বলেন, চট্টগ্রাম বইমেলায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উপস্থিত দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। এখানে যাদের বই প্রকাশ হয়েছে তারাও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সাহিত্যচর্চা করছে, এটা আমাদের ভাবায়।