ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

‘একটি আষাঢ়ে স্বপ্ন’ নাট্য উপন্যাসের পঞ্চম পর্ব

ড. মুকিদ চৌধুরী
প্রকাশিত: ১৮:৪০, ৩১ অক্টোবর ২০২৪
‘একটি আষাঢ়ে স্বপ্ন’ নাট্য উপন্যাসের পঞ্চম পর্ব
ছবি: ‘একটি আষাঢ়ে স্বপ্ন’ নাট্য উপন্যাস

স্বপ্নমদির নেশায় মেশা
এ কী উন্মত্ততা

মেঘবন একটি স্বপ্ন দেখল। 
মেঘবনের বুকের ওপর দিয়ে যেন একটা সাপ কিলবিল করে চলে গেল। 
প্রাণহীন শরীর যেন নদীতে ভাসছে। জলচর প্রাণীর আহার। 
মেঘবন ঘুম থেকে ধড়মড় করে উঠে বসল। 
তারপর...
মেঘবন চিৎকার করতে লাগল।
বলতে লাগল, লিন্দুচন্দ্র, তুমি কোথায়? 
কোনও উত্তর আসে না।
আমাকে ফেলে কোথায় গেলে!
উত্তর পাওয়া যায় না। 
সাপটাকে মেরে ফেলো। আমাকে নদী থেকে উদ্ধার করো। ওহ, কী ভয়ানক স্বপ্ন! 
সহযোগিতারও কোনও হাত এগিয়ে আসে না।

লিন্দুচন্দ্র, তুমি কি আমার চিৎকার শুনতে পারছ না? তুমি যদি আমার আর্তনাদ শুনতে পাও তাহলে আমার ডাকে সাড়া দাও। ভয়ে অচেতন হয়ে যাচ্ছি আমি। তোমার কাছ থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন? তুমি কি আমার আশেপাশে নেই! 
মেঘবন এই অন্ধকারে এক ভারী শিলাখণ্ডের মতো পরিত্যক্ত আর স্থবির বোধ করে।

Advertisement

কী মাধুরী সুগন্ধ
বাতাসে যায় ভাসি
পরিরানির শয্যার পাশেই নাটকের দলটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে এসে হাজির হল। চারদিকে মশালের আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হল।

সোনাজবার মনে প্রশ্ন জাগতেই একটা ভগ্ন সিঁড়ির ওপর বসতে বসতে চকিতবিদ্ধ কণ্ঠে শুধাল, অচিন, আমরা সবাই কি এখানে উপস্থিত?
অচিনের হৃদয় যেন একটি আতঙ্কিত অসম্মানের ছায়ায় ছেয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে ভয়ও ফুটে উঠল। তারপরও সোনাজবার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, হ্যাঁ। সবাই উপস্থিত। দেখো, মহড়ার জন্য এরকম একটি জায়গা পাওয়া খুবই কঠিন। কালরাত্রি মন্দিরের এই-যে বিশাল ভগ্নোন্মুখ চত্বরটি দেখছ, এটিই হবে আমাদের মঞ্চ। আর ওই যে সিঁড়ির নিচে আড়ালটি দেখছ, তা হবে সাজঘর। প্রত্যেকে তার অভিনয়পালা শেষ করে সেখানে চলে যাবে। 

সোনাজবার অনুভূতি যেন তখন অতি তীব্র আলো-অন্ধকারে নিকষ এবং ঝলকানো, অনেকটা দ্রুতবেগের মেঘের নিচে বিদ্যুচ্চমক যেন। পলকে পলকে রূপ বদলায়, মৌন থাকে কিংবা কলকলিয়ে বাজে। এই রূপ নিয়েই সোনাজবা বলল, অচিন বাবু...।
অচিনের চোখের দৃষ্টিতে বিতৃষ্ণা। প্রতিবাদ সংশয়ে থমকে দাঁড়ায় ঠোঁটের কূলে। প্রতিবাদের ভাষা নিশ্চয় তর্কের সৃষ্টি করবে, এবং তা অচিনের করা উচিত কি না স্থির করতে পারছে না। তবুও বলল, কী হল আবার, সোনাজবা! 

সোনাজবার চোখে অনুসন্ধিৎসা এবং দ্বিধা। বলল: কিচ্ছু না। তবে, এই-যে ‘বিজয় ও মালা’ যাত্রাঢংয়ের নাটকটি করতে যাচ্ছ, এতে কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য আছে যা আমাদের পক্ষে ফুটিয়ে তোলা কঠিন। অসম্ভবই বলা যায়।

অচিনের ভ্রুকুটি মুখে তখন বিস্ময় ফুটে ওঠে, অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, যেমন?
অচিনকে কেবল অবিবেচকই মনে হয়নি সোনাজবার, বোকাও মনে হয়। সোনাজবার শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠ যেন আবার ছলছলিয়ে ওঠে। ধ্বনিত হল, যেমন, বিজয়কে একটি তলোয়ার বের করে আত্মহত্যা করতে হবে। বিজয় যখন সেই তলোয়ারটি বের করবে তখন দর্শকের কী দশা হবে তা কি ভেবে দেখেছ? হয়তো না। সে এক ভয়ানক ব্যাপার!
কৌতূহলের তীব্রতায় ঘাড় ঝাঁকিয়ে এবং কপালে হাত ঠেকিয়ে বৈছা বলল, এ তো দেখছি এক মস্ত বড় সমস্যা!

কালাচান্দ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল: আমি মনে করি যে, হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যগুলো বাতিল করে দেওয়াই ভালো।
সোনাজবা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে ঘাড় কাত করে কালরাত্রি মন্দিরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল: না, না। কোনও দৃশ্য বাতিল করতে হবে না। কী বলো অচিন!
পরিত্যক্ত মানুষের মতো অচিন জানতে চাইল, তাহলে?
সোনাজবা সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল: অচিন, তুমি বরং আমাকে একটি মুখবন্দনা লিখে দাও, যা নাটকের শুরুতে আমি পাঠ করব। 
সোনাজবার বিচ্ছিন্ন উন্মুখ ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বৈছা শুধাল, কেন, কেন?
অচিনের চোখমুখের অভিব্যক্তিতে যেন একটি সূ² অপরাধ বোধ জেগে উঠল। অনেকটা গলিত আগুনের স্রোতের মতো কেঁপে কেঁপে বলল: তা বলতে হবে না, সোনাজবা। তবে বলো, কী লিখতে হবে!

সোনাজবা এক হাত কোমরে স্থাপন করে এবং মুগ্ধ চোখে অচিনের দিকে তাকিয়ে বলল, লিখতে হবে এই-যে, বিজয় তার তলোয়ার দিয়ে কাউকে আক্রমণ করবে না। শুধু অভিনয়ের জন্য ব্যবহার করছে। আর বিজয়ের চরিত্রে যে অভিনয় করছে তার নাম হচ্ছে সোনাজবা। সে আসলে জল্লাদ নয়, একজন পটকার মাত্র। এই মুখবন্দনার জন্য দর্শক আর ভয় পাবে না। 

একটা বাতাস উত্তর দিক থেকে এসে দোলা দিয়ে যায় অচিনকে। খসখস শব্দ ওঠে শুকনো পাতায়। সেদিকে তাকিয়ে অচিন বলল: ঠিক, ঠিক। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএইচএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!