ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]
পর্ব-৩

করোনাকালের খেরোপাতা  

(আমার ২০২০ সালের অভিজ্ঞতা) 
মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ২২:২৫, ১০ এপ্রিল ২০২৩
করোনাকালের খেরোপাতা  
ছবিঃ অন্তর্জাল, প্রতীকী

“ভীষণ একাকী বোধ করলাম। ঠিক যেন পৃথিবীর শেষ জীবন্ত মানুষ আমি। আমার পক্ষে এই একাকীত্বের অনুভূতি বর্ণনা করা সম্ভব নয়। কেবল হালকা ধরনের বাতাসের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলাম আমি এবং কিছুই চিন্তা করতে পারছিলাম না।”- হারুকি মুরাকামি (উপন্যাস - কাফকা অন দ্য শোর)

সিএমএইচের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে অফিসার্স করোনা ওয়ার্ড নামে সাম্প্রতিক অতীতে একটি বিশেষ ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। নির্মীয়মান একটি বহুতল ভবনের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা জুড়ে। করোনার ভবিষ্যৎ রোগীদের সংখ্যা বাড়লে  শুধুমাত্র অফিসার্স ওয়ার্ডে সংকুলান করা যাবে না ভেবে। আমার কক্ষটি ৬ষ্ঠ তলায়। হাসপাতালে ভর্তি হবার পর প্রথম চারদিন আমাকে  এখানেই থাকতে দেওয়া হলো। হোম কোয়ারেন্টাইনের সাথে আমার এই অবস্থানের পার্থক্য মূলত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ পাওয়া নিয়ে।

ইতিমধ্যেই আমার শরীর যথেষ্টই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হতে লাগল যে, আমি জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। যেকোনো  মূহুর্তেই মরে যেতে পারি। অনেকটা কবি রফিক আজাদের সেই বিখ্যাত কবিতার মতো-  ‘চ’লে যাব সুতোর ওপারে’!

Advertisement

প্রিয়জনদের নিকট হতে চিরতরে চলে যাওয়ার ভাবনা আমার ভেতরে বড় ধরণের বিষাদগ্রস্ত ভাবের সৃষ্টি করল। মনে হলো খুব অসময়ে আমার এই চলে যাওয়া হবে। পৃথিবীর কতকিছুই আমি দেখিনি। প্রিয়জনদের প্রতি কত দায়িত্ব আমি এখনো পালন করিনি।

আমার স্ত্রী প্রতিদিন সিএমএইচে আমি যে ওয়ার্ডে থাকি সেখানে আসে। আমি মানা করা সত্ত্বেও। সিএমএইচ হতে সরবরাহ করা খাবারের বাইরেও প্রচুর পরিমাণে ফলমূল নিয়ে আসে। আপেল, কমলা, জাম্বুরা, আমড়া ইত্যাদি। পাশাপাশি আমি আদা-লেবু চা ও গরম পানি পান করি। দিনে অন্তত ৪/৫ বার মৃদু গরম লবন-পানি দিয়ে গার্গল করি।

কিন্তু এখানে ৪ দিন অবস্থানের পরেও আমার শ্বাসকষ্ট কমল না। ভীষণ দুর্বল অনুভব করতে লাগলাম। ৫ম দিন সকালে করোনা ওয়ার্ডের ওয়াইসি আমাকে দেখতে এলেন। সম্ভবত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ। সবাই মুখে মাস্ক ও পিপিই পরে  থাকার কারণে আমি কাউকেই চিনতে পারছিলাম না। উনি আমাকে বললেন, “স্যার, আপনি ছবিঘর আসাদ, না? আমি তো আপনার লেখা পড়ি ফেসবুকে।”

আমি প্রবলভাবে তাকে চেনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস নিতে অসুবিধা ও মাথা কিছুটা গুলিয়ে আসার কারণে তাকে স্পষ্টভাবে চিনতে ব্যর্থ হলাম। উনি আমাকে রুমের সামনে দিয়ে ২০ কদম হেঁটে আসতে বললেন। এতটুকু হাঁটতেই আমার মনে হলো আমি পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এসেছি। এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন আমাকে এইচডিইউ বা ইনটেনিসিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করার জন্যে।

‘এইচডিইউ’তে আমি ছিলাম ৫দিন। এখানকার পরিচর্যা ও চিকিৎসার মান ওয়ার্ডের চেয়ে অনেক ভালো। আমাকে এখানে দিবারাত্র মনিটর করা হতো। বেশিরভাগ ওষুধই স্যালাইনের মাধ্যমে পুশ করা হতো। প্রথমদিনেই আমার নাভির চারপাশে অনেকগুলো ইনজেকশন দেওয়া হলো। সাথে সারাক্ষণ অক্সিজেন সাপোর্ট। দুর্বলতা ও ওষুধের ইফেক্টের কারণে আমি এক ধরনের আচ্ছন্নতার ভেতরে চলে গেলাম। শুধু খাবারের সময়ে ও ওয়াশরুমে যাবার সময়ে জেগে উঠতাম। অন্য সময়গুলোতে থাকতাম ঘুম বা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়। এক সময়ে আমার মনে হলো অক্সিজেন সাপোর্ট  খুলে নেয়া হলে আমি হয়তো আর কখনোই নিঃশ্বাস নিতে পারবো না।

বিশেষ করে অক্সিজেন সাপোর্ট থেকে মুক্ত হয়ে ওয়াশরুমে যাওয়া আসা নিয়ে আমার জন্যে যথেষ্ট বড়  সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। আমার বেড হতে ওয়াশরুমের দূরত্ব প্রায় ৩০/৩৫ গজ দূরে হবার কারণে ওয়াশ রুমে যেতে আসতে আমার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাচ্ছিলো। তবে এইচডিইউতে অবস্থানের সময়ে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্ট ও প্রচুর পরিমাণে ওষুধ পুশ করার কারণে আমার অক্সিজেন লেভেল দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে এলো  (৯৮/৯৯) এবং আমি তৃতীয় দিন হতেই অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারলাম। এই পর্যায়ে ৫ম দিনে আমাকে আবার অফিসার্স করোনা ওয়ার্ডে ফেরত পাঠানো হলো।

এইচডিইউ থেকে ওয়ার্ডে ফিরে আসার পর আমাকে আবার করোনা ওয়ার্ডের আগের রুমে থাকতে দেওয়া হলো। এটি একটি প্রশস্ত রুম। রুমের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটি বড় বারান্দা। ভবনটি  সিএমএইচ এলাকার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এর পাশ দিয়ে দেয়ালের ওপারেই সিএমএইচের বাইরে ভাষানটেক বস্তির একটি গলি। বারান্দা থেকে নীচের দিকে তাকালে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা দেখা যায়। এলাকাটিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনেক বিল্ডিং উঠছে যত্রতত্র। বাইরে সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকের প্রবল উষ্ণতা। সূর্যের তাপে গলে যাবার উপক্রম সবকিছু। আমার বিছানা থেকে বারান্দার গ্রিল দিয়ে উত্তাপে ধূসর হয়ে যাওয়া আকাশ ছাড়া কিছুই দেখা যায় না।

বিছানায় শুয়েই একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম আমি। নীচের ভূমি হতে সৃষ্ট একটা নাম না জানা গাছের মাথা তালগাছের মতো দীর্ঘ হয়ে বারান্দার গ্রিলের মধ্য দিয়ে দূর থেকে অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে নড়াচড়া করছে। খুব ধীরে ধীরে। এতটাই ধীরে ধীরে যে প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না। কয়েক ইঞ্চিও হবে না এর হরাইজন্টাল সরণ বা প্রতিস্থাপন। আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে, প্রবল উত্তাপের ভেতরেও এই শীর্ণ গাছটা বেঁচে আছে। তার মাথার মৃদু নড়াচড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, তার প্রাণের স্পন্দন শেষ হয়ে যায়নি; সুযোগ পেলেই সে আবার পল্লবিত হবে। অনুভব করলাম যে, পরিবেশ-প্রতিবেশ যতই প্রতিকূল হোক না কেন, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই জীবনে টিকে থাকার মূলমন্ত্র।

নিষেধ অমান্য করে প্রায়দিনই বিকেলে আমার স্ত্রী আমাকে দেখতে আসে। যদিও আমি তাকে কয়েক মিনিটের বেশি আমার কক্ষে অবস্থান করতে দেই না।  তাকে বললাম যে, একা একা সময় কাটানো আমার জন্যে দুরূহ হয়ে পড়ছে। সুতরাং পড়ার জন্যে বাসা থেকে সে যেন আমার জন্যে একটা বই নিয়ে আসে।

বইটির নাম ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’। লেখক অমিতাভ ঘোষ। বইটি আমাকে আমার প্রিয় এক অনুজ অফিসার  পড়ার জন্যে উপহার দিয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। কাজের চাপে বইটি পড়ার ফুরসৎ এতদিন আমার হয়নি। এখন আমার শরীর ও মস্তিষ্ক খুবই দুর্বল হওয়া স্বত্বেও বইটি পড়ার জন্যে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্যে। প্রথম কয়েক অনুচ্ছেদ একাধারে পড়তে কষ্ট হচ্ছিল ভীষণ। কিন্তু তারপর এক সময়ে পড়ার আনন্দের ভেতরে ঢুকে গেলাম।

অসাধারণ ঐটিহাসিক উপন্যাস। পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের। বিস্তৃত হয়েছে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত। মিয়ানমারের মিলিটারি জান্তার অত্যাচার অবিচারের বিষয় নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। বিশাল পটভূমির উপন্যাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে ব্রিটিশরা মিয়ানমার দখল করে নিয়ে রাজা ও তার পরিবারের সদস্যদেরকে হাজার হাজার মাইল দূরে ভারতের পশ্চিম উপকূলে রত্নাকিরি নামক বন্দরনগরীতে নির্বাসন দেয়। এই নির্বাসনের প্রাক্কালে মিয়ানমারে বসবাসরত রাজকুমার নামের ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক এতিম বালক সেই রাজপরিবারের ডলি নামের জনৈকা পরিচারিকার প্রেমে পড়ে যায়।

প্রায় তিন দশক পর সে নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর রত্নাকিরিতে আসে সেই মেয়ের খোঁজে।  রত্নগিরিতে রাজপরিবারের জীবন, কাঠ ব্যবসায়ী হিসেবে মিয়ানমারে রাজকুমারের সাফল্য, তিরিশ বছর পরে ডলির সাথে তার মিলন, মালয়েশিয়াতে তার রাবার বিজনেস, জাপান কর্তৃক মালয় ও মিয়ানমার আক্রমণ, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক পতন, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ভারতীয়দের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাব, চুয়াল্লিশের মনন্তর, সবকিছুই অসাধারণভাবে উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে ছাপা ৫৫০ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে পড়তেই আমার সপ্তাহখানেক লেগে গেল।

বইটি শেষ করার পরেরদিন অর্থাৎ ৮ অক্টোবর তারিখে আমি বাসায় ফিরলাম। সাথে প্রচুর ওষুধপত্র।  আমার  করোনা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আসলেও আমাকে আরো অন্তত পনেরদিন বাসায় কোয়ারেন্টাইনে পার করতে হবে। আমি ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিক শক্তি ফিরে পেতে লাগলাম। 

“এইসব সেরে গেলে আমি
ভোরবেলা হাঁটতে বেরোবো আগের মতো;
কালো পিচ রাস্তা 
শেষ রাতের বৃষ্টি মেখে শুয়ে থাকবে।
মোড়ের মাথার অশথ গাছটা থেকে
টুপটুপ জল পড়বে।” - সঞ্চয়িতা বিশ্বাস

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআরকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!