রমজানে অপচয়-অপব্যয় আর নয় 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

রমজানে অপচয়-অপব্যয় আর নয় 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:২১ ১৬ মে ২০২০  

‘এবং আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা: আরাফ, আয়াত: ৩১)

‘এবং আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা: আরাফ, আয়াত: ৩১)

অপচয় ও অপব্যয় মানুষের মন্দ স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে শব্দ দু’টো একই অর্থবোধক মনে হলেও আসলে তা নয়। অপচয় হচ্ছে বৈধকাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করা, যাকে আরবিতে ‘ইসরাফ’ বলে। আর অপব্যয় হচ্ছে অবৈধ কাজে ব্যয় করা যাকে আরবিতে ‘তাবযীর’ বলে।

শুধু রমজানে নয়; ইসলামে অপচয় ও অপব্যয় সবসময়ের জন্যই নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়ে বলেন,

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ 

‘এবং আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা: আরাফ, আয়াত: ৩১)

অপচয়ের মতো অপব্যয়কে নিষিদ্ধ করে কোরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে-

وَلاَ تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُواْ إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

‘আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা: বনী-ইসরাঈল, আয়াত: ২৬-২৭)।

অপরদিকে কোরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালার খাঁটি বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা ইরশাদ হয়েছে- 

وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا

‘এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপচয় করে না কার্পণ্যও করে না, বরং তারা আছে এতদুভয়ের মাঝে মধ্যম পন্থায়।’ (সূরা: ফুরকান, আয়াত: ৬৭)।

উপরোক্ত আয়াতগুলো সামনে রাখলে একথাই প্রতীয়মান হয়, ব্যয়ের ক্ষেত্রে কৃপণতা যেমন দোষণীয় তেমনি অপচয়-অপব্যয়ও দোষণীয়। সম্পদ কমে যাবে এ চিন্তায় নিঃস্ব ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা না করার জন্য কৃপণরা দোষী। আর অপচয়কারীরা দোষী এ কারণে যে, তারা নিজের অপ্রয়োজনে ব্যয় করছে, অথচ নিঃস্ব ও বিপদগ্রস্তদের প্রয়োজন মিটাতে সহায়তা করছে না।

মানুষের জীবনে কিছু কিছু সময় আছে যখন সঞ্চয় করা জরুরি। তখন সঞ্চয় না করে ব্যয় করা অপচয়। যেমন বিবাহ করা, স্ত্রীর মোহর দেয়া, সন্তানের ভরণ-পোষণ ও লেখাপড়ার খরচ নির্বাহ এবং নিজের বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করা আবশ্যক। তাই এসব জরুরি ব্যয় নির্বাহের জন্য সঞ্চয় না করে ব্যয় করা অপচয়। অনুরূপভাবে, রোগ, জরা, ব্যাধি, দুর্যোগ, দুর্বিপাক ইত্যাদি ধরনের আকস্মিক বিপদাপদের প্রতি লক্ষ্য রেখে কিছু সঞ্চয় করে রাখাও আবশ্যক। এসব দুর্বিপাকের কথা চিন্তা না করে ব্যয় করাও অপচয়। আবার সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ না করে অলসভাবে রেখে দেয়াও অপচয়।

মানুষ তখনই মানুষ হয়, যখন সে অন্য মানুষের দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি দেখায়, বিপদে-আপদে সহায়তা করে। কিন্তু কৃপণ, অপচয় ও অপব্যয়কারীরা তা করতে পারে না কিংবা করে না। তাদের হৃদয় মানুষের দুঃখে কাঁদে না, বরং তাদের দ্বারাই মানুষ কষ্ট পায়। আর এই কারণেই ইসলামে তা নিষিদ্ধ। কোরআন ও হাদিসে অপচয় ও অপব্যয়কে নিষিদ্ধ করা হলেও মানুষ এ থেকে বিরত থাকছে না। আর রমজান হচ্ছে সংযমের মাস। এ সংযমের মাসেও মানুষ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সংযমী হয় না! 

রমজান কি অপচয়-অপব্যয়ের আর কেনাকাটায় প্রতিযোগিতার জন্য আসে? অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ আর মাত্রাতিরিক্ত কেনাকাটার ভিড়ে ‘আল্লাহ যে প্রতি বছর ‘রিস্টার্ট’ বাটনে চাপ দিয়ে জীবনকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেন রমজানে’ সে কথাকে যেন ভুলতে বসেছে। এই মাসে স্পেশাল অফার হিসেবে দেয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল কদরকে। অথচ ইফতার পার্টি আর শপিংয়ের আড়ালে আবডালে কখন যে এই মহামূল্যবান সময়টি শেষ করে ফেলে, তা টেরই পায় না! অনেকে বলেন যে, রোজাদারদের ইফতার খাওয়ানোর ও ঈদের দিন ভালো কাপড় পরার কথা ইসলামেও বলা আছে। এজন্যই আমরা এসব করি। কিন্তু আমরা কি আমাদের এ ধরনের খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজেদেরই ধোঁকা দিচ্ছি না?

ইসলামে সিয়ামপালনকারীকে খাওয়ানোর ও ভালো পোশাক পরার যে সংজ্ঞা দেয়া আছে, তা কি আমরা মানি? নাকি শয়তান ভালো কাজের খোলসে করে আমাদের নিকট আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজগুলোকে শোভন করে দিচ্ছে?

ইফতার পার্টির নামে হাজার পদ রান্না করে যে শো ডাউনের আয়োজন করা হয়, তা কি আমাদের নবী করিম (সা.) এর সুন্নাতের মাঝে পড়ে? হাজার হাজার লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমরা যেসব ঈদের কাপড় কিনি, তা কি কখনো ইসলাম সমর্থন করতে পারে? নাকি করা সম্ভব? সামাজিক চাপে হোক অথবা লোক দেখনোর মানসিকতাতেই হোক, সত্যিকার অর্থে সংযমের মাসেই আমরা সবচেয়ে অসংযমী আচরণ করি।

রোজায় ইফতার-সেহরির মাধ্যমে মানব জাতিকে পরোপকারে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। উৎসাহিত করা হয়েছে নিঃস্বদের দানে। প্রকৃত রোজাদার নিজে ইফতার করবে, অন্যকেও করাবে। অসহায় দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটাবে। রমজানে বেশি খাবার খেলে আল্লাহ কোনো হিসাব নেবেন না, এ ধরনের একটা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম অতিভোজ কখনোই সমর্থন করে না। এমনও হয়েছে, ঘরে খাবার নেই, রাসূল (সা.) না খেয়ে থেকেছেন। তিনি যখন আহার করতেন, আহার শেষে তিনবার আঙুল চেটে খেতেন এবং বলতেন, তোমাদের খানার বাসন থেকে কিছু পড়ে গেলে উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে নাও, তা শয়তানের জন্য ছেড়ে দিও না। (আবু দাউদ-৩৮৪৫)।

অথচ বর্তমানে খাবারের অপচয় রমজানে রীতিমত যেন ফ্যাশন। রেস্তোরাঁ থেকে বস্তা বস্তা খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে, এমন ছবিও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। কত মানুষ এই শহরে অভুক্ত থাকে। পেট ভরে খেতে পারে না। শহরবাসীর মধ্যে রোজার দিনে ইফতার আয়োজনে আড়ম্বর করতে দিনভর প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়। যদিও এসব আয়োজনে দরিদ্র রোজাদারদের অংশগ্রহণ একেবারেই কম থাকে। দেশের আলেমরা ইফতারকে কেন্দ্র করে এই ধরনের প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, ইসলামে ইফতারের অনেক মর্যাদা রয়েছে। তাই আয়োজনের চেয়ে তাকওয়া অর্জনের দিকেই রোজাদারকে মনোযোগী হতে হবে।

এজন্য সবার উচিত, অপচয়-অপব্যয় না করা। ইসলাম ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থাকে গ্রহণ করেছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যমন্থা অবলম্বন করা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।’ অপর এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে সে কখনো দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত হয় না।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে