ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

মদ্যপ থেকে আল্লাহর ওলী (পর্ব-১)

মাওলানা ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ২২:১০, ২৯ জুলাই ২০১৯
মদ্যপ থেকে আল্লাহর ওলী (পর্ব-১)
ফাইল ফটো

এ লেখাটি একজন প্রসিদ্ধ ইমাম, ফকীহ, মুহাদ্দিস, সূফী, মুজাহিদ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-কে নিয়ে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) উম্মতদের ও বুযুর্গদের একজন, যাদের নাম আসলেই মনের মাঝে বিশ্বাস ও ভালোবাসার ফোয়ারা অনুভূত হতে থাকে। 

তিনি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম সম্ভবত দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে হয়েছিল। বলা হয় তিনি ওই যুগের বুযুর্গ যখন সবেমাত্র রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দুনিয়া থেকে বিদায়ের শত বছর পার হয়েছিল।

আরো পড়ুন>>> ইসলাম পরিপন্থী ১০ বিষয় থেকে সতর্ক থাকা জরুরি

সিহাহ সিত্তাহ নামে হাদিস শরীফের যে ছয়টি প্রসিদ্ধ কিতাব, বুখারী শরীফ থেকে ইবনে মাজা পর্যন্ত। তিনি তাদেরও পূর্বেকার এবং সবার মুরব্বি ছিলেন। তিনি ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর সম-সাময়িক ছিলেন এবং তার ছাত্র ছিলেন। তিনি ওই যুগের বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যখন ইসলামী জগত ওইসব বড় বড় ইলমী ব্যক্তিত্বদের জাঁকজমকে আলোকিত ছিল।

ওই যুগের যেকোনো অংশেই দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এ জাতীয় নজীরবিহীন ব্যক্তিত্বগণ বিদ্যমান আছেন। আর এই আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক খোরাসানের মারো শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরে ইরাকে গিয়ে বাগদাদ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

তার সংশোধনের আশ্চর্যজনক ও বিরল ঘটনা:
তার অবস্থাও বড়ই বিস্ময়কর ও বিরল ছিল। এসব বুযুর্গদের আলোচনায় বড়ই নূর ও বরকত বিদ্যমান। তাদের প্রতিটি ঘটনার মাঝে এই বৈশিষ্ট্য ছিল যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের বরকতে হৃদয়রাজ্য পাল্টিযে দিতেন। হজরত শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ‘বুসতানুল মুহাদ্দিসীন’ গ্রন্থে তার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তার একটি বিশাল সেব ফলের বাগান ছিল। যেভাবে বড় আমীর লোকেরা স্বাধীনচেতা হয় তেমনি তিনিও ছিলেন স্বাধীনচেতা। ইলমের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, দ্বীনের সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক ছিল না। পানীয় পানকারী সেবক ও গায়ক বেষ্টিত ছিলেন। একবার যখন সেব ফলের মৌসুম এলো, তখন নিজের স্ত্রী সন্তানাদি নিয়ে তার বাগানে স্থানান্তরিত হয়ে গেলেন। যেন সেব ফলও খেতে পারেন এবং শহরের বাইরে ভ্রমণের সুযোগ হয়। সেজন্য সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে গেলেন। বন্ধু-বান্ধবের জমায়েতেও প্রশস্থ ছিল। সেখানে তাদের আহ্বান করা হলো। রাতে বাগানের মাঝে গান-বাজনার আসর জমানো হলো। সে আসরে পানীয় পান করানো হলো পালাক্রমে। তিনি নিজে সঙ্গীত যন্ত্রের ফিতা বাজানোতে বড়ই প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং একজন শীর্ষস্থানীয় সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। একদিকে পানীয় পানের পালা চলছে এবং তার নেশা এবং অন্য দিকে সঙ্গীতের সূর। মূর্ছনায় মত্ত নেশার জগতে তার ঘুম এসে গেল। তিনি তখন বাদ্য যন্ত্র ধরাবস্থায় ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে ছিলেন। যখন চোখ খুলল, তখন দেখলেন যে, সে বাদ্যযন্ত্র কোলে রাখা। ওঠে ফের তা বাজাতে শুরু করলেন। আশ্চর্য সে যন্ত্র আর বাজছে না। তার মধ্য থেকে কোনো শব্দই বেরুচ্ছে না। যেহেতু তিনি নিজেই তা মেরামত করা এবং ঠিক করায় অভিজ্ঞ ছিলেন। এজন্য তা ঠিকঠাক ও মেরামত করলেন। এরপর আবার তা বাজাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তা বাজছে না। আবার দ্বিতীয়বার তার ইত্যাদি ঠিক করলেন এবং বাজাতে চেষ্টা করলেন। তখন তদস্থলে সঙ্গীতের আওয়াজের পরিবর্তে কোরআনের একটি আয়াতের আওয়াজ বেরিয়ে এল।

এক বর্ণনায় আছে যে, এই আওয়াজ ওই বাদ্যযন্ত্র থেকেই আসছিল। অপর এক বর্ণনায় আছে, যেখানে তিনি বসা ছিলেন তার পাশে বৃক্ষ ডালে একটি পাখি বসা ছিল। সেই পাখিটির মুখ থেকে এই আওয়াজ আসছিল। যাই হোক, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এটি একটি মজার গায়েবী বিষয় ছিল। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মেহেরবাণীর ব্যবস্থা গৃহীত ছিল। যখন এ আওয়াজ তিনি শুনলেন, তখন তার মনে আঘাত লাগল এবং খেয়াল এল যে, এখন পর্যন্ত আমি নিজের জীবনকে কী কাজের মাঝে অতিবাহিত করেছি। তৎক্ষণাৎ জবাবে বললেন, ‘হে প্রতিপালক! এখন সে সময় এসে গেছে।’ এখন আমি আমার সব ধান্ধা এবং ব্যস্ততা ত্যাগ করছি এবং আপনার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। তাই এইসব ধান্ধা ছেড়ে আপাদমস্তক দ্বীনের দিকে মনোযোগী হয়েছি। কে জানত যে ব্যক্তি রাতের বেলায় বাদ্যযন্ত্রের মাহফিলের আসর জমিয়ে পানীয় পানে লিপ্ত ছিল। কোত্থেকে এই পরিবর্তন এলো যে, তিনি যুগের অন্যতম বুযুর্গ হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। (বুসতানুল মুহাদ্দিসীন পৃ. ১৫৫)।

ইলমে হাদিসে তার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান:
আল্লাহ তায়ালা ইলমে হাদিসে তাকে অত্যন্ত উঁচু স্থান দান করেছেন। ইলমে হাদিসে অনেক বড় বড় ওলামাদের সমালোচনা করা হয়েছে। ইমাম বুখারী (রহ.)-ও সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারেননি। ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-ও বাঁচতে পারেননি। বড় বড় ইমামগণ সমালোচকদের থেকে বাঁচতে পারেননি; কিন্তু এমন কোনো নেই যে,  সে ব্যক্তি হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) এর বর্ণনা এবং হাদিসের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছেন। তিনি এত উঁচু স্তরের মুহাদ্দিস ছিলেন।

দুনিয়ার প্রতি তার অনাসক্তি ও আঁচল গোটানো:
তার দুনিয়া থেকে নিজেকে এমনভাবে পাশ কাটিয়েছেন এবং এমন দুনিয়া ত্যাগী হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন যে, তার অবস্থা সম্পর্কে লেখা হয়েছে যে, অভিজাত বংশের সরদার এবং প্রধান বড় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। এজন্য অবস্থা পরিবর্তনের পরেও একেক সময় তার দস্তরখানে দশ পনের প্রকারের খানা থাকত এবং খাবারের সময় বড় একটি আসর জমত, গোটা আসরে সবাই খানায় লিপ্ত হত। কিন্তু তিনি নিজে রোজা রাখতেন এবং লোকদের ডেকে ডেকে খাবারের দাওয়াত দিতেন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন।

হাদিসে রাসূলের (সা.) ব্যস্ততা:
খোরাসানের মরো শহরে যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সেখানে তার যে বাড়িটি ছিল। সে বিষয়ে লিখেন যে, ওই বাড়ির বারান্দাটি ৫০ গজ লম্বা, ২৫ গজ চওড়া ছিল। বারান্দার গোটা আঙিনা প্রয়োজন প্রার্থীদের পদচারনায় মুখর থাকত। কেউ মাসআলা জিজ্ঞেস করতে আসত। কেউ ইলম অর্জনের জন্য আসত, কেউ স্বীয় ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আসত। পরে যখন বাগাদদে গিয়ে অবস্থান করলেন সেখানে ছোট একটি গৃহ কিনে এবং তাতে অপরিচিত জীবন অতিবাহিত করতে লাগলেন। 

এখানে আপনার অন্তরে কেমন লাগে?
জবাবে তিনি বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! এখানে আমার অন্তরে বড়ই ভালো লাগে। এজন্য যে, আগে আমার কাছে বহু লোক আসত, এখন আমি একাকীত্বের জীবন অতিবাহিত করছি। তাই মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে নেই। তারপর ঘরে চলে যাই এবং আমি সেখানে থাকি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থাকেন। অর্থাৎ ঘরে দিন-রাত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে ব্যস্ত থাকি। এই যিন্দেগীই আমি অধিক পছন্দ করি। (তারিখে বাগদাদ, ১০:১৫৪)।

মানুষের অন্তরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও ভালবাসা:
বাগদাদের একটি শহরের নাম রোক্কা ছিল। যা বর্তমানে বাগদাদের একটি মহল্লাহ হিসেবে গণ্য। হারুনুর রশীদের খেলাফতের যমানা ছিল। একবার খলীফা হারুনুর রশীদ এই শহরে তার স্ত্রীর সঙ্গে শাহী টাওয়ারে বসা ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন যে, শহরের বাউন্ডারির বাইরে এক আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে। হারুনুর রশীদের ধারণা হলো, হয়ত কোনো শত্রু শহরে হামলা করেছে অথবা কোনো প্রতিপক্ষ আক্রমণ করেছে। বিষয়টি জানার জন্য মানুষ তৎক্ষণাৎ দৌড়ে গেল। পরে জানা গেল যে, হজরত আবদুল্লাহ উবনুল মুবারক রোক্কা শহরে শুভাগমন করেছেন। আর মানুষেরা তাকে স্বাগতম জানাতে দলে দলে শহরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। এটি তারই ধ্বনি।

হজরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) বলেন যে, স্বাগতম জানানোর সময় হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) এর হাঁচি এসে গিয়েছিল এবং এরপর তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেন এবং তার জবাবে গোটা সমাবেশ ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলেছিল। এ কারণেই আওয়াজ উচ্চ হয়েছিল। যখন হারুনুর রশীদের স্ত্রী এ অবস্থা দেখলেন, তখন হারুনুর রশীদকে বললেন, হে হারুন! তুমি মনে করছ যে, তুমি বড় বাদশাহ হয়েছ। অর্ধজাহান তোমার শাসনে চলছে, কিন্তু সত্যকথা হলো এই যে, বাদশাহী তো তাদের হক। বাস্তবে তো তারাই বাদশাহ, যারা মানুষের মনের ওপর রাজত্ব করছে। কোনো পুলিশ তাদের হাঁকিয়ে আনেনি; বরং এটি শুধু আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের প্রতি তাদের ভালোবাসা। যেটি সবাইকে এখানে সমবেত করে দিয়েছে। এ অবস্থান আল্লাহ তায়ালা তাকে দান করে দিয়েছিলেন। (তারীখে বাদগাদ, খণ্ড ১ পৃ. ১৫৬)।

তার বদান্যতার বিস্ময়কর ঘটনা:
আল্লাহ তায়ালা সম্পদ ও দুনিয়ার নেয়ামত তো তাকে অনেক দিয়েছেন। কথা হলো যে, দুনিয়াতো দিয়েছেন কিন্তু দুনিয়ার ভালোবাসা থেকে মুক্ত রেখেছেন। প্রবাদ আছে যে, ‘দুনিয়া থাকবে তাদের হাতে অন্তরে নয়।’ এ অবস্থাটা আল্লাহ তায়ালা তাকে এ পরিমাণ দান করেছিলেন যে, তা দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুস্কর। খোরাসানে অবস্থান কালে একবার তিনি হজে যাওয়ার ইচ্ছা করলেন। যখন বসতির লোকেরা জানতে পারল যে, তিনি হজে যাচ্ছেন; তখন বসতির লোকদের এক প্রতিনিধি দল তার কাছে এসে আরজ করল যে, হজরত আমরাও আপনার সঙ্গে হজে যাব, যেন হজের সময় আপনার সাহচর্য সহজ হয়। তিনি বললেন, আচ্ছা যদি তোমরা আমার সঙ্গে যেতে চাও তাহলে চল। অবশ্য তোমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ সফরের খরচের টাকা আমার কাছে জমা করে দাও। যেন আমি তোমাদের পক্ষ থেকে একত্রে খরচ করতে পারি।

সুতরাং যত লোক হজে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল তারা সবাই নিজ নিজ খরচের টাকার থলি এনে হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের কাছে জমা দিয়ে দিল। তিনি তাদের সবার থলি নিয়ে একটি সিন্দুকে রেখে দিলেন এবং তারপরই সফরে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তাই সব সাথীদের পরিবহন এবং খানার ব্যবস্থা ইত্যাদি করতে থাকলেন। এমনকি হজ সমাপ্ত হওয়ার পর তাদের সবাইকে নিয়ে মদীনায় তাইয়্যেবায় গেলেন এবং সেখানে গিয়ে তাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন যে ভাই! তোমাদের গৃহবাসী মদীনা থেকে কিছু নিতে বলেছেন কী? তাই তাদের প্রত্যেককে বাজারে নিয়ে গিয়ে ওই জিনিসপত্র কিনে দিলেন। আবার মক্কা শরীফে গেলেন। সেখানে এসেও সবাইকে বললেন, তোমাদের গৃহবাসীরা মক্কা থেকে কোনো কিছু নিতে বলেছেন কী? তারা জবাব দিল, অমুক অমুক জিনিস চেয়েছিল, সুতরাং তাদের সবাইকে বাজারে নিয়ে গিয়ে ওইসব জিনিস কিনে দিলেন। তারপর সফর শেষে খোরাসানে ফিরে এলেন । সেখানে পৌঁছে সবাইকে আলীশান আপ্যায়ন করালেন। আর এই দাওয়াতে প্রত্যেককে উপহারও পেশ করলেন। তারপর ওই সিন্দুক খুললেন, যাতে যাবার সময় প্রত্যেকের টাকা পয়সার থলে রাখা ছিল। প্রত্যেককে ওই থলি ফিরত দিলেন। এভাবে তিনি তার বদান্যতার সমুদ্র বয়ে দিলেন। (সিয়ারে আলামীন নুবালা ৮ খণ্ড, পৃ.৩৮৫)। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!