মতবিরোধ ও ইসলাম

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭,   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

মতবিরোধ ও ইসলাম

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৪০ ২৮ মার্চ ২০২০  

মতবিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক, পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা কখনো কাম্য নয়।

মতবিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক, পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা কখনো কাম্য নয়।

কোনো একটা বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হওয়া খারাপ কিছু নয়। ইসলাম এটাকে সমর্থন করে। হাদিস ও ইসলামের ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির আছে। স্বয়ং নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের মতবিরোধ হতো। হজরত ওমর (রা.) কয়েকটি বিষয়ে রাসূল (সা.) এর বিরোধিতা করেছেন। তবে মতবিরোধ সমর্থনযোগ্য তখনি যদি তা শত্রুতায় রূপ না নেয়।

বিরোধিতার কারণে সম্পর্ক নষ্ট হলে তা নিন্দনীয় বিষয়ে পরিণত হয়। আল্লাহ তায়ালা নিজেই তা নিষেধ করেছেন। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পরস্পর বিবাদ করবে না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে।’ (সূরা : আনফাল, আয়াত : ৪৬)। অর্থাৎ মতবিরোধের কারণে যখন সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন তা বিবাদে পরিণত হয়। যা নিন্দনীয়।

মতবিরোধ সীমার তর হলে নিন্দনীয় নয় এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত তোলে ধরা হলো :

রাসূল (সা.) মদিনায় আসার পর মুশরিক সম্প্রদায় মদিনার ওপর কয়েকবার হামলা করে। সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ ছিলো চতুর্থ হিজরিতে খন্দকের যুদ্ধে। মদিনায় আসার পর সেখানকার অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের সঙ্গে রাসূল (সা.) কয়েকটি বিষয়ে চূক্তি করেছিলেন। অন্যতম একটি ছিলো মদিনা রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সবাই এর রক্ষার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু মদিনার ইহুদী সম্প্রদায় এ যুদ্ধে চুক্তি রক্ষা করেনি। বরং শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুসলমানদেরকে শেষ করে দেয়ার পায়তারা চালায়। এতে মুসলমানদের দুর্গতি বেড়ে যায়। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার রহমত হয়। মক্কার বাহিনী রাতের আধারে পালিয়ে যায়। মদিনার ইহুদীরা তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। রাসূল (সা.) যুদ্ধ শেষ করে পোশাক রাখছিলেন। তখন হজরত জিবরাইল (আ.) এসে বলেন, আপনি পোশাক খোলে ফেলছেন? আমরা তো এখন পর্যন্ত খোলিনি। বনু কুরাইজার ইহুদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাসূল (সা.) দ্রুত ঘোষণা করে দিলেন, সবাই যেন বনু কুরাইজায় পৌঁছে আসরের নামাজ আদায় করে। রাস্তায় আসরের নামাজের ওয়াক্ত চলে আসে। আসরের নামাজ আদায় নিয়ে সাহাবাদের মাঝে মতবিরোধ হয়। এক দলের দাবি হলো, রাসূল (সা.) আসরের নামাজ বনু কুরাইজায় পৌঁছে আদায় করতে বলেছেন। অতএব, রাস্তায় আসরের নামাজ কোনোভাবেই আদায় করা যাবে না। আরেক দলের দাবি ছিলো, রাসূল (সা.) এর কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে বনু কুরাইজায় দ্রুত পৌঁছা। যেন আসরের আগেই গিয়ে পৌঁছা যায়। রাস্তায় আসরের ওয়াক্ত চলে এলেও আসরের নামাজ আদায় করা যাবে না এই উদ্দেশ্য নয়। তখন একদল রাস্তায় আসরের নামাজ আদায় করে নেয়। অন্যরা বনু কুরাইজায় গিয়ে আসরের নামাজ আদায় করে। রাসূল (সা.) ঘটনা শুনে কারো প্রতি তিনি তিরস্কার করেননি। মতবিরোধের কারণে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে বলে কোথাও পাওয়া যায়নি। মাজহাবের ইমামদের মাঝে মাসআলাগত বিষয় নিয়ে মতবিরোধ সবার জানা। কিন্তু তাদের মাঝে সুসম্পর্কের কোনো কমতি ছিলো না। সম্মান প্রদর্শনের জন্য অনেকে নিজের মতকে ছেড়ে অন্য মাজহাব অনুযায়ী আমল করেছেন। এ ব্যাপারে কয়েকটি নজির আপনাদের সামনে পেশ করছি।

মদিনাবাসীর মাজহাব ছিলো কোনো ইমাম নিজের ওজুহীনতার কথা ভুলে গিয়ে নামাজ পড়িয়ে ফেললে, শুধু ইমামের নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে। মুক্তাদিদের ওই নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে না। আবু হানিফা (রাহ.) এর মতে মুক্তাদিদের নামাজও পুনরায় আদায় করতে হবে। ওই সময়ের খলিফা ইমাম আবু ইউসুফ (রাহ.)-কে জুমার ইমামতির জন্য নির্বাচিত করেন। তিনি মুসল্লিদের নিয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন। কিন্তু তার ওজু ছিলো না। ইমাম আবু ইউসুফ ছিলেন ইমাম আবু হানিফার অনুসারী। তাই তার কর্তব্য সবাইকে নিয়ে নামাজ পুনরায় পড়া। কিন্তু শুধু আবু ইউসুফ (রা.) নামাজ পুনরায় আদায় করলেন। মুসল্লিদেরকে নামাজ আদায় করতে বলেননি। তখন অনেকে আবু ইউসুফ (রা.) এর ওপর প্রশ্ন উত্থাপন করলে তিনি বলেন, কোনো কোনো বিষয় আমাদের জন্য জটিল হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে আমরা আমাদের মদিনাবাসী ভাইদের কথাকে গ্রহণ করি। (আদাবুল ইখতেলাফ)।

ইমাম আবু ইউসুফ (রা.) এর আরেকটি ঘটনা। বাদশাহ হারুনুর রশীদ সিংগা লাগালেন। সিংগা লাগালে রক্ত বের হয়। তাই হানাফি মাজহাব মতে ওজু ভেঙ্গে যায়। তাই বাদশাহ, ইমাম মালেক (রাহ.) এর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলেন। ইমাম মালেক (রাহ.) এর ইজতিহাদ অনুযায়ী সিংগা লাগালে ওজু ভাঙ্গে না। তাই তিনি সে অনুযায়ী ফতোয়া দিলেন। বাদশাহ নামাজের ইমামতি করেন। তার পেছনে নামাজ আদায় করেন ইমাম আবু ইউসুফ (রাহ.)। ইমাম আবু ইউসুফ (রাহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি ওজুহীন একজন ব্যক্তির পেছনে কিভাবে নামাজ আদায় করলেন? ইমাম আবু ইউসুফ (রাহ.) আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সুবাহানাল্লাহ! পড়া আরম্ভ করলেন। আর বলতে লাগলেন, আরে এটা তো সামান্য একটা বিষয়। এই সামান্য কারণে মুসলিম খলিফার পেছনে নামাজ আদায় ছেড়ে দেয়া ভ্রান্ত মুতাজিলাদের কাজ।’ (আদাবুল ইখতিলাফ-৮৬)। এখানে শুধু নামাজ আদায় জায়েজ হওয়ার বিষয়টি দেখলে ভুল হবে। এখানে মূল বিষয় হচ্ছে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা। ব্যক্তির প্রতি মহব্বত থেকেই তার মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। সব ইমামদের মাঝে উক্ত গুণটি বিদ্যমাণ ছিলো। তাই যখন সম্ভব হয়েছে তারা তা প্রদর্শন করেছেন। নিম্নে আরো কিছু ঘটনা পেশ করছি।

ইমাম আবু হানিফার সঙ্গে মতবিরোধ সবচেয়ে বেশি করেছেন ইমাম শাফী (রহ.)। কোনো কোনো মাসআলায় ইমাম শাফী (রাহ.) যে বিষয়টিকে ফরজ বলেছেন, ওই বিষয়েই ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) মত ছিলো নাজায়েজ। ইমাম শাফী (রাহ.) এর জন্মের আগেই ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর যুগ শেষ। এত বিরোধ থাকা সত্তেও ইমাম শাফী (রাহ.) আবু হানিফা (রাহ.) এর প্রতি কেমন শ্রদ্ধাবোধ দেখাতেন তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়। ইমাম শাফী (রাহ.) স্বীয় শাগরিদদেরকে নির্দেশনা দিয়ে বলতেন, ‘ফকীহ হতে চাইলে আবু হানিফার শাগরিদদের কাছে যাও। কারণ, কোরআন ও হাদিসের মর্ম আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! আমি ইমাম আবু হানিফার শাগরিদ মুহাম্মাদ এর কিতাব পড়েই এত বড় ফকীহ হয়েছি।’ (মুকাদ্দামাতুর দুর্রিল মুখতার-১২৫)।

ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে শাফী (রহ.) এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি হচ্ছে, ‘ফিকহের ক্ষেত্রে অন্যরা ইমাম আবু হানিফার পরিবারের সদস্য।’ এ উক্তি দ্বারা বুঝা যায়, মতবিরোধ থাকা সত্তেও তাদের মাঝে মহব্বত ও সম্পর্ক ছিলো তুলনাহীন। ইমাম আওজায়ী (রহ.) শামের বড় আলেম ছিলেন। তার সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়। তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সম্পর্কে খারাপ ধারণা রাখতেন। ইমাম আবু হানিফার এক শাগরিদ ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক। তিনি একবার আওযায়ীর দরবারে গেলে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আবু হানিফা নামে এই বেদাতী কে? আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক তখন কোনো উত্তর না দিয়ে ফিরে আসেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর কিছু রচনা নিয়ে আবার সেখানে যান। রচনাগুলো পড়ে আওযায়ী (রহ.) মুগ্ধ হন। তারপর মক্কায় ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) এর সঙ্গে সাক্ষাত হলে বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে বুঝে নেন। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক জিজ্ঞেস করেন, আপনি তাকে কেমন পেলেন? উত্তরে আওযায়ী (রাহ.) বলেন, তিনি অনেক বড় আলেম! এত দিন তার সম্পর্কে যা জেনেছি সব ভুল।’ (শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা প্রণীত আদাবুল ইখতেলাফ)। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় কখনো কখনো মানুষকে ভুল বুঝা হয় ব্যক্তি সম্পর্কে না জানার কারণে।

মতবিরোধের চেয়ে দ্বীনি ও আত্মীয়তার সম্পর্কে গুরুত্ব দেন :

মতবিরোধ হলেও গুরুত্ব দিতে হবে সম্পর্ককে। হতে পারে তা আত্মীয়তার সম্পর্ক বা দ্বীনি সম্পর্ক। ইসলামের ইতিহাসের একটি ঘটনা এ ব্যাপারে খুবই প্রসিদ্ধ। ইসলামের সূচনালগ্নে মুসলমানরা মুশরিকদের দ্বারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। রাসূল (সা.) সাহাবায়ে কেরামের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে দেশ ছেড়ে হিজরত করার অনুমতি দেন। মুসলমানরা জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে হাবশায় হিজরত করেন। বর্তমানে সোমালিয়া ও তার আশপাশের অঞ্চলটিই ওই সময়ের হাবশা। হাবশার বাদশাহ মুসলমানদের খুব আদর-আপ্যায়ন করেন। এবং থাকার জন্য সুব্যবস্থা করে দেন। মক্কার মুশরিকদের এটা সহ্য হয়নি। তারা আমর ইবনে আস ও ইবনে আবি রাবিয়াকে হাবশায় পাঠান। উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। প্রথম দিন বাদশাহর দরবারে তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। হজরত জাফর ইবনে আবি তালেবের জ্বালাময়ী ভাষণে, বাদশাহ মুসলমাদের পক্ষে আরো দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়ায়। তাই আমর ইবনে আস তার সঙ্গী ইবনে আবি রাবিয়াকে বলে, আগামীকাল বাদশার সামনে ওদের বিভিন্ন দোষ প্রকাশ করে দেব। যেন বাদশাহ নিজ উদ্যোগেই তাদেরকে ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ইবনে আবি রাবিয়া ছিলো আবু জাহেলের বৈপিত্রেয় ভাই। সেই দিক থেকে কুরাইশ বংশের এ সব মুসলমানদের সঙ্গে তার এক ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো। তাই সে আমর ইবনে আসকে বুঝালেন, তুমি তাদের ব্যাপারে এমন কোনো পদক্ষেপ নিয়ো না। কারণ, তাদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। যদিও তারা আমাদের বিরোধিতা করে’ (মুসনাদে আহমদ-১৭৪০)।

দেখার বিষয় হচ্ছে, মক্কাবাসী যাদেরকে দেশ-জাতির শত্রু মনে করে ভিন দেশ থেকে এনে বিচারের ব্যবস্থা করছে, সেই মক্কারই একজন বিবেদকে দূরে ঠেলে আত্মীয়তার সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে। সে আদর্শ যদি আমরা স্থাপন করতে পারি তাহলে সমাজের অবস্থা পাল্টে যাবে। মানুষের মাঝে ফিরে আসবে সৌহার্দ আর ভালোবাসা। মনে রাখতে হবে একজন মানুষ বিপরীত মত দিতে পারেই। এটা তার হক। ব্যক্তি স্বাধীনতা। তাই মতবিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক, পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা কখনো কাম্য নয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে