বদভ্যাস থেকে আশ্রয় প্রার্থনা হোক নিয়মিত

ঢাকা, রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৫ ১৪২৬,   ০৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

বদভ্যাস থেকে আশ্রয় প্রার্থনা হোক নিয়মিত

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৯ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মানুষ অভ্যাসের দাস। এ জন্য সব অভ্যাসের সামনে নিজকে দাসের মতো সপে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। অভ্যাসের তালিকায় কিছু বদভ্যাস থাকে। যেগুলো মানুষের মাঝে বাসা বাঁধার কারণে মেধা ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে বিঘ্নতা সৃষ্টি হয়। জীবনে সফল হওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোকে আস্তে আস্তে জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয় নিজের জীবন ওপর। তখন সফলতা এসে ধরা দেয়।

অভ্যাস হলো, কোনো বিষয়ে দীর্ঘ দিন চলার দ্বারা মানুষের নীতিগত বিষয়ে যা পরিণত হয়। না চাইলেও তার দ্বারা উক্ত বিষয় সংঘটিত হয়ে যায়। মানুষ মায়ের পেট থেকে অভ্যাস নিয়ে দুনিয়াতে আসে না। মূলত পরিবেশ, প্রতিবেশীর দ্বারা বিভিন্ন অভ্যাস মানুষের ওপর ভর করে। যেমন একটি পরিবারের লোকেরা নিয়মিত সকালে ঘুমায়। যে শিশু জন্মের পর থেকেই ওই পরিবেশে বেড়ে ওঠবে, সে না চাইলেও তার মাঝে এই অভ্যাস চলে আসবে।

কোনো কাজ দীর্ঘ দিন করার দ্বারা যেমন তা অভ্যাসে পরিণত হয়। তেমনি ওই অভ্যাস দূর করার প্রয়োজন হলে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে অধ্যবসায় মেহনত চালিয়ে যেতে হয়। আমরা চাইলেই কোনো অভ্যাসকে একদিনে ধুয়ে পাক-সাফ করতে পারবো না। এ ব্যাপারে নবী করিম (সা.) খুবই সুন্দর একটি কথা বলেছেন, একবার নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো সর্বোত্তম কাজ কোনটি? রাসূল (সা.) বলেন, সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমানে কম হয়।’ (সহিহ বোখারী- ৬০৯৯)। তাই ভালো কোনো অভ্যাস নিজের ভেতর আনতে হলে যেমন নিয়মিত চর্চা করতে হবে তেমনি ত্যাগ করার ক্ষেত্রেও আস্তে আস্তে ছাড়ার অভ্যাস করতে হবে।

কোরআন ও হাদিসে অনেক বিষয়ের দোয়া বর্ণিত হয়েছে। বর্ণিত দোয়াগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো কোনো দোয়াতে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ, আধ্যাত্মিক ও আর্থিক উন্নতি কামণা করা হয়েছে। নেয়ামত থেকে বিরত না করা বরং অব্যাহত নেয়ামত জারি রেখে সুখময় জিন্দেগী নসিবের প্রার্থনার আলোচনা এসেছে কোনো কোনো দোয়াতে। হাদিস গ্রন্থ সমূহে দোয়ার অধ্যায়গুলোতে ‘বাবুল ইস্তিআযা’ নামক শিরোনামে অনেক দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলায় ‘ইস্তিআযা’ অর্থ দাঁড়ায়ে আশ্রয় প্রার্থনা। উক্ত শিরোনামে ওই সব দোয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো দ্বারা আল্লাহর দরবারে বিভিন্ন বিষয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। এর অধিকাংশ হচ্ছে বিভিন্ন বদাভ্যাস। 

রাসূল (সা.) ছিলেন সব ভালো গুণের আধার। বদভ্যাস, খারাপ গুণ তার কাছেও আসতে পারতো না। তারপরও তিনি বিভিন্ন বদাভ্যাস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামণা করেছেন উম্মতকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। উম্মতের মাঝে যেন বদভ্যাস বাসা বেধে তাদেরকে ধ্বংস করতে না পারে সে জন্যই দোয়ার মাঝেই বদভ্যাস থেকে আশ্রয়ের শিক্ষা দেয়া। তাই আমাদের কর্তব্য হলো বদভ্যাসগুলো জানা। সে অনুযায়ী নিজের জীবনকে গঠন করা।

অলসতা সব বদভ্যাসের মূল: মানুষের বহু বদভ্যাস আছে। এর মূলে যা ভূমিকা রাখে তা হচ্ছে অলসতা। মূলত অলসতার কারণেই একে একে সব বদভ্যাস এসে বাসা বাধে। অলসতা ঝেড়ে ফেলে দিলে কোনো বদভ্যাসেই মানুষের মাঝে থাকা সম্ভব নয়। ইসলামে অনেক খারাপি বর্ণনা করা হয়েছে অলসতা ও অলস ব্যক্তিদের নিয়ে। বলা হয়েছে মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য হলো নামাজে অলসতা করা। আল কোরআনের ভাষ্য ‘আর যখন তারা নামাজে দাঁড়ায়, দাঁড়ায় অলসতা নিয়ে লোক দেখানোর জন্য। নামাজে তারা আল্লাহর স্মরণ সামান্যই করে। (সূরা: নিসা-১৪২)।

সহিহ বোখারীতে হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেন রাতে শয়তান মানুষের ঘাড়ে তিনটি গিট দেয়। এবং বলতে থাকে এখনো রাত অনেক বাকি, তুমি ঘুমাতে থাকো। কিন্তু বান্দা যখন ওঠে দাঁড়িয়ে যায় তখন একটি গিট খোলে যায়। ওজু করার সময় আরেকটি আর শেষেরটি নামাজ আদায়ের দ্বারা খোলে যায়। বান্দার সকাল হয় তখন কর্ম চাঞ্চল্যতা নিয়ে। অন্যথায় অলস ও খারাপ মন নিয়ে সকাল করে। (সহিহ বোখারী)। এই বদভ্যাসের ভয়াবহতার কারণে রাসূল (সা.) আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। 
হজরত আয়শা (রা.) এর সূত্রে বর্ণত, নবী করিম (সা.) দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই অলসতা থেকে। আশ্রয় চাই বার্ধক্য, ঋণের চাপ এবং প্রত্যেক গোনাহ থেকে। (সহিহ বোখারী ও মুসলিম)। হজরত আনাস (রা.) এর সূত্রে আরেক বর্ণনাও অলসতা থেকে আশ্রয়ের কথা এসেছে। অলস মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো, সে কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজ হয়। মালিক যখন সামনে থাকে খুব কাজ করে। কিন্তু চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে আলসেমি শুরু করে।

সব ক্ষেত্রে মতবিরোধ রাখা: মতানৈক্য করা অনেক মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। বড় কেউ বা দায়িত্বশীল কোনো বিষয় সামনে পেশ করলেই চিন্তাভাবনা না করে মতানৈক্য শুরু করাও মানুষের বদভ্যাস। দু’জন বা ততোধিক মানুষ কাজ শুরুর পর, তাদের মাঝে কেউ যখন কথায় কথায় মতানৈক্য করে তখন ঐক্যে ফাটল ধরা শুরু করে। এতে বহু মহৎ কাজও মুখ থুবড়ে পড়ে। তাই মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদিও বিরোধী মতের অনেক ফায়দা আছে। তবে অনর্থক হলে অন্যরা বিরক্ত হয়ে চলে যেতে পারে। রাসূল (সা.) এই অভ্যাস থেকেও আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে সুনানে নাসায়ী ও আবু দাউদে সামনের হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই মাত্রাতিরিক্ত মতানৈক্যতা থেকে। আরো আশ্রয় চাই নেফাক ও খারাপ আখলাক থেকে।’

মুনাফিকের সব আলামত বদভ্যাসের অন্তর্ভূক্ত: রাসূল (সা.) বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত চারটি। মিথ্যা কথা বলা, কথা বলার সময় গালি দেয়া, আমানতের খেয়ানত করা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করা।’ এগুলো মানুষের অভ্যাসে পরিণত হলে দ্বীনদারিতে সমস্যা। এগুলো প্রত্যেকটি কবিরা গোনাহ। অভ্যাসে পরিণত হওয়ার কারণে সে এগুলোকে গোনাহই মনে করে না। এতে আস্তে আস্তে বেঈমানির দিকে চলে যায়। এ সব বদভ্যাস থাকার কারণে জাগতিক বিষয়েও তাকে ঝামেলায় পড়তে হয়। তার ওপর থেকে মানুষের আস্থা ওঠে যায়। কেউ তাকে নিয়ে কাজ করতে চায় না। রাসূল (সা.) এগুলো থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। অথচ তিনি ছিলেন মাসুম, সব গোনাহ থেকে পবিত্র। মূলত উম্মতকে শিক্ষা দেয়াই তাঁর উদ্দেশ্য।

আখলাক খারাপ হওয়া থেকে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা: কেউ আপনার সঙ্গে কথা বলছেন। আপনি তার দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। মাঝে মাঝে তার দিকে তাকিয়ে হা-না বলে তাকে সময় দিচ্ছেন। খারাপ আখলাকের এটি একটি নমুনা। একজন বৃদ্ধ অর্থের অভাবে আপনার শ্রমিক। কথা বলার সময় তাকে তুই বলে সম্বোধন করছেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারার কারণে কখনো কখনো গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। খারাপ আখলাকের এটাও একটা ধরন। এগুলো অভ্যাসে পরিণত হলে, ভেতর থেকে মনুষ্যত্ব বিদায় নিতে থাকে। 

তাই নবী করিম (সা.) দোয়ার মধ্যে আল্লাহর কাছে এসব থেকে আশ্রয় প্রাথনা করতেন। আশ্রয় প্রার্থনার জন্য দোয়া শিখানোরও একটি হেকমত আছে। দোয়া হলো এমন ইবাদত, যাতে মানুষ সর্বক্ষণ লেগে থাকতে পারে। তাই উক্ত বিষয়ে আশ্রয়ের জন্য দোয়া শিখিয়ে মূলত তাকিদ করা হয়েছে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি যেন এগুলোকে দূর করার জন্য বারবার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা কখনো এগুলো নিয়ে চিন্তা করি? 

অধিক কথা বলা, কারো গোপন বিষয় দেখা বা শুনার চেষ্টা করাও বদভ্যাস: অধিক কথা বলার ক্ষতি অনেক। মেধা দুর্বল হওয়া, অনর্থক বিপদে পড়া ও গাম্ভির্যতা নষ্ট হওয়া-সহ আরো বহু ক্ষতির কারণ এই অধিক কথা বলা। কিন্তু এ জন্য কি আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়েছে? হয়নি। নিজের কাজের খবর নেই কিন্তু অন্যের গোপন বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করার লোকের সমাজে অভাব নেই। এগুলো হচ্ছে মানুষের বদভ্যাস। হজরত শাকাল ইবনে হুমাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসূল (সা.) এর কাছে কিছু আশ্রয় প্রার্থনার বিষয় শিখিয়ে দেয়ার আবেদন করেন। তখন রাসূল (সা.) তার হাত ধরে বলেন, বলো, হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাচ্ছি কানের অনিষ্টতা থেকে। আরো আশ্রয় চাচ্ছি দৃষ্টি, জবান, অন্তর ও মনের খাহেশাতের অনিষ্টতা থেকে।’ (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়ী)। এগুলোর কারণে আল্লাহর গজব নাজিল হয়। মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এতে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টি বরবাদ হয়ে যায়।

এগুলো ছাড়াও বহু বদভ্যাস মানুষের মাঝে পাওয়া যায়, রাসূল (সা.) যেগুলো থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সবক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে রাখা। অসহায়ের আহাজারি, মানুষের কান্নায় দিল নরম হয় না যে, কিছু সহযোগিতা করবে। তাছাড়া নোংড়া থাকা, পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট করাও বদভ্যাসের অন্তর্ভূক্ত। ইসলাম এগুলো থেকে বেঁচে থাকার তাকিদ দিয়েছে।

আজ অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠি এগুলোকে খুব গুরত্ব দিলেও মুসলমানরা এ ব্যাপারে অনেক গাফেল। তাই তারা জাগতিক দিক থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনদারির দিক থেকেও। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে