ঢাকা,  সোমবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

ইসলামের দৃষ্টিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬ গুণ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৪, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬ গুণ
সংগৃহীত ছবি

সুপ্রাচীনকাল থেকেই রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে কাজ করে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। মানুষের জানমাল ও সম্মান রক্ষা, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনে তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে, যা উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জুলুম-অপরাধ প্রতিহত করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নৈতিকতা ও আত্মজবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

Advertisement

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন আদর্শ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ থাকা প্রয়োজন।

১. ঈমানদার হওয়া

আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার সঙ্গে ঈমানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন...এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্য নিরাপত্তা দান করবেন।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৫৫)

হাদিসেও ঈমানের সঙ্গে অন্যায় থেকে বিরত থাকার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যভিচারী মুমিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোনো চোর মুমিন অবস্থায় চুরি করে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮২)

২. আল্লাহভীতি থাকা

আল্লাহভীতি ও পরকালের জবাবদিহির অনুভূতি মানুষকে দায়িত্বশীল করে এবং অন্যায় থেকে দূরে রাখে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যদি সেসব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করতাম।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬)

৩. দায়িত্ব ও অঙ্গীকার রক্ষা করা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা শপথ ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইসলামে অঙ্গীকার ও আমানত রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৮)

৪. সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়া

মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তাদের সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়া অপরিহার্য। একই সঙ্গে অসদাচরণ ও অনৈতিকতা থেকে বিরত থাকাও জরুরি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মিজানে সচ্চরিত্রের চেয়ে কোনো কিছু বেশি ভারী হবে না এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীল কথা-কাজে ব্যক্তির ওপর ক্ষুব্ধ হন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৯৯)

৫. দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা থাকা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি বিচক্ষণতা, প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্য, আত্মসংযম ও চারিত্রিক দৃঢ়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের একজন বলল, হে আমার পিতা! তাকে কর্মে নিয়োগ করুন। নিশ্চয়ই আপনি যাদের নিয়োগ করবেন, তাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে শক্তিশালী ও আমানতদার।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬)

ইমাম তাবারি (রহ.)-এর ব্যাখ্যায়, শক্তিশালী বলতে দায়িত্ব পালনের সামর্থ্যসম্পন্ন এবং আমানতদার বলতে দায়িত্বে খেয়ানতের আশঙ্কামুক্ত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে তাবারি: ৬/২০)

৬. ন্যায়পরায়ণ হওয়া

মানুষের অধিকার রক্ষা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা থাকা জরুরি। পক্ষপাতমূলক আচরণ ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার কোরো; সেটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮)

সদস্য নিয়োগেও চাই সততা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার দায়িত্ব থাকে। তাই এসব বাহিনীতে সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও সততা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে তোমরা আমানত তার যোগ্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবে। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)

ইমাম তাবারি (রহ.)-এর ব্যাখ্যায়, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর অর্পিত মানুষের সম্পদ, অধিকার ও দায়িত্ব আমানতদারির সঙ্গে পালন করা উচিত। (তাফসিরে তাবারি: ২/৪৯১)

অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৯৬)

সদস্য নিয়োগে যে গুণগুলো বিবেচনায় নেওয়া হতো

ইসলামী ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিভিন্ন গুণ বিবেচনা করা হতো। এর মধ্যে ছিল গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, সময়নিষ্ঠা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দায়িত্বের প্রতি আনুগত্য, শারীরিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস-সাকাফিকে ইরাক ও আরব উপদ্বীপের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে লোক নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি ধৈর্যশীল, বিশ্বস্ত, চারিত্রিক দুর্বলতামুক্ত, ন্যায়পরায়ণ এবং ক্ষমতাবানদের দ্বারা প্রভাবিত নন—এমন ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। পরে আবদুর রহমান ইবনে উবাইদ তামিমির নাম প্রস্তাব করা হয়। (উয়ুনুল আখবার: ১/১৭)

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে তাই যোগ্যতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মসংযম ও নৈতিক দৃঢ়তাকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!