Alexa চিকন সুতা ও পাতলা কাগজে উড়ছে ঘুড়ি

ঢাকা, বুধবার   ২২ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৮ ১৪২৬,   ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন

চিকন সুতা ও পাতলা কাগজে উড়ছে ঘুড়ি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৯ ১৪ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৮ ১৪ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আকাশে রঙের ছটা, উড়ছে হাওয়ায় ঘুড়ি। বিভিন্ন রং ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। কতই না রং খেলা করছে আকাশে। এমনই এক দৃশ্যের দেখা মেলে সাকরাইন উৎসবে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব ঘিরে আগন্তুকের মনে রয়েছে না কৌতূহল। তাইতে উৎসবটিতে শামিল হতে পুরান ঢাকায় ভীড় জমান অনেক পর্যটক।

পৌষ মাসের ঠিক শেষের দিনটিতে উৎসবে মাতেন সবাই। পৌষ সংক্রান্তির শেষ দিনেই পালিত হয় সাকরাইন উৎসব। প্রতিবছর ১৪ বা ১৫ই জানুয়ারি পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরে লোকজন ঘুড়ি উৎসবে মেতে ওঠে। এদিন নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি পিঠাপুলি খেয়ে ঘুড়ি উড়িয়ে উৎসব পালনের এই রীতি বহু পুরনো। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এদেশে পালিত হচ্ছে সাকরাইন উৎসব। 

বিভিন্ন রঙের ঘুড়িপুরান ঢাকায় ঘুড়ি উড়ানোর এই খেলা শুরু হয় মুঘোল আমলে। কথিত রয়েছে, নবাব নাজিম মহম্মদ খাঁ ১৭৪০ সালে ‘ভো কাট্টা’ অর্থাৎ, ঘুড়ি উৎসবের সূচনা করেন। আজো পালিত হচ্ছে এই ঘুড়ি উৎসব। জানা গেছে, পশ্চিম ভারতের গুজরাটেও এই ঘুড়ি উৎসব পালিত হয়। সেখানে মানুষ সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের অব্যক্ত ইচ্ছা প্রেরণ করেন। উত্তর ভারতীয় এ ঘুড়ি উৎসবটিকে স্থানীয়রা সাকরাইন নামে অভিহিত করে।

ঘুড়ি উৎসব এদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। মুঘল আমল থেকে এই উত্সব পালিত হলেও পূর্বে খোলা মাঠে ঘুড়ি উৎসব পালিত হত। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মাঠে প্রচুর মানুষের আনাগোনা বাড়ত। তবে এখন খোলা মাঠের স্বল্পতায় সবাই বাসা-বাড়ির ছাদেই সাকরাইন উৎসবটি পালন করে থাকে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জমজমাটভাবে সাকরাইনে ঘুড়ি উৎসব পালিত হয়। সূত্রাপুর, ওয়ারী, চকবাজার, হাজারীবাগ, সদর ঘাট, নবাবপুর, লালবাগ, বংশাল, মিল ব্যারাক, গেন্ডারিয়া ও পোস্তগোলার এলাকাবাসীরা এখনো এ উৎসব পালন করে আসছে। 

প্রতিটি ছাদেই উৎসবের আমেজঘুড়ি উড়ানোর জন্য এলাকার সবচেয়ে বড় দালানটি খুঁজে বেড় করা হয়। সেখানে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ জন ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগীতায় মেতে ওঠে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কে কার ঘুড়ি কাটতে পারে সেই প্রতিযোগীতা চলতে থাকে ছাদগুলোতে। তাদের উৎসাহ যোগাতে উপস্থিত থাকেন বয়স্করাও। ঘুড়ি কাটলে ভো-কাট্টা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে যায় চারদিক।

এই উৎসবে নারীদের অবদান চোখে পড়ার মতো। তারা পরিকল্পনা করেন কীভাবে উৎসবকে আরো সুন্দর করা যায়। নারীদের প্রধান কাজটিই থাকে ঘুড়ির জন্য আঁঠা প্রস্তুত করা। চালের গুঁড়া দিয়ে ঘুড়ি তৈরি আঁঠা তৈরি করে থাকেন মায়েরা। এক সপ্তাহ আগে থেকে চলতে থাকে এই উৎসবের প্রস্তুতি। কোন কোন খাবার জায়গা করে নেবে ডাইনিংয়ে সে হিসাবও করেন গৃহিণীরা। দুধ পুলি, সেমাই, চিতই পিঠা, মালপোয়া, চুষি, পাটিসাপটা, দুধ চিতইসহ মিষ্টি ও ঝাল খাবার উৎসবের আমেজকে আরো বাড়িয়ে তোলে।

আকাশে ঘুড়ির সমারোহঘুড়ি উড়ানোর বিভিন্ন নিয়ম-কানুন

সাকরাইন উৎসবে ঘুড়ি উড়াতে প্রয়োজন হয় চিকন সুতা ও পাতলা কাগজের ঘুড়ি। ঘুড়ি তৈরির এই রীতিও অত্যন্ত প্রাচীন। ঘুড়ি যত হালকা হবে সেটি উড়বেও দ্রুত। এ উৎসবে ঘুড়ি উড়ানোর বদলে অন্যের ঘুড়ির সঙ্গে টেক্কা দিতেই ব্যস্ত থাকেন প্রতিযোগীরা। সুতায় সুতায় প্যাচ লাগিয়ে কাটার চেষ্টা মেতে থাকেন তারা। স্থানীয় ভাষায় একে বলে কাটাকাটি। ঘুড়ি কেটে যাওয়ার পর বিজয়ী ঘুড়ি আকাশে উড়তেই থাকে আর কেটে যাওয়া ঘুড়ি বাতাসে দুলতে দুলতে মিলিয়ে যায় দূর আকাশে। 

আবার কেটে যাওয়া এসব ঘুড়ির অপেক্ষায় ছোটরা চিকন বাঁশ নিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। এই চিকন বাঁশকে লগি বা লগগি বলে। তারা প্রথম দিন ঘুড়ি ধরে জমায় এবং দ্বিতীয় দিন এ ঘুড়িগুলো উড়ায়। এ প্রতিযোগীতায় সুতাটাই অন্যতম। ঘুড়ির সুতাকে মজবুত ও ধারালো করতে মাঞ্জা দেয়া হয়। এজন্য সুতা ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লেইতে ভিজিয়ে রাখা হয়। শিরিষ, রং, বার্লি, ডিম, বিভিন্ন ডালের কষ, ভাতের মাড় ইত্যাদির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে লেই বা ল্যাদ্দি তৈরি করা হয়। 

ঘুড়ি হাতে এক প্রতিযোগীনির্ধারিত সময়ের পর রিল থেকে সুতা নাটাইয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়। শিরিষের আঁঠার জন্য সুতার সঙ্গে সুতা যেন না লেগে যায় তার জন্য রিল থেকে নাটাইয়ে সুতা যাওয়ার মধ্যপথে দু’জন সুতায় চূর লাগিয়ে দেয়। এ চূর তৈরি করা হয় কাচের গুঁড়া দিয়ে। মাঞ্জা দেয়া শেষ হলে এ সুতা শুকানোর জন্য সব সুতা ছেড়ে দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। এ সময় তারা কারো সঙ্গে কাটাকাটি খেলে না। সাকরাইনের ৩ থেকে ৪ দিন পূর্বে মাঞ্জা দেয়া হয়। মাঞ্জার গুণাগুণের উপর নির্ভর করে প্রতিযোগীরা টানে অথবা ছোড়ে বা ঢিলে, কোন পদ্ধতিতে পরাজিত করবে।

ঘুড়ি তৈরি করা হয় যেভাবে

সাকরাইন উৎসবের জন্য পাতলা কাগজ বা পলিথিন দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করা হয়। ছোটরা পলিথিনের ব্যাগ কেটে নারকেল পাতার শলা দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করে। আর বড়দের জন্য দোকানিরা পাতলা কাগজ ও বাঁশের পাতলা চটি দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করে। পুরুষরা আগের দিন রাতে সব ঘুড়িতে দান্তারা বেঁধে রাখে, যাতে একটা কাটা খাওয়ার পর আর একটা উড়ানো যায়। এদিন আকাশে উড়ে চোখদ্বার, মালাদ্বার, পঙ্খীরাজ, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চাপালিশ, চানদ্বার, এক রঙা ইত্যাদি ঘুড়ি।

রাত হলেই আলোর ঝলকানি বাড়তে থাকেএমনকি জাতীয় পতাকার রঙেও ঘুড়ি তৈরি করা হয়। তবে ঘুড়ির চেয়েও চোখ ধাঁধানো হয় এর লেজ। অনেক আকৃতির ও রং-বেরঙের হয়ে থাকে। ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে নাটাইগুলোর নামও বেশ মজাদার। বাটিওয়ালা, মুখবান্ধা, মুখছাড়া ইত্যাদি। পাতলা ঘুড়ি ভালো হলেও নাটাই যত ভারী হবে ঘুড়ি উড়াতে তত ভালো হয়।

পুরান ঢাকার ঘুড়ি প্রেমীরা সারাদিন ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যায় সব ঘুড়ি, নাটাই, সুতা, লগি সব উপকরণ দিয়ে আগুন জ্বালায়। এসময় তারা আতশ বাজী পোড়ায় ও মুখে কেরোসিন তেল নিয়ে আগুন দিয়ে চমৎকার এক ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি করে, যা গোল হয়ে আকাশের দিকে উড়ে যায়। সেইসঙ্গে ফানুসও উড়ানো হয়।

আকাশে আলোর ছটাঅতীতে সাকরাইন উৎসবে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেয়ার রীতি ছিল। সেইসঙ্গে পিঠার ডালা পাঠানোর চল ছিল। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের। কার শ্বশুরবাড়ি কতটা সমৃদ্ধ তার প্রয়াস ঘটানো হত।

তবে বর্তমানে এসব রীতি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে এসব বিষয় সম্পর্কে বয়স্করা নতুনদের গল্প শোনান। জানা যায়, ব্রিটিশ আমলের এই উৎসবটি এখন বাংলাদেশের সব মানুষ পালন করেন। পুরনো আমলে গান বাজতো মাইকে, আর এখন লাউডস্পীকারে গান বাজানো হয়। আগে এলাকাবাসী সীমাবদ্ধ ছিলেন খিচুড়িতে এখন বিরিয়ানিতেই মুগ্ধ হয় তরুণ প্রজন্ম।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস