Alexa কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব- ২)

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৮ ১৪২৬,   ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪০

কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব- ২)

সাইয়্যিদ মানাযির আহসান গিলানি (রহ.) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:০৫ ২৫ জুন ২০১৯   আপডেট: ২১:০৮ ২৫ জুন ২০১৯

পবিত্র কোরআনুল কারিম। (ফাইল ফটো)

পবিত্র কোরআনুল কারিম। (ফাইল ফটো)

কোরআন কী কাউকে তার পৈত্রিক ওয়ারাসাতি ধর্ম থেকে পৃথক করে? আজ পৃথিবীর নানা অঞ্চলে কোটি কোটি মুসলমান ছড়িয়ে আছে। নিঃসন্দেহে এদের অনেকেই পূর্বে খ্রিস্টান, ইহুদি বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলো। 

এখন বলুন, যেই খ্রিস্টান কোরআন মেনে মুসলমান হয়েছে, সে কী ইসলাম গ্রহণের পর হজরত ঈসা মাসিহ আলাইহিস সালাম ও তার গ্রন্থ ইঞ্জিল শরিফকে অস্বীকার করেছে? অথবা যে লোকটি পূর্বে ইহুদি ছিলো, সে কী মুসলমান হওয়ার পর হজরত মুসা আলাইহিস সালাম বা বনি ইসরাইলের অপরাপর নবী-রাসূলদের অবমাননা করে? বা তাওরাত ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্য নবীদের কিতাবগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে? সত্য তো এটাই যে, মাসিহ আলাইহিস সালামের শিক্ষা থেকে যারা দূরে সরে গিয়েছিল, কোরআন কারিমকে মেনে নেয়ার ফলে সেই খ্রিষ্টানই হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার বিশুদ্ধ শিক্ষার কাছাকাছি চলে এসেছে।

আরো পড়ুন>>> কোরআন সংকলনের ইতিহাস (পর্ব-১)

বিগত সাড়ে তেরোশো বছরে যেসব সম্প্রদায় কোরআন কারিমকে মেনে নিয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাদের সবার জীবনেই ওপরের চিত্রটিই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ তারা তাদের পিতৃপুরুষের উত্তরাধিকারী ধর্মের যেসব অনুষঙ্গ হারিয়ে ফেলেছিলো বা ইতিহাসের বিভিন্ন দুর্ঘটনার ফলে তাদের ধর্মের যেসব গুরুত্বপূর্ণ তত্ত সন্দেহ-সংশয়ের বাতাবরণে ঢাকা পড়েছিল, কোরআন কারিমের হাত ধরে তারা তাদের সেই হারানো উত্তরাধিকার ফিরে পেয়েছে। সন্দেহ-সংশয়ের অন্ধকার গর্ভে যেই মৌলিক শিক্ষা খোয়া গিয়েছিল, কোরআন কারিমের আলোকে তারা বিশ্বাসের চোখ দিয়ে সেগুলো দেখতে ও ফিরে পেতে সমর্থ হয়।

অতএব, এটাই বাস্তব যে, কোরআন কারিমকে মানার কারণে কাউকে তাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়নি; বরং যারাই পিতৃপুরুষের ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, অকুণ্ঠে-অবলীলায় দাবি করা যেতে পারে যে, মহান আল্লাহর এই চিরন্তন গ্রন্থ কোরআন কারিমই তাদের সবাইকে তাদের পিতৃপুরুষের সত্যিকার ধর্মে ফিরিয়ে এনেছে। কোরআন ভাঙার কাজ করেনি; বরং যারা ভেঙে পড়েছে, কোরআন তাদেরকে তাদের মহান পূর্বসূরিদের সঙ্গে, তাদের প্রকৃত শিক্ষা ও বিশুদ্ধ জীবনের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। পৃথিবী স্বীকার করুক বা না করুক, এটাই বাস্তব। কোরআন কারিমে দাওয়াত ও তাবলিগের যে আলোচনাগুলো এসেছে, এটাই সেগুলোর প্রতিপাদ্য। শতধাবিচ্ছিন্ন হয়ে বিভক্ত হয়ে পড়া মানবজাতিকে ও কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া মানবতাকে কোরআন কারিম ঐক্য ও একতার এই কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপর যৌথবদ্ধ করতে চায়।
এতো গেলো একটি প্রাসঙ্গিক কথা। এখন আমি আপনাদের সামনে সেই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ধর্মের আসমানি গ্রন্থের সর্বশেষ সংস্করণ কোরআন কারিমের এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা তুলে ধরব, যেগুলোকে জড়িয়ে কিছু অসৎমনা লোক দূরভিসন্ধিমূলক অবান্তর কথাবার্তা নানা উপায়ে কসরত করে জনমনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ কোরআন কারিম সংকলনের প্রকৃত ইতিবৃত্ত কী, সে সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করব। যারা প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকার দরুণ সেসব অসৎমনা লোকদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার শিকার হয়ে সংশয় বোধ করছেন, বা আগামীতে এ ধরনের অপ্রচারের ফাঁদে পড়তে পারেন, তারা আমার আলোচনায় সুচিন্তার খোরাক পাবেন, ইনশাআল্লাহ!

আরো পড়ুন>>> হজ ফ্লাইট শুরু ৪ জুলাই

কোরআন সংকলন-
কোরআনের সংকলন সম্পর্কে বিভিন্ন সত্যায়িত সাক্ষ্য: কোরআন কারিমের সংকলন বা একত্রকরণ ও বিন্যাসদান সম্পর্কিত প্রশ্নাবলির ওপর যেসব সাক্ষ্য থেকে আলোকপাত হতে পারে, সহজ ভাষায় বোঝার জন্যে আমরা সেই সাক্ষ্যগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করব। একটি হলো, সেসব ধারাবাহিক সাক্ষ্য, যা খোদ এ গ্রন্থের মাঝেই পাওয়া যায়। আমরা সেগুলোর নাম দিয়েছি, ‘অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য’। 
আর দ্বিতীয়টি হলো সেসব ঐতিহাসিক বর্ণনা, যেগুলো থেকে এই গ্রন্থের সংকলন সম্পর্কিত পরিস্থিতি জানতে ও বুঝতে সহায়তা পাওয়া যায়। আমরা সেগুলোকে ‘বাইরের সাক্ষ্য’ নামে স্মরণ করব। আমরা সর্বপ্রথম ‘অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যগুলো’ পেশ করছি।

অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য: বাস্তবতা হলো, দুনিয়ার বুকে ‘আসমানি গ্রন্থ’ নামে যতগুলো গ্রন্থ পাওয়া যায়, সেগুলোর মাঝে সম্ভবত কোরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যা নিজ সম্পর্কে উত্থাপিত সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে সন্দেহাতীতভাবে যথেষ্ট হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এ কথাটি আমরা এভাবেও বলতে পারি যে, কোরআন কারিমের সংকলন, একত্রকরণ ও বিন্যাস সম্পর্কে ঐতিহাসিক বর্ণনার যেই সুবিশাল ভাণ্ডার পাওয়া যায়, যদি সেই ভাণ্ডার না থাকতো, তারপরও এ সকল প্রশ্নের প্রশান্তিদায়ক উত্তর আমরা খোদ কোরআন কারিমের মাঝেই পেয়ে যাব।

এই কোরআন কে নাজিল করেছেন? কার ওপর নাজিল করেছেন? কী উদ্দেশ্যে নাজিল করেছেন? যারা কোরআন কারিম পাঠ করেন, তারা খুব ভালোভাবেই জানেন যে, শুধু এই বুনিয়াদি প্রশ্নগুলোর উত্তরই যে কোরআন কারিমের সর্বত্র বিদ্যমান রয়েছে, বিষয়টি আদতে এমন নয়। অথচ এ ধরনের অন্যান্য গ্রন্থগুলো থেকে যদি কেউ জানতে চায়, তাহলে ইনসাফের সঙ্গে বলতে হবে যে, এসব সাদামাটা প্রশ্নের উত্তর তাদের গ্রন্থগুলোতেও কী পাওয়া যাবে না?

যেহেতু কোরআন কারিমের সর্বত্র এ আলোচনা ব্যাপকাকারে বিদ্যমান রয়েছে, এজন্যে এই প্রশ্নগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা আমার দৃষ্টিতে নিষ্প্রয়োজনীয়। এ কারণে আমি কোরআন কারিমের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যসমূহের আলোকে নিম্নের প্রশ্নাবলির সদুত্তর পেশ করতে চাচ্ছি।

১. এই কোরআনের প্রাথমিক অবস্থা কী ছিলো? প্রশ্নটি এভাবেও করা যেতে পারে যে, আল্লাহর কিতাব হিসেবে আরো যেসব গ্রন্থ প্রসিদ্ধ রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা জানি যে, সেগুলো প্রথম দিকে মানুষের মুখে মুখে, স্মরণশক্তিতে এবং গীতা-ভজন আকৃতিতে ছিলো। কয়েক শতাব্দী পর সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়। এক্ষেত্রে কোরআন কারিমের চিত্র কী?

এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্যে পৃষ্ঠা ওল্টানোর প্রয়োজন নেই। সূরা ফাতেহার পর কোরআন কারিমের প্রথম সূরা বাকারার প্রথম আয়াতই হলো,

{ذٰلِكَ الْكِتٰبُ لَا رَيْبَ فِيْهِ } (البقرة : ২)

‘এটি এমন এক লিপিবদ্ধ, যার ব্যাপারে সন্দেহ নেই’ (সূরা বাকারা-২০)।

এই আয়াতের মাঝে আপনি সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ স্বয়ং ‘কিতাব’ শব্দ, যার অর্থ লিখিত ও লিপিবদ্ধ জিনিস, এর থেকে বুঝে আসে যে, উপস্থাপনকারী সূচনালগ্ন থেকেই এটাকে লিখিত গ্রন্থের অবয়বেই উপস্থাপন করতে চাচ্ছেন। এমন নয় যে, ‘কিতাব’ বা ‘লিখিত’ শব্দ শুধু এই এক জায়গাতেই ব্যবহৃত হয়েছে। আপনি কোরআন পড়ুন, প্রায় প্রতিটি বড় সূরার মাঝে ‘কিতাব’ বা ‘লিপিবদ্ধ হওয়ার’ এই বর্ণনাশৈলীর ধারাবাহিক আলোচনা পাবেন। বরং নিগুঢ় সত্য হলো, কোরআন কারিমের মাঝে আরবের কাফেরদের একটি মন্তব্য নকল করা হয়েছে। 
যেখানে তারা বলতো,
{ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلىٰ عَلَيْهِ بُكْرَةً وَّاَصِيْلًا○} (الفرقان : ৫)

‘তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা তিনি লিখে রেখেছেন। এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর কাছে শেখানো হয়।’

এ থেকে বুঝে আসে যে, কোরআন কারিমের লেখা-লেখি ও লিপিবদ্ধকরণ সেসময় একটি সাধারণ বিষয় ছিল। যারা কোরআন কারিমকে তখন পর্যন্ত আল্লাহর কিতাব মানতো না, তারা পর্যন্ত কোরআন কারিমের লিপিবদ্ধকরণের কথা স্বীকার করেছে।

কোরআনের লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে আরো কিছু শাখাগত প্রশ্ন আসতে পারে। যেমন, কোরআন কোন জিনিসের ওপর লেখা হতো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো নিরক্ষর ছিলেন। লেখা-পড়া জানতেন না। তাহলে তিনি কাদের দিয়ে লেখাতেন? আপনি ইচ্ছে করলে এ প্রশ্নগুলোর উত্তরও কোরআন কারিম থেকেই সন্ধান করে নিতে পারেন। যেমন, প্রথম প্রশ্ন অর্থাৎ কোরআন কারিম কীসের ওপর লেখা হতো? তার উত্তর কোরআন থেকেই পড়ুন,

{وَالطُّورِ ○ وَكِتَابٍ مَّسْطُورٍ ○ فِي رَقٍّ مَّنشُورٍ ○} (الطور : ১-৩)

‘কসম তূরপর্বতের এবং প্রশস্ত পত্রের ওপর লিখিত কিতাবের।’ (সূরা তূর : ১-৩)।

رَقٍّ সম্পর্কে সুবিদিত যে, খুব পাতলা ধরনের আবরণকে ‘রক্ক’ বলা হতো। যা লেখার জন্যে তৈরি করা হতো। ইংরেজিতে একে ‘পার্চম্যান্ট’ বলা হতো। প্রাচীন যুগে তাওরাত, ইনযিলের মতো গ্রন্থগুলো এ ধরনের কাগজের ওপর লেখা হতো। এখনো যাদুঘরে দেখা যায়। কোরআন কারিম এ সংবাদ দিয়েছে যে, এ কিতাবও সেই ‘রক্ক’ এর ওপর লেখা হতো। কোরআন কারিমের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করা সম্পর্কে আলোচনার ধারাবাহিকতায় গ্রন্থটির এ বৈশিষ্ট্যের কথাও আলোচিত হয়েছে,

{فِي صُحُفٍ مُّكَرَّمَةٍ ○ مَّرْفُوعَةٍ مُّطَهَّرَةٍ ○ بِأَيْدِي سَفَرَةٍ ○ كِرَامٍ بَرَرَةٍ ○} (عبس : ১৩-১৬)

‘এটা লিখিত আছে সম্মানিত, উচ্চ পবিত্র পত্রসমূহে, লিপিকারের হস্তে, যারা মহৎ, পূত চরিত্র।’ (সূরা আবাসা : ১৩-১৬)।

এ আয়াত থেকে কোরআন কারিম সহিফায় লিপিবদ্ধকরণের পাশাপাশি আরেকটি তথ্য আসছে। তা হলো, সেই লিপিবদ্ধকারীরা ছিলেন সুউচ্চ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কাজেই তাদের লিপিবদ্ধকরণ প্রক্রিয়ার শুদ্ধতার কথাও কোরআন কারিম জানিয়ে দিয়েছে। 

আমার বিস্ময় জাগে, যখন কোরআন কারিমের পাঠকরা এ জাতীয় আয়াতগুলো পড়েন,

{لَا يَمَسُّهُ اِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ○} (الواقعة : ৭৯)

‘যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।’

অথচ তারা চিন্তা করে না যে, কোনো বিষয় যদি মৌখিকভাবে বা স্মৃতিশক্তিতে সংরক্ষিত হয়, তাহলে কোনোভাবেই সে বিষয়ের ক্ষেত্রে স্পর্শ করার নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে না। এই নিষেধাজ্ঞার পরিষ্কার অর্থ হলো, কোরআন কারিম নিজেই নিজেকে এমন একটি লিখিত গ্রন্থ আকারে উপস্থাপন করেছে, যার ছোঁয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নয়তো এই নিষেধাজ্ঞা নির্ঘাত একটি অর্থহীন বিষয়ে পরিণত হবে। 

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা জানি, কোরআন কারিম নিয়মিত বিরতিতে, স্তরে স্তরে অবতীর্ণ হয়েছে। একসঙ্গে পুরো কোরআন অর্থাৎ جُمْلَةً وَّاحِدَةً অবতীর্ণ হয়নি। যার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে,

{لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ} (الفرقان : ৩২)

‘আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্যে।’ (সূরা ফুরকান : ৩২)

আর এ কথা স্পষ্ট যে, এভাবে পর্যায়ক্রমে, নিয়মিত বিরতিতে কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণে স্বযং রাসূলের (সা.) অন্তরে কোরআন গেঁথে যেতো ও মুখস্থ করতে সুবিধা হতো। সূরা বনি ইসরাইলে এসেছে,

{وَقُرْآناً فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ} (بني إسرائيل : ১০৬)

‘আমি কোরআনকে যতিচিহ্নসহ পৃথক পৃথকভাবে পাঠের উপযোগী করেছি, যাতে আপনি একে লোকদের কাছে ধীরে ধীরে পাঠ করেন।’

এখানে পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হওয়ার যে কারণ বলা হয়েছে, তা হলো, এর ফলে মানুষের সামনে একটু একটু করে পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। কেমন যেনো এ আয়াতে বলা হচ্ছে যে, ধীরে ধীরে অবতীর্ণ করাটা রাসূল (সা.) এর পাশাপাশি অন্য লোকদের জন্যেও কোরআর সহজে মৌখিকভাবে মুখস্থ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। এই সুযোগ সৃষ্টিকারী কৌশল যে সফলতা বয়ে এনেছে, সেই সংবাদ পরিবেশন করে স্বয়ং কোরআনই ঘোষণা করেছে,

{بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ} (العنكبوت : ৪৯)

‘বরং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে, তাদের অন্তরে তা (কোরআন) তো স্পষ্ট আয়াত।’ (সূরা আনকাবুত : ৪৯)।

যার অর্থ হলো, এই কোরআন লিখিত অবয়বে সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সাহাবায়ে কেরামের গুণীমহলের অন্তরেও সংরক্ষিত হচ্ছিল। এ কথা স্বয়ং কোরআন কারিমই বলছে। সূরা মুয্যাম্মিলের সর্বশেষ রুকুতে নির্দেশ এসেছে,

{فَاقْرَؤُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ} (المزمل : ২০)

‘কাজেই কোরআনের যতটুকু তোমাদের জন্যে সহজ, ততটুকু পাঠ করো।’ (সূরা মুয্যাম্মিল : ২০)।

এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করার সময় সেই ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই নন; বরং সাহাবায়ে কেরামের একটি বৃহৎ অংশও নিম্নের আয়াতে বর্ণিত নির্দেশ প্রতিপালন করে থাকেন,

{أَدْنَى مِن ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهُ وَثُلُثَهُ} (المزمل : ২০)

‘রাত্রির প্রায় দু’তৃতীয়াংশ, অর্ধাংশ ও তৃতীয়াংশ’। (সূরা মুয্যাম্মিল : ২০)।

তারা রাতের বেশ বড় অংশে দাঁড়িয়ে কোরআন কারিমের দাওর (বারংবার পাঠচক্র) করে থাকেন। এরা তো সেই মনীষা, যাদের সম্পর্কে অন্য আয়াতে এসেছে,

{يَتْلُونَ آيَاتِ اللَّهِ آنَاء اللَّيْلِ} (آل عمران : ১১৩)

‘যারা আল্লাহ তায়ালার আয়াতসমূহ পাঠ করে রাতের গভীরে’। (সূরা আলে ইমরান : ১১৩)

এমন আরো কিছু আয়াতে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, সকাল-সন্ধ্যায় তাদের একমাত্র ব্যস্ততা ছিল, নিজেদের হিফযকৃত কোরআন বারবার তেলাওয়াত করা।

কোরআনুল কারিমের এসকল অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের পর কেউ কী এ কথা বলতে পারে যে, এই মহানগ্রন্থকে كتابةً وحفظاً অর্থাৎ লিখে রাখা ও মুখস্থ করে রাখার মাধ্যমে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল, এ কথা প্রমাণিত করার জন্যে ‘বাইরের সাক্ষ্য’ও লাগবে? স্বয়ং কোরআনুল কারিম থেকেই তো বুঝে আসে যে, আল্লাহ তায়ালা এ গ্রন্থকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থাপনা এতোটাই সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন যে, অপরাপর আসমানি গ্রন্থগুলোর সঙ্গে যেসব দুর্ঘটনা ও দুর্যোগ ঘটেছে, তা থেকে প্রথম থেকেই কোরআন কারিমকে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। সূরা বুরুজে এসেছে,

{هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْجُنُودِ ○ فِرْعَوْنَ وَثَمُودَ ○ } (البروج : ১৭،১৮)

‘আপনার কাছে সৈন্যবাহিনীর ইতিবৃত্ত পৌঁছেছে কী? ফেরাউনের এবং সামুদের? (সূরা বুরুজ : ১৭-১৮)।

এই প্রশ্নবোধক বাক্যের পরপরই কোরআন কারিম পরিষ্কার ভাষায় এ দাবি ঘোষণা করেছে যে,

{بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ ○ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ ○ } (البروج : ২১،২২)

‘বরং এটা মহান কোরআন, লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ।’ (সূরা বুরুজ : ২১-২২)।

পাশাপাশি দুটো বিপরীত বাক্য পেশ করার অর্থ হলো, ফেরআউন ও সামুদ সম্প্রদায়ের মতো মহাক্ষমতাধর শক্তিও যদি কোরআন কারিমকে অরক্ষিত রাখার অপচেষ্টা করে (মা‘আযাল্লাহ) তাহলে তাদেরকেও ব্যর্থতার মুখদর্শন করতে হবে। বিগত তেরোশো বছর ধরে এ কথা স্বয়ং কোরআন কারিমের বৈরী গোষ্ঠীগুলোও সত্যায়ন করে এসেছে। তারা এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, 
‘আমরা মুহাম্মাদের কালাম কোরআনকে তেমনই বিশ্বাস করি, যেভাবে মুসলমানরা এটাকে খোদার কালাম হিসেবে বিশ্বাস করে।’ (ই‘জাযুত তানযিল : ৫০০)।

উপরের এ কথাটি আমাদের দাবি নয়; জার্মানির ভানহিম নামের এক বিধর্মী কোরআন গবেষক এ কথা অবলীলায় স্বীকার করেছেন। তিনি যদিও এখানে কোরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার করেননি; কিন্তু তিনি যে পদ্ধতিতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, তা পক্ষান্তরে তাকেই বাধ্য করবে যে, তিনি এটাকে আল্লাহর কালাম হিসেবে স্বীকার করবেন। (চলবে...)

সংগ্রহ: মাওলানা ওমর ফারুক

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে