কুস্তি খেলায় বন্ধুত্ব-সম্প্রতি
হাওর বেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জ। জেলাটিতে শতবছরের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা হচ্ছে কুস্তি। এ খেলায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। এ খেলাটির প্রচলন জেলা সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ ও তাহিরপুরে বেশি।
হাওর জেলা হিসেবে বর্ষার সময় সুনামগঞ্জের মাঠ-ঘাট ডুবে যায়। তখন কর্মজীবীরা অলস সময় পার করেন। তাই আমোদের জন্য গান-নাচের আসর বসে, কোথাও বসে যাত্রাপালা। ডিসেম্বরে হাওরে বোরো চাষে নেমে পড়েন কৃষকরা। তবে এর আগে অথ্যাৎ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কুস্তি খেলার মৌসুম শুরু হয়। কুস্তি খেলার জন্য মালদের (কুস্তিগির) ডেকে আনেন গ্রামের মাতব্বররা। জয়লাভের জন্য চলে পরামর্শ ও বুদ্ধি। এরপর অন্য গ্রামের মালদের কুস্তিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। স্বাগতিক গ্রাম প্রতিপক্ষ গ্রামকে আপ্যায়ন করাতে পাঁচ থেকে ১০টি গরু জবাই করে থাকেন।
এ উপলক্ষে দূর গ্রাম থেকে বাবার বাড়িতে আসে মেয়েসহ জামাই এবং নাতি-নাতনিরা। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কুস্তি দেখতে আসেন হাজার হাজার দর্শক। প্রতিপক্ষ পরাজিত হলেও আপ্যায়নে কমতি হয় না। পুরো একদিন-একরাত আতিথ্য নিয়ে ফিরে যায় তারা।
কুস্তি খেলা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হন খেলোয়াড়রা। প্রথম দলে উৎসাহী তরুণরা মুখোমুখি হন। পরে দ্বিতীয় দলে ছানি দাগারা মুখোমুখি হন। খেলার সময় ক্লান্ত দর্শক, নিস্তেজ মাঠে টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দাগার মালরা। তারাই গ্রামের 'সেরা বাছাই করা কুস্তিগির'। দাগার মালদের লড়াইয়ের ওপরই নির্ভর করে চূড়ান্ত জয়-পরাজয়। মালদের নানা কৌশল থাকে।
মালরা কৌশলকে বলে 'প্যাঁচ'। আঞ্চলিক ভাষায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্যাঁচ হলো- ঘারি মুছকা (দুই হাতে কোমর ধরে ফেলে দেয়া), বাইম্যা প্যাঁচ (বাইম মাছের প্যাঁচ), বাল্লা (পায়ে পায়ে লড়াই), আউকরা (গোড়ালি দিয়ে পেঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে ফেলে দেয়া), বস্তাটান (হঠাৎ বিপক্ষকে ঘাড়ের ওপর তুলে ফেলা) ইত্যাদি। কোনো কুস্তিগিরের হাঁটু, মাথা, কোমর, হাত, পিঠ বা বুক মাটিতে পড়ে যাওয়া মাত্রই তিনি হেরে যাবেন।
কুস্তি খেলায় জয়ী কুস্তিগিরের বন্দনা শুরু হয়। বিজয় গাঁথার তালে তালে নাচে হাজারো দর্শক। আঞ্চলিক ভাষায় তারা হলো 'তামিশকির'। তাদের ঢোল, করতাল, মন্দিরার তালে কান পাতা দায়। তামিশকির ভক্তদের কাঁধে থাকেন বিজয়ী মাল। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয় মাঠ। রংচঙে প্যান্ট, কোমরে গামছা পরা মাল অভিনন্দনের জবাবে পুরো মাঠ দৌড়ান। হাতে উড়ান গামছা বা রুমাল। ভক্তরা মালের দিকে টাকার মালা, কেউবা উপহার ছুড়ে দেন। সমর্থনের প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে সেই টাকার মালা বা উপহার কুড়িয়ে নিচ্ছেন বিজয়ী মাল ।
জনশ্রুতি রয়েছে, বিজয়ী মালের সঙ্গে পরাজিত গ্রামের কোনো ধনির মেয়ের বিয়ে হয়েছে। অথচ সেই কুস্তিগিরের সহায়-সম্বল নেই।
জেলার শক্তিয়ারখলা গ্রামে কামাল হোসেন এক সময় মাল (কুস্তিগির) ছিলেন। তিনি জানান, খেলার জন্য এক গ্রামের মানুষ আরেক গ্রামের মানুষকে আমন্ত্রণ জানায়। একে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘ভাইয়াপি’ কুস্তি বা ‘দাওয়াতি’ কুস্তি খেলা। প্রতিপক্ষ গ্রামের লোকদের থাকা-খাওয়ার আয়োজন করে স্বাগতিক গ্রাম। যারা কুস্তি খেলা পরিচালনা করেন, তাদের বলা হয় ‘আমিন’। তিন আমিন খেলা পরিচালনা করেন। তিনি আরো জানান, কুস্তির নিয়মানুসারে মাঠের লড়াইকে ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনের প্রভাব ব্যবহার নিষিদ্ধ। বিরোধ-হিংসা পুষে রাখা যাবে না।
সুনামগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী জেলা স্টেডিয়ামে কুস্তি খেলার প্রতিযোগিতা হয়। পরে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। যুবসমাজকে মাঠে ফেরাতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিপুল দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করে কুস্তি খেলায় জনপ্রিয়তার কথা। আগামীতে বড় কুস্তি খেলার আসর বসানো হবে।