কার্ডিফ মহাকাব্যের দেড় দশক পূরণ হলো আজ
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানো এ দেশের অন্যতম বড় অর্জন ছিল। কিন্তু ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর একেরপর এক হারের মুখ দেখতে থাকে টাইগাররা। অবস্থা এমন যে তখন সম্মানজনক পরাজয়ের আশায় খেলতে নামতো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তবে এরই মাঝে সুখের এক দিন হয়ে আসে ১৮ জুন। ২০০৫ সালের এই দিনে সে সময়ের মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল লাল সবুজের প্রতিনিধিরা।
বরাবরের মতোই সম্মানজনক পরাজয়ের আশায় ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ন্যাটওয়েস্ট ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলতে যায় বাংলাদেশ। ইংল্যান্ড ছাড়া বাংলাদেশের অপর প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। সিরিজের দ্বিতীয় এবং ওয়ানডে ইতিহাসের ২২৫০তম ম্যাচে কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনে মাঠে নামে হাবিবুল বাশারের দল। তখনও কেউ জানতো না, কি হতে চলেছে অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্যে।
টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অস্ট্রেলিয়ার ক্যাপ্টেন রিকি পন্টিং। উদ্দেশ্য ছিল বড় স্কোর গড়ে বাংলাদেশকে চাপে ফেলা। তবে ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই যখন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা অজি ওপেনার অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন, চাপ যেন উল্টো তাদের ওপরে গিয়েই পড়ে। ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে তাপশ বৈশ্যের বলে পন্টিং সাজঘরে ফিরলে শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যায় অস্ট্রেলিয়া। স্কোরবোর্ডে তখন মাত্র ৯ রান জমা করতে পেরেছে অজিরা।
এরপর ম্যাথু হেইডেন ও ড্যামিয়েন মার্টিন মিলে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন। ইনিংসের ষষ্ঠদশ ওভারে হেইডেনকে ফিরিয়ে দুজনের প্রতিরোধ ভাঙ্গেন নাজমুল হোসেন। তবে মাইকেল ক্লার্ককে সঙ্গে নিয়ে বড় জুটি গড়েন মার্টিন। ৭৭ রান করা মার্টিনকে ফিরিয়ে ১০৮ রানের জুটি ভাঙেন তাপশ। স্বস্তি ফিরে আসে টাইগার শিবিরে।
এর কিছু পড়ে ক্লার্ক ফিরে গেলেও মাইক হাসি ও সাইমন ক্যাটিচের ঝড়ো ইনিংসে ভালো অবস্থানে যায় ক্যাঙ্গারুরা। নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে তাদের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেট হারিয়ে ২৪৯ রান। সেসময়ের হিসেবে যা ছিল ম্যাচ উইনিং স্কোর।
রান তাড়া করতে নেমে ধীরস্থির শুরু করেন দুই ওপেনার জাভেদ ওমর বেলিম ও নাফিস ইকবাল। ব্যক্তিগত ৮ রানে গিলেস্পির বলে নাফিস ফিরলে প্রাথমিক ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। তার জায়গায় নামা তুষার ইমরান ফেরেন ২৪ রানে। জাভেদ ওমরও ১৯ রানের বেশি করতে পারেননি। মূলত চারে নামা আশরাফুলই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেন। তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। ব্যক্তিগত ৪৭ রানে বাশার ফিরলেও সেঞ্চুরি করেই থামেন আশরাফুল।
বাইশ গজে নেমে শুরু থেকেই অজি বোলারদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে থাকেন আশরাফুল। উইকেটের চারদিকে বাহারি সব শটে ১০০ বলে পূরণ করেন সেঞ্চুরি। পরের বলেই তিনি সাজঘরে ফিরলে বাকি কাজ শেষ করেন আফতাব আহমেদ। শেষ ওভারে গিলেস্পিকে হাঁকানো তার ছক্কার শটটি ক্রিকেটপ্রেমীরা মনে রেখেছিলেন অনেকদিন।
শেষ পর্যন্ত চার বল ও ৫ উইকেট হাতে রেখে স্মরণীয় জয় পায় বাংলাদেশ। শক্তির বিচারে বাংলাদেশের এই জয়কে বড় অঘটন হিসেবে আখ্যা দেয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। অজিদের দর্প চূর্ণ করা এই ম্যাচের ম্যাচসেরা হয়েছিলেন আশরাফুল।
এরপর আরো অনেক ম্যাচ খেলেছে টাইগাররা, জিতেছে অসংখ্যবার, এমনকি ভবিষ্যতেও জিতবে। তবে যতদিন বাংলাদেশের ক্রিকেট থাকবে, ততদিন ভক্তদের কাছে অমর এক স্মৃতি হিসেবেই বিবেচিত হবে কার্ডিফের অজিবধ কীর্তি।