ঢাকা,  বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

আঁধার পেরিয়ে আলোর মশাল হাতে

আরিফুল হক বিজয়
প্রকাশিত: ১৬:০৮, ২৮ জুলাই ২০২২
আঁধার পেরিয়ে আলোর মশাল হাতে
লিটন দাস। - ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ও বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকরদের একজন ইয়ান বিশপ একবার বলেছিলেন, "লিটন যখন ফর্মে থাকে, তখন তার ব্যাটটি রং তুলি হয়ে যায়। যা দিয়ে সে মাঠে মোনালিসার চিত্র আঁকে।"

মোনালিসা চিত্রকর্মটি এঁকেছিলেন বিশ্বখ্যাত ইতালিয়ান চিত্রশিল্পী লিওর্নাদো দা ভিঞ্চি। এক মোনালিসার হাসিতেই বিশ্বখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। লিটন কুমার দাসের প্রসঙ্গ সামনে আসলে অবশ্য প্রথমেই ভিঞ্চিকে টেনে আনা যায় না। ভিঞ্চির মতো প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও লিটনকে পাড়ি দিতে হয়েছে বেশ দুর্গম পথ। পথের শেষে দেখা দিয়েছে সফলতা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটার গড়ার সূতিকাগার বিকেএসপি থেকে লিটনের যাত্রা শুরু। শুরু থেকেই লিটনের ব্যাটে দারুণ একটা ক্ল্যাসিকাল ভাইব ছিলো। সেটার ঝলক দেখিয়েছেন যুব বিশ্বকাপে। এরপর ঘরোয়া ক্রিকেটে দ্যুতি ছড়িয়ে রান বন্যা বইয়ে দিয়ে পা রেখেছেন জাতীয় দলে।

Advertisement

শুরুটা হয়েছিলো ক্রিকেটের রাজকীয় ফরম্যাট টেস্ট দিয়ে। প্রথম ম্যাচেই দেখালেন তার ক্লাস। সামনের পায়ে ভর করে পুল, কাভার ড্রাইভ, স্ট্রেইট ড্রাইভ, স্কয়ার কাট আর ফ্লিকের দুর্দান্ত পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন লিটন। যদিও ইংনিসে ছিলো সবে ৪৪ টা রান। তবে ৪৫ বলের ওই ইনিংসেই সবার প্রত্যাশার পারদটা ঝেঁকে বসেছিলো লিটনের উপর।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লিটনের শুরুটা আশাব্যঞ্জক ছিল না।টেস্টে মিডল অর্ডারে আমাদের ব্যাটিং দুর্বলতা চিরকালের। লিটন সেখানে খানিকটা ভরসার ইঙ্গিত দিলেন। পরের সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলের বিপর্যয়ে স্টেইন, রাবাদাদের সামলে তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি।

ক্রিকেটের মহাকাব্য সাদা পোশাকের মর্যাদা কতটা সেটা ঠিক শব্দে ব্যাখা করার মতো নয়। একজন ক্রিকেটারকে কিংবদন্তির আসনে বসতে হলে ক্রিকেটের কুলীন সংস্করণে নিজেকে প্রমাণ করে আসতে হয়। লিটনের শুরুটা দেখে অনেকেই তার মাঝে আশার আলো দেখেছিলেন। তবে হঠাৎ খেঁই হারিয়ে ফেললেন বর্তমান সময়ে দেশসেরা এই ব্যাটার।

ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত লিটন টেস্ট খেলেছেন সর্বমোট ৩৫টি। ব্যাট হাতে মাঠে নামার সুযোগ হয়েছে ৬০ ইনিংসে। তাতে প্রথম ১০ ম্যাচের ১৭ ইনিংসে ২৬.৮৮ গড়ে করেছেন ৪৫৭ রান। ফিফটি মাত্র তিনটি। ব্যস! এতেই সমালোচনার ঝড় উঠলো বেশ। তীর্ষক কথার বাণে ছিন্নভিন্ন হলেন লিটন।

চারদিকের সমালোচনা হোক আর নিজের দায়েই হোক, পরের ১০ ম্যাচেও ঘুরে দাঁড়াতে পারলেন না প্রতিভাবান এই ব্যাটার। বরং অবস্থা হলো আরো করুণ! ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত দুই বছর নিজের ছায়াটাও পর্যন্ত মাড়াতে পারেননি এ তরুণ। 

শুরুর দিকে নিজের সক্ষমতার ছায়াও মাড়াতে পারেননি তিনি।পরের ১০ ম্যাচের ১৭ ইনিংসে ফিফটির দেখা পেয়েছেন মাত্র দু'বার। যদিও গড় বেড়েছে, তবে সেটা তার প্রত্যাশার সঙ্গে মোটেই যাচ্ছিলো না। টানা ৩৪ ইনিংস শেষে মাত্র পাঁচ ফিফটির বদৌলতে সমালোচনার সঙ্গে শুরু হলো তাকে দল থেকে ছেটে ফেলার দাবি। টনক নড়লো লিটনের। প্রতিজ্ঞা করলেন এবার ঘুরে দাঁড়ানোর। বিশ্বাসটা ভিতরেই ছিলো।

ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসজি'র এক অনুষ্ঠানে গিয়েও বিশ্বাসের ব্যাপারটা খোলাসা করেছিলেন লিটন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সাফল্যের রহস্য আমি নিজেই।' নিজের বিশ্বাসের জোরেই বদলে গেলেন লিটন। অতীতের সব ব্যর্থতা স্রেফ ধুয়েমুছে দিলেন টানা পারফর্ম্যান্স করে।

শুরুটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ঘরের মাঠে। পরপর দুই ম্যাচে করে বসলেন দুই ফিফটি। ধারা ধরে রাখলেন বিদেশ সফরেও। শ্রীলংকায় গিয়ে পঞ্চাশের ঘর ছুঁলেন আরেকবার। ১০ ইনিংসে এক সেঞ্চুরি ও পাঁচ ফিফটিতে ৫৪.৩০ গড়ে রান করলেন ৫৪৩! পরের পথটা কেবল আলোর মশাল হাতে ছুটে চলার!

সর্বশেষ ১৫ টেস্ট ম্যাচের ২৬ ইনিংসে লিটনের রান ১২৫৩। সেঞ্চুরি ৩টি, হাফ সেঞ্চুরি ৯টি। আর চলতি বছরে (২০২২) এখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ সর্বোচ্চ রানের মালিক লিটন। ৮ ম্যাচের ১৪ ইনিংসে ৪ ফিফটি ও ২ সেঞ্চুরিতে ৪৭.০৭ গড়ে করেছেন মোট ৬৫৯ রান। যা উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে আবার চলতি বছরের সর্বোচ্চ। 

ধীরে ধীরে ঠিকই নিজের জাত চিনিয়েছেন লিটনশুধু তাই নয়, ২০২০ সাল থেকে উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান লিটন দাসের টেস্ট অর্ধশতক ১০টি। এই সময়ে উইকেট কিপিং করে ব্যাট হাতে লিটনের চেয়ে বেশি ফিফটি করতে পারেননি আর কেউ। এই সময়ে ১০টি ফিফটি করেছেন তিনি। র‍্যাঙ্কিংয়েও বিরাট লাফ দিয়েছেন এই ডানহাতি।

বর্তমানে টেস্ট ব্যাটিং র‍্যাঙ্কিংয়ে লিটনের অবস্থান ১৩তম। এর আগে টেস্টে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৭২৪ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ১২তম অবস্থানে এসেছিলেন লিটন। তার আগে ২০১৭ সালে ৭০৯ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে সর্বোচ্চ ১৪ নাম্বারে এসেছিলেন দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। এছাড়া মুশফিকুর রহিমও একবার ১৬ নম্বরে উঠে এসেছিলেন।

লাল বলে গত দুই বছরের এই উড়ন্ত ফর্মটা টেনে আনতে পারাটাই ছিলো লিটনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেটা তিনি পেরেছেন। বলাই যায়, বঙ্গদেশীয় ক্রিকেটের ভিঞ্চির রং তুলি এখন আগের থেকে আরও নিঁখুত ও ধারাবাহিক। 

লিটনের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে সৌন্দর্য্যটা হলো তার শট খেলার ধরণ। ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ মেনে সবচেয়ে সাবলীল আর সুন্দর উপায়ে তার কপিবুক শটগুলো দু'চোখের প্রশান্তি। সেটা কেমন? এ নিয়ে দেশের অন্যতম ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্রকে বলেছেন বিকেএসপির শিক্ষক ও লিটনের শৈশবের ক্রিকেট গুরু নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

এখন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা তিনিই...দেশের অন্যতম সেরা এই ক্রিকেট মস্তিষ্কের ভাষ্য, "লিটন যখন কাভার ড্রাইভ করবে, আপনার মনে হবে ও কিছুই করেনি। অথচ বল কিন্তু বাউন্ডারি লাইনের বাইরে চলে গেছে। একটা বল একটু শর্ট লেংথে ওর কোমরের একটু ওপরে আছে, ও ব্যাকফুটে গিয়ে একটু পাঞ্চ করলো। করলোও না হয়তো, ব্যাটটা ধরে রাখলো কেবল, বলটা কিন্তু বাউন্ডারি লাইনের বাইরে। এই কাজটা লিটনের মতো কেউ পারে না। নো বডি! শুধু বাংলাদেশের কথা বলছি না, বিশ্বেই এখন ওর মতো এফোর্টলেস কোনো ব্যাটসম্যান নেই।"

লিটনের ব্যাটিং দেখে জনপ্রিয় ধারভাষ্যকর হার্শা ভোগলে একবার বলেছিলেন "ডিলাইটেড টু সি দ্যাট দ্য প্রমিস সিন ইন লিটন দাস ইজ বিগেইনিং টু ফ্লাওয়ার"। অর্থাৎ যে অসীম সম্ভাবনার জানান দিয়ে লিটন দাস যাত্রা শুরু করেছিলেন সেটি পরিস্ফুটিত হতে দেখে ভালো লাগছে। ফুল হয়ে লিটনের প্রস্ফুটিত হওয়ায় হার্শার মতো আনন্দিত আমরাও। যে আনন্দধারায় আঁধার ফুঁড়ে আলোর মশার হাতে অনেকদূর এগিয়ে যাক লিটন। নাজমুল আবেদীন ফাহিমের মতো আমরাও বলতে চাই, "হেয়ার কামস এ স্টার"।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!