বিশ্বকাপের নতুন দল পাপুয়া নিউগিনির উত্থানের গল্প
ম্যাচটা জিতলেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সরাসরি অংশগ্রহণ মোটামুটি নিশ্চিত, এমন সমীকরণে কেনিয়ার বিপক্ষে খেলতে নেমেছিল পাপুয়া নিউগিনি। কিন্তু শুরুতে ১৯ রানেই যখন দলটির ৬ উইকেট চলে গেলো, কেউ কি তখন ভেবেছিলো এখান থেকে অন্য কিছু হতে পারে?
সম্ভবত একজন ভেবেছিলো। তিনি হলেন পাপুয়া নিউগিনি অলরাউন্ডার নরম্যান ভানুয়া। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফিনিক্স পাখি যেভাবে জেগে ওঠে, সেভাবেই টেনে তোলেন দলকে। ৪৮ বলে ৫৪ রান করে দলকে এনে দেন লড়াই করার মতো সংগ্রহ। পরবর্তীতে বল হাতে দুই উইকেট নিয়ে দলের জয়ের পথ সুগমও করেছেন তিনি। ৪৫ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে উল্লাস শুরু করে দেয় পাপুয়া নিউগিনি দল।
তবে এরপরও কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের। আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হতে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল আরেকটি ম্যাচের দিকে। একই ভেন্যুতে পরের ম্যাচে মুখোমুখি হয় স্কটল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড। সে ম্যাচে নেদারল্যান্ড জয়লাভ করলেও রানরেটে এগিয়ে থাকায় সরাসরি জায়গা নিশ্চিত হয় বারামুন্ডিস নামে পরিচিত দলটির।

কিভাবে এই দলটি বিশ্বকাপ পর্যন্ত এলো? কেমন ছিল শুরু থেকে পথচলা? সেসব নিয়েই ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য আজকের আয়োজন।
১৯৭৩ সালে আইসিসির সদস্যপদ লাভ করে পাপুয়া নিউগিনি। এরপর দীর্ঘদিন ধরেই আইসিসির জুনিয়র ডিভিশন লিগে ভালো খেলে আসছিলো তারা। আইসিসির পূর্ব এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দল বলা হয় পাপুয়াকে। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বেশি ট্রফিও জিতেছে দলটি। এছাড়া আইসিসি বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের প্রতিটা আসরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে তারা।
১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফিতে প্লেট ফাইনালে উত্তীর্ণ হয় পাপুয়া নিউগিনি। কিন্তু ফাইনাল না খেলেই তারা দেশে চলে আসে। কারণ নিজেরা এতদূর যেতে পারবেনা ধরে নিয়ে আগেই বিমানের টিকিট কেটে রেখেছিল দলটি। একই পরিণতি হয় ১৯৯৮ সালের এসিসি ট্রফিতেও। সেবার প্রথম দুই ম্যাচ হারার পর বাকি ম্যাচ না খেলেই দেশের বিমান ধরে পাপুয়া নিউগিনি। কারণ বাকি ম্যাচ জিতলেও পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য তাদের এক সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হতো। বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ফ্লাইট বিড়ম্বনায় এমন ফলাফল পাপুয়া নিউগিনির জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার হয়েই দাঁড়িয়েছিল।
মাঝে ১৯৯৬ সালের এসিসি ট্রফিতে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠে যায় বারামুন্ডিস। তবে সেমিতে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা।
২০০১ সালের প্যাসিফিকা কাপে তৃতীয় ও পরের বছর চ্যাম্পিয়ন হয় পাপুয়া নিউগিনি। ২০০৩ সালের প্যাসিফিক গেমসে সোনা অর্জন করে ক্রিকেট দল। সময়ের সঙ্গে এগোতে থাকা পাপুয়া নিউগিনি ২০১১ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারতো। কিন্তু সেবার আফগানিস্তানের কাছে হেরে তৃতীয় হয় দলটি। এরপর ২০১৩ সালে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে জায়গা করে নেয় তারা।

২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে এসে আরো একবার শেষ দিকে তরী ডোবে বারামুন্ডিসের। সেবার চতুর্থ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। তবে ধারাবাহিক ভালো খেলার ফলাফল স্বরূপ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি স্ট্যাটাস পেয়ে যায় পাপুয়া নিউগিনি।
হংকংকে ৪ উইকেটে হারিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে পথচলা শুরু করে তারা। আয়ারল্যান্ডকে ২ উইকেটে হারিয়ে নিজেদের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির পথচলাও দারুণভাবে শুরু করে ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশটি।
২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার রাউন্ডে গ্রুপ ‘এ’ তে পড়েছিল পাপুয়া নিউগিনি। একই গ্রুপে নেদারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মতো দল থাকায় চূড়ান্ত পর্বে আসাটা কঠিনই ছিল বারামুন্ডিসের জন্য।
বারমুডা ও নামিবিয়াকে হারিয়ে দারুণ শুরুর পর স্কটল্যান্ডের কাছে হোঁচট খায় পাপুয়া নিউগিনি। নেদারল্যান্ডকে হারানোয় বিশ্বকাপের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয় তাদের। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের।
এখনো পর্যন্ত ২৭টি আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচ খেলে ৭ ম্যাচে জয় পেয়েছে পাপুয়া নিউগিনি। ২৪টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অবশ্য যথেষ্ট ভালো রেকর্ড দলটির। ১৬ জয়ের বিপরীতে মাত্র ৭ ম্যাচে হারের মুখ দেখেছে তারা।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনির সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক আসাদ (৭৩৯ রান)। উইকেটশিকারী হিসেবে প্রথমস্থানে আছেন নরম্যান ভানুয়া (৩৪ উইকেট)।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান টনি উড়ার (৬৫৪ রান)। ৩৩ উইকেট নিয়ে এই ফরম্যাটেও সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী নরম্যান ভানুয়া।
কোয়ালিফাইং রাউন্ড শেষে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হলেও গ্রুপিং এখনো চূড়ান্ত হয়নি পাপুয়া নিউগিনির। তবে দীর্ঘ পথ পেড়িয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়াও কম গর্বের নয় তাদের জন্য।
বিশ্বকাপের জন্য শুভকামনা রইলো, পাপুয়া নিউগিনি।